স্বাধীন ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে মোদী জমানায়। এই প্রথম লোকসভায় বাজেট অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদসূচক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর জবাবী ভাষণ ছাড়াই গৃহীত হয়ে গেল রাষ্ট্রপতির ভাষণ। নির্দিষ্ট দিনে মোদীর ভাষণের জন্য সময় নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী লোকসভার ত্রি-সীমানাতেও আসেননি। বিরোধীদের সুতীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাব দিতে না পারার ভয়ে রীতিমতো পালিয়ে বাঁচলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কেন পালালেন, কার ভয়ে পালালেন সেটা ব্যাখ্যা করার সৎসাহসটুকুও দেখাতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত রাজ্যসভায় গিয়ে ভাষণ দিয়ে কোনোরকমে মুখ রক্ষার চেষ্টা করলেন বটে, তবে সেটাও বিরোধীশূন্য সভায়। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুঁড়ে মোদীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিরোধীরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করলে মোদী হাফ ছেড়ে বাঁচেন।
ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতিওয়ালা স্বঘোষিত বিশ্বগুরুর এত ভয়? তাছাড়া তিনি নিজেই বলেছেন জৈবিক প্রক্রিয়ায় পিতা-মাতার মিলনে তাঁর জন্ম হয়নি। ‘ভগবান’ বিষ্ণুই নাকি তাঁকে নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব দিয়ে অবতাররূপে পাঠিয়েছেন। সেই কাজ শেষ হলে বিষ্ণুই তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। এহেন অজৈবিক অবতার প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় কিছু বিরোধী দলের সাংসদকে এতটা ভয় পেয়ে গেলেন যে সংসদে তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভাষণ দেবার সাহস সঞ্চয় করতে পারলেন না। ভাষণ তো দূরের কথা ভয় পেয়ে লোকসভাতেই গেলেন না। এহেন পলায়ন মনোবৃত্তি ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রীকে মানায় না। এমন ভিতু দুর্বল চিত্তের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর আসনের উপযুক্ত নয়। যিনি সংসদের ভেতরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী সাংসদদের ভয় পান, তিনি সীমান্তে চীনকে শতগুণ বেশি ভয় পাবেন সেটাই স্বাভাবিক। প্রাক্তন সেনা প্রধান নারাভানের অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে ২০২০ সালের ডোকলাম ঘটনায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার যে নমুনা হাজির করেছেন সেটাও অনেকটা ভয়েরই প্রতিরূপ। চীনের বাহিনী এগিয়ে আসছে ভারতের দিকে। এমতাবস্থায় ভারতের সেনাবাহিনীর কী করণীয়? একা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না সেনা প্রধান। তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর কাছে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানতে চান। কিন্তু দীর্ঘ নীরবতার পর তিনি জানতে পারেন প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে বলেছেন ‘যেটা ঠিক মনে হবে সেটাই করতে হবে’। অর্থাৎ অতি শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছেন এবং ঢিলেমি করছেন। শেষ পর্যন্ত দায় এড়িয়ে সব দায় চাপানো হয় সেনা প্রধানের উপর।
লোকসভায় ঢুকলে এই প্রশ্নেরই মুখোমুখি হতে হতো মোদীকে। তাছাড়া অবাধ চুক্তির নামে আমেরিকার কাছে দেশের স্বার্থ বন্ধক দেবার জবাবও দিতে হতো। অস্বস্তিতে পড়তে হতো এফ স্টাইন ফাইলে তাঁর নাম থাকা নিয়েও। ট্রাম্পকে খুশি করতে ইজরায়েলে নাচা গানার কী আদৌ প্রয়োজন ছিল? প্রশ্ন উঠতো সেটাও। আম্বানি-আদানিদের স্বার্থেই কি ট্রাম্পকে খুশি করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন? ট্রাম্পের শর্ত মেনে চুক্তি করলে আদানির বিপদ কেটে যাবে। তাছাড়া জবাব দিতে হবে বিরোধী নেতাকে কেন বলতে দেওয়া হয় না সংসদে। কেন তাদের সাসপেন্ড করে সভাকে শাসক দলের একা বলার ক্ষেত্রে পরিণত করা হচ্ছে। এসব প্রশ্নের সদুত্তর দেবার সৎ সাহস নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদীর নেই। তাই তিনি পালিয়ে বাঁচলেন।
Editorial
পালালেন কেন মোদী?
×
Comments :0