ASSEMBLY 2026 PANDUA

পাণ্ডুয়া: হাসপাতাল থেকে রাস্তা, লড়াইয়ের শক্ত ঘাঁটিতে ভরসা বাম প্রার্থীই

রাজ্য বাংলা বাঁচানোর ভোট

ছবি - অরিজিৎ মন্ডল

পূজা বোস

স্টেশন পরিচিতি বোর্ডটি পার করে এসে যতদুর চোখ যায় শুধুই লম্বা রেল লাইন। আর তার ঠিক পাশ দিয়েই চলে গিয়েছে মাটি আর রেল লাইনের পাথর মেশা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা। রাস্তার পাশের নিচু জমিতে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে গিয়েছে দড়মা-বেড়া আর টিন দিয়ে তৈরি ঘর। 
এভাবেই বাস করেন এখানকার বহু সংখ্যালঘু মানুষ। 
পাণ্ডুয়া স্টেশনের গায়েই এই দৃশ্য। এই বিধানসভা কেন্দ্রের নামও পাণ্ডুয়া। এই কেন্দ্রের বাসিন্দাদের কাছে বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী আমজাদ হোসেন শুধুই ‘আমজাদ ভাই’। ভোটের আগে শেষ রবিবার সকালে এই সুলতানপুর গ্রামেই প্রচারপর্ব সারলেন তিনি। প্রার্থীর প্রচার যত এগিয়েছে পেছনে ততই বেড়েছে কচিকাঁচার সংখ্যা। ওঁরা এই গ্রামেরই ছেলেমেয়ে। বেশিরভাগেরই গায়ে ধুলোভর্তি। কারণ এখনও পাকা রাস্তা তৈরি হয়নি। কাঁচা রাস্তায় ধুলো মাটি মেখেই খেলা চলে ওদের। কেউ কেউ তো তাঁর একরত্তি ছোট্ট ভাইকে কোনক্রমে কোলে নিয়ে এগিয়ে চলছিল প্রার্থীপ্রচারের টোটোর পিছনে পিছনে। আবার কখনও এদিক ওদিক ছুটে ওরাই জানান দিচ্ছে প্রার্থীর  আসছেন। ওটাও যেন আরেকরকম খেলা হয়ে উঠেছিল ওদের কাছে। 


প্রার্থী বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যেতেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন মহিলারা। কেউ কেউ পরিয়ে দিচ্ছেন মালা। আবার কেউ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন তাঁদের অভাব-অভিযোগ।
পাণ্ডুয়া কেন্দ্রেই ২০১৬’র বিধানসভায় জয়ী হয়েছিল বামফ্রন্ট। বিধায়ক হয়েছিলেন আমজাদ হোসেনই। এবার তিনিই প্রার্থী।  
এলাকার এক মহিলা প্রার্থীকে দেখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, "রাস্তাটার পাকা করে দেওয়ার কথা কতদিন ধরে বলছি শোনেনি কেউ। এখনও তেমন গরম পড়েনি আর তাতেই জল পাচ্ছি না। প্রত্যেকবার গরমকাল আসলে একই ঘটনা । কতবার অভিযোগ জানিয়েছি কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই।" 
ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা রেজাউল আলম বলেন, "আগে যখন বাম সরকার ছিল তখন অনেকেই ১০০ দিনের কাজ করত। তবে এখন তা বন্ধ। পেটের দায়ে মহিলাদের এখন বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজ করতে হয়। আর বাড়ির ছেলেরা চলে যায় শহরের দিকে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে। কিন্তু সেখানে সম্মান নেই। নেই নিরাপত্তাও। " 
প্রচারে আমজাদ হোসেনের সঙ্গে ছিলেন হুগলী জেলা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য জ্যোৎস্না মানিকও।  তিনি বলেন, "এখানকার আদিবাসী প্রান্তিক মানুষকে টিএমসি ভয় দেখায়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে তৃণমূলকে পছন্দ না হলে বিজেপিতে ভোট দিন। কিন্তু ওই লাল পার্টি কে একটা ভোটও দেবেন না। কেউ কেউ আবার বলে ওই লালপার্টি জিতলে লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা বলেছি সরকারি কোনও প্রকল্প কখনই বন্ধ হয় না। আমাদের সময় যে বিধবা ভাতা দেওয়া হতো তা এখনও চালু রয়েছে।‘‘
‘‘তিনি আরও বলেন, যখন বামফ্রন্ট সরকার ছিল তখন পান্ডুয়ার সরকারি হাসপাতাল ১০০ বেড করার অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল সেই অনুমোদিত প্রকল্পও বন্ধ করে দিয়েছে। এখন সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গেলেই চুঁচুড়া হাসপাতালে রেফার করে দেওয়া হয়।’’
২০২১’র বিধানসভা ভোটে এখানে তৃণমূল জিতেছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই বিধায়ককে একদিনও দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা শোনার সময় হয়নি তাঁর। এদিকে এখানকার যে শিল্প জমিগুলি ছিল তা বিক্রি করে দিচ্ছেন তলে তলে। এখানকার বহু মানুষ ইটভাটা, চাল মিলে কাজ করে একসময় নিজেদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু আজ কর্মসংস্থান নেই, তাই পরিবারের মানুষকে পরিবার ছাড়া হতে হয়। সিপিআই(এম) কর্মীরা বলছেন, ‘‘এখন বাড়ির মেয়েরা বুঝতে পারছেন। তাই ভবিষ্যতকে বাঁচাতে আমাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।" 
পান্ডুয়া বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে মিশ্র সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। আর এই কারণেই হয়তো ভোটের রাজনীতিতে আরও একটু বেশি বৈচিত্রপূর্ণ এই কেন্দ্র। একদিকে যেমন হিন্দু মানুষের বসবাস রয়েছে তেমনি রয়েছে বহু মুসলিম পরিবারের ও বসবাস। পাশাপাশি রয়েছে আদিবাসী, মতুয়া, মানুষের বাসও। দেশভাগের সময় পূর্ব বাংলা থেকেও এখানে এসেছিলেন বহু মানুষ। উদ্বাস্তু পরিবারকে জমির পাট্টা দিয়ে তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা করে দিয়েছিল তৎকালীন বাম সরকার। হয়েছে জমির লড়াইও। 
আমজাদ হোসেন বলছেন, ‘‘এবার এসআইআর পর্বে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের নাম বাদ পড়েছে। সেই তালিকায় সংখ্যালঘু মানুষের পাশাপাশি একটা বড় অংশের হিন্দু ভোটারের নামও রয়েছে। এই কেন্দ্রে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে ভোটের মার্জিন এর হেরফের ও একেবারেই কম থাকে প্রত্যেকবার।" 
দীর্ঘসময় বামপন্থীদের দুর্জয় ঘাঁটি হয়ে থেকেছে এই পান্ডুয়া। গত পাঁচ বছর বামপন্থীদের ডাকে একের পর এক আন্দোলনে সাড়া দিয়েছেন এখান জনতা। এবারের নির্বাচনে সেই আন্দোলনকে পুঁজি করেই লড়াইয়ে বামফ্রন্ট।

Comments :0

Login to leave a comment