ভ্রমণ
মুক্তধারা
ষোলোআনা নিজমিয়ানা
অভীক চ্যাটার্জী
২০২৬ এপ্রিল ৪, বর্ষ ৩
ঝালের ঝোলের নিজামিয়ানা
হায়দরাবাদের কথা হবে আর বিরিয়ানির কথা হবে না, তাই কখনও হয়? বিরিয়ানির শহর হায়দরাবাদের বিরিয়ানি ঐতিহ্য কিন্তু আজকের নয়। সেই আসাফ যাহ ঘরানার নিজামী আমল থেকেই এর ব্যুৎপত্তি। সেই বিরিয়ানির হাল হকিকত জানতে হলে আমাদের যেতে হবে আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে। অষ্টাদশ শতকে যখন নিজাম উল মুলক আসাফ যাহ ১ম শাসন চলছে হায়দরাবাদে, তখন তাঁর দরবারে পারস্য আর ইরানি খাদ্যসংস্কৃতির বহুল প্রভাব পড়তে শুরু করে। সেই সূত্রেই বিরিয়ানির আগমন হায়দরাবাদে। বিরিয়ানির মূল শিকড় রয়েছে পারস্যতে, যেখানে “বিরিয়ান” শব্দের অর্থ ভাজা বা রান্না করা চাল। পরে মুঘলদের মাধ্যমে এটি ভারতে আসে। কিন্তু হায়দরাবাদে এসে এই বিরিয়ানি সম্পূর্ণ নতুন রূপ পায়।এখানে স্থানীয় তেলেঙ্গানা মশলা, যেমন জাফরান, কেওড়া জল, ভাজা পেঁয়াজ—সব মিলিয়ে এক অনন্য স্বাদ তৈরি হয়।
হায়দরাবাদি বিরিয়ানির দুটি প্রধান ধরন আছে—
১)কাচ্চি বিরিয়ানি – কাঁচা মাংস (সাধারণত মাটন) এবং আধসিদ্ধ চাল একসাথে ‘দম’-এ রান্না করা হয়।
২)পাক্কি বিরিয়ানি – আগে মাংস রান্না করে পরে চালের সঙ্গে মেশানো হয়।
এই রান্নার বিশেষ কৌশল হলো “দম” পদ্ধতি, যেখানে হাঁড়ি বন্ধ করে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়, ফলে মশলা ও সুগন্ধ পুরোপুরি মিশে যায়।
প্রথমে এটি ছিল রাজকীয় খাবার, কিন্তু ধীরে ধীরে হায়দরাবাদের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। আজ এটি শুধু একটি খাবার নয়, বরং শহরের পরিচয়ের অংশ।বর্তমানে হায়দরাবাদি বিরিয়ানি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বিরিয়ানি। এর সুগন্ধ, মশলার ভারসাম্য এবং রান্নার কৌশল একে অন্য সব বিরিয়ানি থেকে আলাদা করে তোলে।
তবে আরও একটি বিরিয়ানিও কিন্তু পাওয়া যায় হায়দরাবাদে। সেটি বহুলপ্রচলিত না হলেও হায়দরাবাদে এর জনপ্রিয়তা একটুও কম নয়। সেটা হলো অন্ধ্র বিরিয়ানি। যেখানে ভাত বা বাগারা আলাদা তৈরি হয়, আর তার সাথে পরিবেশন করা হয় আলাদা রান্না করা মাংস। মাত্রাতিরিক্ত ঝাল এই পদটি খেতে গেলে রায়তা অপরিহার্য। আমার ব্যক্তিগত ভাবে কিন্তু এটি খুবই পছন্দের।
এবার আসি কিছু কিংবদন্তি বিরিয়ানি প্রস্তুতকারক দোকানের গল্পে। হায়দ্রাবাদ বলতে সবাই বলে প্যারাডাইস বিরিয়ানি। ১৯৫৩ থেকে চলে আসা এই দোকানের বিরিয়ানি স্বাদে খুবই ভারসাম্যপূর্ণ। যারা প্রথমবার হায়দরাবাদ যাচ্ছেন, তার জন্য খুবই safe choice। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পছন্দ এখানকার বিরিয়ানি নয়, হালিম। দ্বিতীয় দোকানটি হলো মেরিডিয়ান বিরিয়ানি। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় মসলায় ভরপুর এই বিরিয়ানি আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। অসম্ভব সুন্দর স্বাদে এই বিরিয়ানি আমার কাছে এক নম্বর। আর পুরোনো হায়দরাবাদি বিরিয়ানি খেতে হলে যেতে হবে হোটেল শাদাবে। চারমিনার এর কাছেই এই দোকানে যখনই যান না কেনো, ১৫ থেকে ২০ মিনিট অপেক্ষা আপনাকে করতেই হবে। প্রথমে বিরিয়ানি, তারপর দুধি হালওয়া বা ডাবল কে মীঠা বা কুবানিকা মীঠা যা খুশি খেতে পারেন।
এ ছাড়াও ক্রুতুঙ্গা এবং শ্রীকন্যা বিরিয়ানি দারুণ। শ্রীকণ্যাতে গেলে অবশ্যই অপ্রিকোট পুডিং খেয়ে দেখা উচিৎ। অসম্ভব সুন্দর খেতে। শ্রীকণ্যা কিন্তু অন্ধ্র স্টাইলের বিরিয়ানি বানায়।
এছাড়াও আরও কিছু জায়গা হলো বাওয়ার্চি, শাহ গোস্ত, ক্যাফে বাহার এর ভালো। সময় আর সাথে লোকজন থাকলে মান্ডি খেতে পারেন। বিশাল বড়ো থালাতে খুব সুন্দর করে সাজানো হয় মান্ডি। সবাই মিলে এক থালায় খেতে হয়। তাতে পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা বাড়ে। মান্ডি 36 এর মধ্যে অন্যতম।
এ শহর শুধু আমাদের রসনাকে তৃপ্ত করে না। অন্তরের প্রশান্তিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। এ শহর ছেড়ে খুব শিগগিরই আমি চলে যাব। কিন্তু এই স্বাদ, এই বন্ধুত্ব এই আদর আমার বুকে থেকে যাবে চিরকাল। যতদিন আছি, ততদিন একে পরতে পরতে চেখে দেখার লোভ সংবরণ করা দায়! একটু মশলার মতো, অল্প একটু মিষ্টির মতো, অথবা এক অচেনা গন্ধের মতো, যা হঠাৎ করে কোনও এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় আবার মনে পড়ে যাবে। ফিরে ফিরে আসবে কফির কাপের ধোঁয়ার সাথে।
(Paid review নয়, পুরোটাই ব্যক্তিগত পছন্দ)
-----------------
Comments :0