ভ্রমণ — বিদেশের / তিন শহরের ইতিকথা
সুমন চ্যাটার্জী
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ৩০ মে ২০২৬
সুলতানাহমেত অঞ্চলে ঢুকলেই এই মানচিত্রের আরেকটি স্তর খুলে যায় । হেগিয়া সোফিয়া (Hagia Sophia)-র সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায় এই সুবিশাল, বিস্ময় উদ্রেককারী স্থাপত্য কেবল ইট-পাথরের সমষ্টি বা ইঞ্জিনিয়ারিং মার্ভেল নয়, বরং তা ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী প্রয়োগের ফল । বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের এক গির্জা, অটোমানরা শহর দখল করার পর মসজিদ, প্রজাতন্ত্র স্থাপনের সময় মিউজিয়াম, আবার সাম্প্রতিক সময়ে পুনরায় মসজিদ—এই পরিবর্তনগুলোর ভেতরে কোন ধর্মীয় আবেগের সরলরেখা বা ইতিহাসের যথাযথতা নেই । এখানে প্রতিটি রূপান্তরই রাজনৈতিক এবং অন্তঃস্ফূর্ত এবং একটি নির্দিষ্ট সময়কালের নিরিখে ক্ষমতার আস্ফালন ।
এই সকল সোচ্চার এবং সরব ঘোষণার সমান্তরালেই চলে অন্য এক নীরব প্রক্রিয়া—সরিয়ে দেওয়া, ভুলিয়ে দেওয়া বা মুছে ফেলার । ইস্তাম্বুল একসময় বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু সম্প্রদায়ের সুহৃদস্থলেই গড়ে ওঠা এক শহর ছিল । কিন্তু সেই বহুত্ব ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে বা বলা ভালো সরিয়ে ফেলা হয়েছে । অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ দিকে আর্মেনীয়দের ওপর নৃশংস আক্রমণ, ১৯২৩ সালের জনসংখ্যা বিনিময়ের পর শহরের সামাজিক গঠন একরকম প্রায় পুরোটাই বদলে যায় । ১৯৫৫ সালের কুখ্যাত 'পোগ্রোম' (Pogrom) সেই পরিবর্তনকে প্রায় সম্পূর্ণ করে দেয় । আজ শহরের ভেতর হাঁটলে সেই ইতিহাস চোখে পড়ে না কিন্তু তার অনুপস্থিতি বারবার ধরা দেয় । পুরনো গির্জার দরজা বন্ধ, কিছু পাড়া নতুন করে গড়ে উঠেছে, কিছু নাম মুছে গিয়ে নতুন নাম বসেছে । শহরটি তার অতীতকে অস্বীকার করেনি কিন্তু তাকে সামনে রাখার প্রয়োজনও বোধ করেনি । বরং তাকে ধীরে ধীরে পাশে সরিয়ে রেখে নতুন এক ন্যারেটিভ তৈরি করেছে ।
আজকে যেমন আমাদের দেশে স্কুল ইতিহাসের বই থেকে মুঘল কালকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, অনেকটা ঠিক সেইরকম এক অবিরত প্রক্রিয়া এখানেও চলেছে বা চলছে । এই ন্যারেটিভের ভেতরেই গড়ে উঠেছে আধুনিক ইস্তাম্বুল, একটি শহর যা একাধারে নিজের বহু শতাব্দীর ইতিহাসকে বহন করে এবং তাকে নিয়ন্ত্রণও করে । পুরোটা নিজের মতন করে দেখায় বা দেখতে বাধ্য করে । ঘটনাগুলি পাঠকের চোখে অনেকটা আমাদের দেশের বিগত ২২ বছরের কালপ্রবাহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে ।
গত দুই দশকে, বিশেষত রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান-এর শাসনকালে এই নিয়ন্ত্রণ আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে । সংবাদমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তক্ষেপ এবং ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনিক শুদ্ধি—এই ঘটনাগুলি শহরের মানচিত্রকে বদলায়নি কিন্তু বদলেছে মানুষের আচরণকে । যুগে যুগে পৃথিবীর ইতিহাসে স্বৈরাচার এইভাবেই ক্ষমতায় কায়েম থেকেছে । তাকসিম স্কোয়ার, যে জায়গা একসময় রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং আক্রোশ প্রকাশের কেন্দ্র ছিল, এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু তার ব্যবহার ও উপযোগিতা বদলে গেছে । মিছিল হয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয় না; স্লোগান ওঠে, কিন্তু তা ছড়িয়ে পড়ে না । শহরের কেন্দ্র যেন নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে গিয়েছে । সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা 'মনুমেন্ট অফ রিপাবলিক' (Monument of Republic) যেটি তুরস্কের মানুষের সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল—আধুনিক তুরস্কের জনক মোস্তফা কামাল পাশা আতাতুর্ক-এর ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র বিদেশী মানুষ, তৎকালীন সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত সেমিয়ন আরালভ । যা ওই সময়ে তুরস্ক-সোভিয়েত প্রগাঢ় মৈত্রীর ইতিহাসের সাক্ষী । আজকে ন্যাটোর (NATO) সদস্য 'তুর্কিয়ে' সেই ইতিহাসকে বদলে ফেলেছে ।
গ্র্যান্ড বাজারের উপচে পড়া ভিড়, পা ফেলার জায়গা না থাকা ইস্তিকলাল স্ট্রিটে হাঁটা, বসফরাসের ধারে বসে সুপ্রসিদ্ধ টার্কিশ কফি কিংবা অ্যাপেল টি খাওয়া—সবকিছুই স্বাভাবিক, প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয় । কিন্তু এই স্বতঃস্ফূর্ততার ভেতরেই রয়েছে এক আরোপিত শৃঙ্খলা । কোথায় কতটা বলা যাবে, কোন প্রসঙ্গে থামতে হবে, সবকিছুই যেন এক প্রখর অনুশীলনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত । এরপরও ইস্তাম্বুলকে পুরোপুরি বোঝা যায় না যদি না এর শহরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরেকটি স্তরকে বোঝা যায় । যে স্তরটি সরাসরি চোখে পড়ে না, কিন্তু আচরণ, বিশ্বাস আর অভ্যাসের মধ্যে ক্রমাগত কাজ করে ।
চলবে
Comments :0