Assembly election 2026: Jamalpur

জামালপুর: প্রচারে সাড়া ‘অভূতপূর্ব’, জয় দেখছেন বাম প্রার্থী

জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

এভাবেই জনে জনে প্রচার করেছেন প্রাক্তন বিধায়ক এবং জামালপুরের বামফ্রন্ট প্রার্থী সমর হাজরা। ছবি ও ভিডিও: প্রিতম ঘোষ

মসাগ্রাম স্টেশন থেকে অটোতে প্রায় চল্লিশ মিনিটের রাস্তা। দু’পাশে ঝান্ডা চোখে পড়েছে সব দলেরই। সর্বত্র রয়েছে লাল ঝান্ডাও। মেমারি-তারকেশ্বর যাতায়াতের এই  রাস্তাই বলে দিচ্ছে জামালপুরে সর্বত্র বামফ্রন্ট রয়েছে। রয়েছে শক্ত ভিতে।
জামালপুর কেন্দ্রে ২০১৬-তেও জয়ী হয়েছিলেন বামফ্রন্ট মনোনীত মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী সমর হাজরা। পাঁচবারের বিধায়কের অন্যতম পরিচয়, সাইকেলে বা ট্রেকারে চড়ে নিয়ম করে থাকেন এলাকার সব চায়ের দোকানে। ২০২১-র ভোটে পরাজয়ের পরও বদলায়নি রোজনামচা।
জামালপুরের ১৩টি এবং রায়নার ১টি পঞ্চায়েত নিয়ে এই কেন্দ্র। পূর্ব বর্ধমান জেলায় সবচেয়ে বেশি আলু ফলে এই জামালপুরেই। দাম পাচ্ছেন না আলুচাষিরা। ফলে সর্বত্র তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। অতীতে বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে বিপদে পড়লে চাষিদের থেকে ফলন কিনে নেওয়ার কথাও রয়েছে। 
আলুর দাম আর অবৈধ বালি খাদান নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ গোটা এলাকায়। আর ক্ষোভ কাজ না থাকা নিয়ে। রয়েছে হিমঘরে টোকেন দেওয়ার দুর্নীতিও।  


প্রার্থী সমর হাজরা বলছেন, ‘‘মানুষ বলছে বামফ্রন্টের সময় ভালো ছিল। যুবরা বলছে কারণ তাঁদের কাজ নেই। কৃষক, খেতমুজররা বলছেন চাষের খরচ বেড়ে গিয়েছে, ফসলের দাম নেই, তারপরও এখনকার সরকার নীরব।’’
জামালপুর মোড় থেকে অনেক দূরের গ্রামে চাতালে বসে কথা হচ্ছিল মহিলাদের সঙ্গে। এলাকার মহিলা সোনালি কিস্কু বললেন, ‘‘আসল কথা কী জানেন আমরা তো মাঠে গতর খাটাই, আমাদের কাজ চাই। একশো দিনের কাজ বন্ধ হয়ে রয়েছে। ভাতার টাকায় তো সংসার চলে না। তার ওপর আলুর দাম পায়নি চাষিরা। আমাদেরও মজুরির সমস্যা হচ্ছে।’’ গ্রামেরই যুবতী শুকরমনি সরেন বললেন, ‘‘গ্রামে কাজ দিতে হবে। না হলে কোনও পরিবার ভালো থাকবে না। লেখাপড়া শেখাতে হবে বাচ্চাদের, তার জন্য স্কুল থাকতে হবে।’’
বামফ্রন্টের পক্ষে জামালপুর বিধানসভায় দায়িত্বে সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির সদস্য অয়নাংশু সরকার। জামালপুরে সিপিআই(এম) এরিয়া দপ্তর হরেকৃষ্ণ কোঙার স্মৃতি ভবনে তিনি বললেন, ‘‘অবৈধ বালি খাদানে সরাসরি অতিষ্ঠ এলাকার মানুষ। দিনে ৬ লক্ষ টাকার বেশি কামাই রয়েছে একেকটি খাদান থেকে। এই অবৈধ খাদান দামোদরকে ধ্বংস করছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভয়ঙ্কর।’’
ডিওয়াইএফআই রাজ্য সভাপতি অয়নাংশু বলছেন, ‘‘আলুর বস্তা থেকেও টাকা লুটেছে তৃণমূল। যে কৃষক ফসলের  দাম পাননি তাঁকেই ১০-১২ টাকার বস্তা কিনতে হয়েছে ৩৫-৫০ টাকায়।’’
বড় রাস্তা ছেড়ে গ্রামের ভেতরে ভেতরে পৌঁছালে বোঝা যাচ্ছে অবস্থা কী। রাস্তা ভাঙা অনেক জায়গায়। সন্ধ্যের পর সোলারে আলো রয়েছে বহু দূরে দূরে। মাঝপথে কয়েকশো মিটার অন্ধকার। শহরে তৃণমূল সরকার পার্কে আলো দিয়ে ভাসাচ্ছে। আর দূর গ্রামের জনজীবন টিকে রয়েছে টিমটিমে আলোর ভরসায়।
জামালপুরেই ২০০০ সালে হয়েছিল বারলাঘাট সেতু। দামোদরের ওপর সেই সেতু জুড়ে দিয়েছিল ওপারে হুগলীকে। বামফ্রন্ট সরকারের সময়েই হয়েছিল কলেজ। সেই কলেজে নিয়োগ নেই, নতুন বিভাগও হয়নি। 
সিপিআই(এম) জামালপুর এরিয়া সম্পাদক সুকুমার মিত্র বলছেন, ‘‘প্রচারে যেভাবে সাড়া মিলেছে এক কথায় তা অভূতপূর্ব।’’ তিনি বলছেন, ‘‘গতবার তৃণমূলের হয়ে বুথ দখল করেছে এমন লোকজন এখন গালাগালি দিচ্ছে ওদেরই। তার প্রধান কারণ আলুচাষির সর্বনাশ। তার পর হিমঘরের টেকেন বিলির নামে দুর্নীতি হয়েছে। কৃষক সব হারিয়েছে। সেই ক্ষোভ চরমে।’’ তিনি বলছেন, ‘‘প্রচারে যেভাবে সংখ্যালঘু পরিবারের মহিলারা বেরিয়ে এসেছেন ভাবা যায়নি।’’
গত নির্বাচনে এই কেন্দ্রের বামফ্রন্টের পরাজয়ের বড় কারণ বিজেপি’র ভোট বৃদ্ধি। সেই ফাঁকে জিতেছিল তৃণমূল। একেবারে মেঠো রাস্তায় দু’ধারে বাড়ির মাঝে প্রচার করছিলেন স্থানীয় যুবনেতা সন্দীপ সাঁতরা। পেশায় আইনজীবী সন্দীপ বললেন, ‘‘বিজেপি তো কৃষকের বিরুদ্ধে আইন করেছিল। আলুচাষির সর্বনাশের সময় কোনও লড়াইয়ে দেখাও যায়নি। বিজেপি-র চেহারা মানুষ দেখেছেন। বিজেপি নেতাদের তৃণমূলে এবং উলটোটা, এই যাতায়াতও দেখেছেন সবাই।’’
বামফ্রন্ট প্রার্থীর গ্রামের প্রচার চলছে টোটোয় মাইক বেঁধে। তৃণমূলের দুর্নীতির, অনুন্নয়ন নিয়ে চলছে প্রচার। সেই সঙ্গে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের শ্রম কোড, বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে উঠছে স্লোগান। 


সন্দীপ বললেন, ‘‘এখানে বিজেপি’র জনসভায় এসেছিলেন অমিত শাহ। মাঠ ফাঁকা দেখে দশ মিনিটের মধ্যে বক্তৃতা গুটিয়ে চলে যান। এসেছিলেন তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জি। লোক হয়নি। আর প্রার্থী সমর হাজরাকে নিয়ে মীনাক্ষীদি (মুখার্জি)-র মিছিলে আমরা ভাবতে পারিনি কোথা থেকে এত মানুষ এল।’’
প্রার্থী সমর হাজরা বলছেন, ‘‘প্রতি বুথে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রত্যেক বাড়িতে কথা হয়েছে। মানুষের সঙ্গে কথা বলে একশো শতাংশ আশাবাদী। এই আসনে বামফ্রন্ট জিতবে।’’

Comments :0

Login to leave a comment