CPI-Madurai Party Congress

বহু শহীদ, আন্দোলনের স্মৃতি আঁকড়ে আবার প্রস্তুত মাদুরাই

জাতীয়

সঞ্চারী চট্টোপাধ্যায়: মাদুরাই

  দম ফেলার ফুরসত নেই রেণুকার। হোটেলের বাইরে, ভিতরে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। পেশায় এলআইসি এজেন্ট। কিন্তু এ ক’দিন কাজ থেকে সম্পূর্ণ ছুটি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ‘কমরেড’দের দেখভালের দায়িত্বে তিনি। দৌড়াদৌড়ি করতে করতে খানিক হাঁফ ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নিজের শহরে পার্টি কংগ্রেস হচ্ছে। দেশের নানা কোণ থেকে আমার আপনজন, আমার কমরেডরা আসছেন। এটুকু তো করতেই হবে।’ 
তামিলনাডুর মধ্যেই শুধু নয়, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই শহর মাদুরাইয়ে সিপিআই(এম)’র ২৪তম কংগ্রেস শুরু হচ্ছে বুধবার থেকে। তামিল ভাষায় মাদুরাই শব্দের অর্থই হলো ‘মুধুর’, ইংরেজি তর্জমায় যার মানে দাঁড়ায় প্রাচীন শহর। উৎসব, আন্দোলনের শহর মাদুরাই, রাজ্যের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসাবে পরিচিত। কমিউনিস্ট আন্দোলনের শক্ত এই ঘাঁটিতে এর আগে আরও দু’বার বসেছে পার্টি কংগ্রেস আর তামিলনাডুতে এবার নিয়ে পাঁচ বার (চেন্নাই এবং কোয়েম্বাটুর)। আগের পার্টি কংগ্রেসগুলির অভিজ্ঞতা শুধু বড়দের মুখে শুনেছেন রেণুকা, নির্মলা, শারামারানরা। সাক্ষী থাকতে পারেননি। তাই কেপি জানকী আম্মাল, শঙ্করাইয়া, রামামূর্তির মাটিতে এবারের পার্টি কংগ্রেসের আয়োজনে কোনও ফাঁকই রাখতে চাইছেন না রেণুকারা। বিমানবন্দর থেকে রেলস্টেশন, হোটেলের পর হোটেল, সম্মেলন প্রাঙ্গণ সহ শহরজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন তাঁরা।
স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বর্তমান রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে তামিলনাডু এবং বিশেষ করে মাদুরাইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আজকের ভারতে যখন মন্দির-রাজনীতির রমরমা, তখন ‘মন্দির শহর’-এ কিন্তু সঙ্ঘ-বিজেপি পদ্ম ফোটাতেই পারেনি। শুধু মাদুরাই নয়, তামিলনাডু এবং পুদুচেরি মিলিয়ে ৪০ লোকসভা আসনের একটিতেও জয়ী হতে পারেনি নরেন্দ্র মোদীর বাহিনী। এক দেশ, এক ভোট, এক দেশ, এক ভাষা সহ আরএসএস’র ঘৃণ্য নীতির বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বামপন্থীরা। 
অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস হয়েছিল এই শহরে। সেই ১৯৫৩ সাল, সেসময় কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রেট ব্রিটেনের নেতা হ্যারি পলিট এসেছিলেন মাদুরাইয়ে। সে সময়ে পার্টি নেতৃবৃন্দ তৎকালীন নেহরু সরকারের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প গঠন সম্পর্কে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, বোঝাপড়া ব্যক্ত করেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে সেই পার্টি কংগ্রেস মাইলফলক হিসাবে থেকে গিয়েছে। তার ১৯ বছর পর, ১৯৭২ সালে মাদুরাইয়ে বসে নবম পার্টি কংগ্রেস। দেশে তখন কর্তৃত্ববাদী আস্ফালন বাড়ছে। ওই পার্টি কংগ্রেসে উঠে এসেছিল, কর্তৃত্ববাদী অবস্থা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। যার পরিণতি দেখেছে দেশ ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারিতে। 
অস্পৃশ্যতা সহ তথাকথিত ‘নিচু’ জাতের মানুষদের বঞ্চনার বিরুদ্ধে তামিলনাডুতে বরাবর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি। মাদুরাই ষড়যন্ত্র মামলা, যার অন্যতম উদাহরণ। ১৯৪৬ সালে মিথ্যা অভিযোগে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার রামমূর্তি, শঙ্করাইয়াদের জেলবন্দি করে। কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বাড়তে থাকা শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের ঝাঁজকে টুঁটি টিপে মারতে বহু পার্টিকর্মীকেই জেলে ভরে দেওয়া হয়েছিল। এক বছর তাঁদের জেলে আটকে রাখার পর ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার একদিন আগে ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা সাতটায় তাঁদের মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেদিন তাঁদের ছাড়া হয়নি। পরের দিন অর্থাৎ ১৫ আগস্ট জেলের বাইরে পা রাখতে পারেন তাঁরা। জেল থেকে বেরিয়েই সরাসরি তাঁরা চলে যান স্বাধীনতা উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠানে। 
মাদুরাইয়ে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় ছিল ১৯৫২ সাল। প্রথম নির্বাচনে মাদুরাই উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ভোটে লড়েছিলেন পি রামমূর্তি। তিনি তখনও জেলবন্দি। কিন্তু ফলাফল বেরলে দেখা যায়, বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন তিনি। রামমূর্তি এবং কেটিকে থাঙ্গামানি একসময় মাদুরাই লোকসভা কেন্দ্র থেকেও প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এখন মাদুরাইয়ের সাংসদ সিপিআই(এম) নেতা সু ভেঙ্কটেশন। তিনি দু’বারের সাংসদ। এর আগে পি মোহনও জিতে দু’বার সাংসদ হয়েছেন। এই মাদুরাই থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামে সবথেকে বেশি সংখ্যক মহিলা কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। 
তাসখন্দে ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের সময় তামিলনাডু থেকে প্রতিনিধি দলে ছিলেন এমবিটি আচার্য। দেশে প্রথম মে দিবস পালন করেছিলেন তামিলনাডুরই কমরেড মলয়পুরম সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার। 
কে কনকরাজ, বালাকৃষ্ণান সহ রাজ্যের পার্টি নেতারা জানালেন, ১৯৬৪ সালে মাদুরাইয়ে ২৬টি পার্টি শাখা ছিল। এখন তা বেড়ে চারশো ছাড়িয়েছে। মাদুরাই শহর, শহরতলি, দিন্দিগুল এবং থেনি মিলিয়ে ২০ হাজারেরও বেশি পার্টিসদস্য এবং ১৮০০ পার্টি শাখা দিন রাত এক করে শ্রমিক-কৃষক সহ আমজনতার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তামিলনাডুজুড়ে এখন ৯৩ হাজার পার্টিসদস্য। যে তামুক্কম গ্রাউন্ডে বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে ২৪তম পার্টি কংগ্রেস, সেখানেই আগের দু’টি পার্টি কংগ্রেসও হয়েছে। কৃষক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা হান্নান মোল্লার স্মৃতিচারণায় জানা গেল, ‘আগের কংগ্রেসের সময় এতবড় হল ছিল না। মাদুরাই কর্পোরেশন সম্প্রতি এত বড় কনভেনশন হল তৈরি করেছে।’ 
এই কনভেনশন হলেই আগামী পাঁচ দিন পার্টির ভবিষ্যৎ আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হবে। বিভিন্ন রাজ্যের নেতৃবৃন্দের আলোচনায় উঠে আসবে লড়াই-সংগ্রাম এবং আগামীর দিশার কথা। সীতারাম ইয়েচুরি নগর এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও কোডিয়েরি বালাকৃষ্ণান মঞ্চের ঠিক মধ্যিখানে তৈরি করা হয়েছে কার্ল মার্কসের ম্যুরাল। দুপুরে যখন সবাই খেতে ব্যস্ত, তখন আপন মনে সেই ম্যুরালে তুলি চালাচ্ছিলেন মাঝবয়সি এক যুবক, বিজয়। বিজয় পেশায় রঙের মিস্ত্রি। মাদুরাই শহরেই বাড়ি তাঁর। পার্টিকর্মী নন। কিন্তু এমন একটি ‘অনুষ্ঠানে’র কাজে শামিল থাকতে পেরে বিজয় ‘বহোত খুশ’। ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে মুচকি হেসে কথাটা বলেই আবার কাজে মন দিলেন। 
চেন্নাই, ত্রিচি, মাদুরাই, কোভাই, থাঞ্জাভুর, তিরুনেলভেলি এবং রামানাথপুরমের পরপর ষড়যন্ত্র মামলা, কমিউনিস্টদের দমনপীড়নে ধীরে ধীরে এ রাজ্যে বামপন্থী আন্দোলনের শক্তি বাড়তে থাকে। ছাত্র-যুব-মহিলাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষকদের সংগ্রামে বারবার রক্ত ঝরেছে দাক্ষিণাত্যের এই রণভূমিতে। নিজেদের অধিকারের কথা বলায় মেয়েদের উপর চলেছে শারীরিক নির্যাতন। কৃষক তার জমির অধিকার চাওয়ায় খুন হয়েছেন। ন্যায্য মজুরির বদলে শ্রমিক খেয়েছেন পুলিশের লাথি। বহু শহীদের স্মৃতি বুকে আঁকড়ে মাদুরাই ফের পার্টি কংগ্রেস সফল করতে নতুন উদ্যমে সচেষ্ট হয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment