সেই নেতাই। সেই ৭ জানুয়ারি। সিপিআই(এম) বিরোধী তৃণমূল-মাওবাদী যৌথ ষড়যন্ত্রের সেই মাটিতেই এবার স্কুল পড়ুয়া, অভিভাবকদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হলো মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদাকে। শুধু তাই নয়, তৃণমূলের নেতাই দিবসকেও কার্যত বয়কটের পথে হাঁটলেন জঙ্গলখণ্ডের বাসিন্দারা।
জঙ্গলমহলের ‘উন্নয়ন’র চেহারা নিয়েই যেন দাঁড়িয়ে আছে লালগড়ের নেতাই হাইস্কুল। ৩১৭ জন ছাত্র-ছাত্রী। স্কলের শিক্ষক সংখ্যা মাত্র ৪। পরিস্থিতি এমনই যে লাবনী গোস্বামী, সঞ্চারী মণ্ডল, লক্ষ্মী ঘোড়াই, নবনীতা পাল, সুপ্রিম পাল সহ প্রায় ৬০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত স্কুলে এলেও তাদের নবম শ্রেণিতে ভর্তি নেওয়া হয়নি। ক্লাসও শুরু হয়নি। কারণ শিক্ষক নেই। আর এদিন যখন বিপুল সমারোহে ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তৃণমূলী বাহিনী মন্ত্রীর উপস্থিতিতে নেতাইয়ে দলীয় কর্মসূচি পালন করতে হাজির হয় তখন স্বাভাবিকভাবই গোটা গ্রামের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা ও অভিভাবকরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভে শামিল হন। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে, বেহালা রাস্তা ঠিক করার দাবিতে মন্ত্রীকে ঘিরে ধরে বিক্ষোভও চলে।
এতেই ক্ষিপ্ত হয় তৃণমূলী বাহিনী। অবরোধ ওঠাতে পালটা রুখে দাঁড়ায় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা। মাঝখানে ব্যারিকে হয়েড দাঁড়ায় পুলিশ। এরপরে পিছু হটে তৃণমূলী বাহিনী। রাজ্যের মন্ত্রী এলাকার বিধায়ক বীরবাহা হাঁসদা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁকে ঘিরে ধরে স্কুল পড়ুয়ারা বলে, ‘আমাদের স্কুলটা তুলে দিলে আমরা কোথায় পড়ব বলে দিন। নদী পেরিয়ে যেতে হবে।’ মন্ত্রীকে ঘিরে রেখে স্কুল পড়ুয়ারা ক্ষোভ উগরে দেয়। তারা বলে, ‘এবছর ক্লাস নাইনে ভর্তি নেয়নি স্কুল। তাদের টিসি নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বলেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।’ পরে এদিন রাতে মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ‘‘ওখানে ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে বলেছে স্কুলের সমস্যার কথা। আমিও যেটা বার বার বলেছি। স্কুলে নিয়োগ নিয়ে গোটা রাজ্যে সমস্যা রয়েছে।’’
ওই স্কুলে এখন ছাত্র-ছাত্রী ৩১৭জন। টিচার-ইনচার্জকে নিয়ে মোট স্থায়ী শিক্ষক মাত্র চারজন। সেই চার শিক্ষককে দিয়ে পঞ্চম থেকে দশম-ছ’টি শ্রেণি চালাতে গিয়ে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পঠনপাঠন। একাধিক ছাত্রীর আশঙ্কা, ‘নিজের গ্রামের স্কুলে পড়ার সুযোগ না পেলে আমাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে।’ ক্ষোভ বাড়ছে অভিভাবকদেরও। শক্তিপদ মণ্ডল, চঞ্চল গোস্বামী, সুদীপ পালের প্রশ্ন, ‘হাই স্কুলে পড়ানোর মতো কেন শিক্ষক নিয়োগ হলো না? গ্রামে হাই স্কুল থাকা সত্ত্বেও কেন ছেলেমেয়েদের বাইরের স্কুলে পাঠাতে হবে?’ টিচার-ইনচার্জ দেবাশিস গিরির কথায়, ‘‘শিক্ষকের অভাবে নবম-দশম শ্রেণি চালানো সম্ভব নয়। বাধ্য হয়েই নবমে ভর্তি বন্ধ রাখতে হয়েছে। নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণদের টিসি নিয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি হতে বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও কেউ টিসি নেয়নি। জানি না কী হবে!’’ তবে তিনি জানান, ‘‘পড়ুয়াদের কথা ভেবে এ বছর দশম শ্রেণি কোনও মতে চালানো হচ্ছে।’’
নেতাই স্কুলের পড়ুয়াদের শিক্ষক দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক রাস্তায় অবস্থানে তাল কাটল তৃণমূলের শহীদ তর্পণ দিবস। লালগড় সহ নেতাই গ্রামেরই সিংহভাগ মানুষ তৃণমূলের ডাকা এই দিবসকে বয়কট করেন। তার উপর স্কুল পড়ুয়াদের প্লাকার্ডে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক চেয়ে মিছিল সহ বিক্ষোভ অবস্থানে তৃণমূলের নেতাদের চক্ষু চড়কগাছ। ক্ষিপ্ত তৃণমূলের নেতারা তেড়ে গেলে স্কুল পড়ুয়ারা পালটা রুখে দাঁড়ায়। পুলিশ গিয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে।
নেতাই গ্রামের এই দৃশ্য স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যের শাসক তৃণমূলের প্রবল অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
দীর্ঘ আট বছর ধরে নেতাই হাইস্কুলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। নবম-দশম শ্রেণির পড়ানোর মতো অঙ্ক, জীবন বিজ্ঞান, ভৌত বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোলের শিক্ষক নেই। বারে বারে জানানোর পাশাপাশি একাধিক বার স্কুল পড়ুয়ারা লালগড়-নেতাইয়ের রাস্তায় বিক্ষোভ দেখালেও সুরাহা মেলেনি। এমনকি গত সাত বছর ধরে গ্রামের রাস্তাও বেহাল হয়ে পড়েছিল। আজকের নেতাই দিবস পালনের জন্য তিন দিন আগে এমন ভাবে মেরামত করেছে যে, রাস্তার ধারের ঘরে বৃষ্টির জল ঢোকার সম্ভাবনা থাকছে। এমনকি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর বহিরাগত বাহিনীর এই নেতাই দিবস পালন নিয়ে হুমকি, গায়ের জোর দেখানোর প্রতিযোগিতায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ। নেতাইকাণ্ড ঘটনার পিছনে যে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র ছিল তা আজ গ্রামের মানুষের অনেকেই উপলব্ধি করছেন।
netai
নেতাইয়ে পড়ুয়া-অভিভাবকদের বিক্ষোভের মুখে পড়লেন মন্ত্রী
×
Comments :0