বিজেপি’র নির্বাচনী সংকল্প পত্রে এবং নির্বাচনী প্রচারে মোদী-শাহ ও অন্যান্য নেতাদের মুখে বারবার মহিলাদের মাসে নগদ ৩০০০ টাকা দেবার ঘোষণায় রাজ্যের মহিলারা যতটা খুশি হয়েছিলেন এখন সেই অন্নপূর্ণা প্রকল্পের প্রায় এক ডজন পাতার ফর্ম হাতে পেয়ে ততটাই বিরক্ত সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ছেন। নির্বাচনের আগে ঢালাও প্রচার হয়েছিল যারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে টাকা পান (মাসে দেড় হাজার টাকা) বিজেপি ক্ষমতায় এলে তারা মাসে তিন হাজার টাকা করে পাবেন। এমন ধারণা তৈরি করা হয়েছিল যে নতুন করে আবেদনের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু সরকার গঠনের পর একের পর এক ফরমান যেভাবে জারি করছে তাতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের মধ্যে ঠিক কতজন অন্নপূর্ণা প্রকল্পে টিকবেন তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। প্রথম ছাঁটাই হচ্ছে ভোটার তালিকার ভিত্তিতে। এসআইআর’র মাধ্যমে ঘুরপথে কার্যত নাগরিকত্ব যাচাই করে যে ২৭ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তারা অন্নপূর্ণায় যুক্ত হতে পারবেন না। নিছক সন্দেহের কারণে তাদের ভোটাধিকার যেমন কাড়া হয়েছে তেমনি সরকারি ভাতা থেকেও বঞ্চিত করা হবে। অথচ এরা ভারতীয় নন এটা কোথাও প্রমাণিত হয়নি।
অতঃপর যে আবেদন পত্র তৈরি হয়েছে তাতে আবেদনকারীর তথ্যের সঙ্গে পরিবারের সকল সদস্যের জমি, বাড়ি, অর্থ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সহ এমন কোনও ব্যক্তিগত তথ্য নেই যা জানতে চাওয়া হয়নি। অর্থাৎ পরিবারের সকল সদস্যের যাবতীয় সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছে এই ফর্মের মাধ্যমে। এইসব তথ্যের সঙ্গে প্রকল্পের ন্যূনতম যৌক্তিক সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। তবে কি সরকার মাসে তিন হাজার টাকা ভাতার লোভ দেখিয়ে সকল মানুষের যাবতীয় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করে নিতে চাইছে। রাষ্ট্রকে অতিরাষ্ট্রবাদী পথে চালিত করার লক্ষ্যে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষীণতম গণ্ডিটুকুও ভেঙে দিয়ে তাদের ১০০ ভাগ রাষ্ট্রের নজরদারির আওতায় আনতে চাইছে।
আবেদনপত্রে অজস্র তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট করা হয়নি ঠিক কোন কোন শর্ত পূরণ না হলে আবেদন বাতিল হবে। যদি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হতো কি কি থাকলে বা না থাকলে আবেদন গ্রাহ্য হবে অথবা অগ্রাহ্য হবে তাহলে সকল মহিলার আবেদন করার প্রয়োজন হতো না। সরকার, আধা কর্মী, পেনশনভোগী, আয়কর দাতাদের যারা এই প্রকল্পে আবেদন করতে পারবেন না তাদের তথ্য সরকারের কাছে কম-বেশি আছে। তবে মোট মহিলাদের মধ্যে সেই সংখ্যাটা নিতান্তই কম। ফর্মের অস্বচ্ছতা ও অস্পষ্টতার কারণে বাকি সব মহিলারাই আবেদন করতে পারবেন। ফলে বাকিদের যাবতীয় তথ্য এই সুযোগে সরকারের হাতে চলে যাবে।
একটা স্বাধীন দেশের জনদরদি সরকারের কাছে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য থাকতেই পারে। কিন্তু সন্দেহ থাকে সেই তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে। আধারের মাধ্যমে সকল ভারতবাসীর যে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল সেটা সরকারের নিঃশ্চিদ্র নিরাপত্তায় থাকেনি। সেটা দেশি-বিদেশি বেসরকারি হাতে হস্তান্তরিত হয়ে গেছে। সেই তথ্য কর্পোরেট বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহৃত হবার গুরুতর অভিযোগ আছে। বেসরকারি টেলিকম সংস্থা মোবাইল সংযোগের সঙ্গে আধার যুক্ত করে যাবতীয় আধার তথ্য নিজেদের এক্তিয়ারে নিয়ে কর্পোরেট স্বার্থে ব্যবহার করছে নাগরিকদের অনুমতি ছাড়া। তেমন অন্নপূর্ণা প্রকল্পের আড়ালে যে তথ্য সরকার সংগ্রহ করছে তা সরকারের নিজস্ব নিরাপত্তায় সুরক্ষিত থাকবে তো? নাকি হিন্দুত্ব-কর্পোরেট জুটির রাজনীতির স্বার্থে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
Editorial
অস্বচ্ছতা সন্দেহ বাড়ায়
×
Comments :0