Malbazar

অসাধু সিন্ডিকেটের দখলে ক্রান্তি ব্লকের কৃষক বাজার, ক্ষোভ কৃষক ও ব্যবসায়ীদের

জেলা

সরকারি কৃষক বাজার এখন অসাধু বালি ব্যবসায়ীদের ‘সেফ জোন’। কৃষকদের উৎপাদিত ফসল কেনাবেচার জায়গায় রমরমিয়ে চলছে বালি, পাথর ও বজরীর কারবার। ডাম্পার থেকে নামছে পাহাড় প্রমাণ বালি-পাথর, আর সেখান থেকেই ট্রাক্টরে করে পাচার হচ্ছে অন্যত্র। জলপাইগুড়ি জেলার ক্রান্তি ব্লকের গঙ্গাদেবীতে অবস্থিত এই কৃষক বাজারের এমন বিচিত্র ছবি দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার কৃষক ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তৃণমূল জমানায় সরকারি সম্পত্তির এই লুটরাজ এখন ক্রান্তির নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সপ্তাহে দুই দিন সোমবার ও শুক্রবার এখানে বড় হাট বসে। কয়েকশো কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাঁদের পসরা নিয়ে আসেন। কিন্তু বর্তমানে বাজারের সিংহভাগ জায়গা দখল করে রেখেছে অবৈধভাবে মজুত করা বালি ও পাথরের স্তূপ। ফলে হাটের দিন তিল ধারণের জায়গা থাকছে না। ব্যবসায়ীরা বসার জায়গা পাচ্ছেন না, হাটের স্বাভাবিক ছন্দ পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বালি ও পাথরের গুঁড়োয় বাজার এলাকা সবসময় ধুলোয় ধসরিত হয়ে থাকছে। খোলা আকাশের নিচে থাকা শাকসবজি ও খাদ্যপণ্যে বিষাক্ত ধুলো মিশছে, যা জনস্বাস্থ্যের পক্ষেও বিপজ্জনক। অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনের আলোয় ডাম্পার ঢুকিয়ে এখানে ডাম্পিং ইয়ার্ড বানানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে সারা ভারত কৃষক সভা। জেলা সম্পাদক প্রাণ গোপাল ভাওয়াল বলেন, ‘‘তৃণমূল জমানায় কৃষক বাজারগুলো এখন আর কৃষকদের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে না। গঙ্গাদেবীর এই বাজারটি শাসকদলের মদতপুষ্ট অসাধু সিন্ডিকেটের দখলে চলে গেছে। যেখানে কৃষকের ফসল থাকার কথা, সেখানে ডাম্পিং হচ্ছে বালি-পাথর। এর পেছনে বড়সড় আর্থিক লেনদেন রয়েছে। আমরা অবিলম্বে এই অবৈধ কারবার বন্ধের দাবি জানাচ্ছি। কৃষকদের অধিকার ফিরিয়ে না দিলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামব।’’
স্থানীয় কৃষক সভার নেতা উত্তম মন্ডলের মতে, এই মান্ডি বা কৃষক বাজারটি তৈরির পরিকল্পনাতেই গলদ ছিল। প্রথমত, মান্ডিটি সবজি উৎপাদন এলাকা বা জনবহুল বাজারের থেকে দূরে একটি নির্ঝুম জায়গায় তৈরি করা হয়েছে। যার ফলে সেখানে পাইকার বা কৃষকদের যাতায়াত নেই। দ্বিতীয়ত, সারা বছর জায়গাটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে এবং স্থানীয়দের মতে এটি বর্তমানে একটি ‘‘আড্ডাখানা’’ বা ‘‘ভূতের বাড়ি’’-তে পরিণত হয়েছে। কৃষকদের দাবি, এই বাজারটি যদি কোনো জনবহুল ও কেন্দ্রীয় স্থানে তৈরী করা হতো, তবে সাধারণ কৃষকেরা লাভবান হতেন। কিন্তু জনস্বার্থের বদলে দলীয় সিন্ডিকেটের পকেট ভরাতে ব্যস্ত প্রশাসন সেদিকে নজর দেয়নি।
ক্রমবর্ধমান জনরোষের চাপে পড়ে গত বৃহস্পতিবার ক্রান্তি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মালতি টুডু বাজার পরিদর্শনে আসেন। তিনি স্তূপীকৃত বালি ও বজরী দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রশাসনের নাকের ডগায় এতদিন ধরে কীভাবে এই বেআইনি কাজ চলছিল? প্রধানের নির্দেশের পর সত্যিই কি প্রভাবশালী এই বালি মাফিয়ারা পিছু হটবে, নাকি কয়েকদিন পর আবার পরিস্থিতি একই হবে- তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।
রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, সরকারি সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত গুদাম হিসেবে ব্যবহার করার সাহস জোগাচ্ছে কারা? পঞ্চায়েত বা ব্লক প্রশাসনের একাংশের মদত ছাড়া এমন স্পর্ধা অসম্ভব বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। কৃষকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বালি-পাথর মাফিয়াদের এই ‘রাজত্ব’ উত্তরবঙ্গের কৃষিব্যবস্থাকেই সংকটে ফেলছে। এখন দেখার, প্রশাসন আদৌ কৃষকদের দাবি মেনে বাজারটি দখলমুক্ত করে কি না।

Comments :0

Login to leave a comment