বাংলার স্বাধিকার পুনরুদ্ধার করতে হলে সাম্প্রদায়িকতা, দুর্নীতি ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। খেটেখাওয়া মানুষের কথা তুলে ধরতে হবে মূল স্রোতের রাজনীতির অংশে। 'বাংলার পুনরুত্থান এবং বিকল্পের ভাবনা' বিষয়ক আলোচনা সভায় একথাই বললেন আলোচকরা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ৮২ তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রমোদ দাশগুপ্ত ট্রাস্ট এক আলোচনা সভা আয়োজন করেছিল। এদিন এই সভায় আলোচনা করেন চিকিৎসক অরুন সিংহ, প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক জহর সরকার, সমাজকর্মী এবং সাহিত্যিক অনিতা অগ্নিহোত্রী, অর্থনীতিবিদ রতন খাসনবিশ ও রঞ্জন প্রসাদ। এছাড়াও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেন গণনাট্য সংঘের শিল্পীরা। সভা পরিচালনা করেন আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য।
রবিবার সভায় প্রমোদ দাশগুপ্ত ট্রাস্টের তরফে বলেন সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, বিকল্প সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য কেন্দ্র গড়ে উঠবে। তা থেকেই আমাদের এই পরিকল্পনা। রাজ্যে গণতন্ত্র বিপন্ন। থ্রেট কালচার চলছে সমস্ত জায়গায়। তাই আমরা শপথ নিতে চাইছি ভয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আমরা বলছি ঐক্যবদ্ধ হোন, প্রতিরোধ করুন।"
তিনি বলেছেন যে ইরানে দেখছি শিশুরা নিহত। ভেনেজুয়েলায় রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করে তুলে নিয়ে গেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আমাদের দেশেরও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও চলে যাচ্ছে। হ্যাঁ আমাদের গণতন্ত্রের জন্য বিপদ।
আলোচনায় জহর সরকার বলেছেন, "আজকের প্রশাসনকে দেখলে পরিষ্কার হয় প্রশাসনিক দুরাবস্থা কাকে বলে। কেন্দ্রীয় সরকারের ৪৫ আধিকারিকের তালিকায় বাংলার একজন। আরেকটি খবর ৬৫ জন আইএএস মধ্যে বাঙালি মাত্র একজন। আমি যখন চাকরি করেছি তখনও কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। এখন প্রতিটি ক্ষেত্রে সংঘাত। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে দুর্নীতি। প্রশাসন সামান্য ব্যবস্থা নিলেও এমন দুর্নীতি হয় না। দুর্নীতিগ্রস্তদের দেওয়া হচ্ছে মুখ্যসচিবের দায়িত্ব।"
তিনি বলেছেন, "বিকেন্দ্রীকরণের অবস্থা খুবই খারাপ। পঞ্চায়েতে অর্থ পড়ে রয়েছে। কাজ হচ্ছে না। মনরেগা-তে দেখেছি মুর্শিদাবাদে ভুয়ো জব কার্ড। দেশে সবচেয়ে বেশি টাকা পেয়েছিল রাজ্য। কিন্তু দুর্নীতির জন্য মানুষকে সেই টাকা দেয়নি। টাকা বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সব জায়গায় দুর্নীতির ফল এমন হয়। আইন-শৃঙ্খলার অবস্থান শোচনীয়। কিন্তু এখন পুলিশ একেবারে যুক্ত হয়ে গিয়েছে। একমাত্র উপায় হলো বোঝানো যে প্রতিবাদ সাময়িক নয়। প্রতিবাদ দীর্ঘস্থায়ী।"
অর্থনীতিবিদ রতন খাসনবিশ বাংলার বিপন্নতার কথা বলতে গিয়ে এদিন পশ্চিমবঙ্গে মাথাপিছু বার্ষিক আয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "পশ্চিমবঙ্গ এখন ওড়িশারও নিচে। পশ্চিমবঙ্গে ১ লক্ষ ৩৯ হাজার আর ওড়িশায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়াও রাজ্যের মানুষ কেমন খরচ করতে পারে। সেই সূচক অর্থাৎ মাসিক গড়পড়তা ভোগব্যয় রাজ্য সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। স্বনিযুক্ত, নিয়মিত স্থায়ী কর্মরত, সব ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ নিচে। পশ্চিমবঙ্গে বেকারির হার তা’হলে কম কেন? আসলে এখানে মজুরির হার কম। সেই কারণেই অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছে। কাজ পায় কিন্তু মজুরি নেই। সে কারণে খরচ করতে পারে কম। মানুষের হাতে টাকা দেওয়া হচ্ছে। তার জন্য সরকারের স্বাভাবিক ব্যয় কাটছাঁট করা হচ্ছে। বাজেটে স্পষ্ট করে বলা নেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে কত টাকা খরচ করছেন। খুঁজে বের করতে হবে।"
আলোচনায় অনিতা অগ্নিহোত্রী বলেছেন, "এরাজ্যে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লক্ষের কাছাকাছি। বাংলা নিজের মেয়েকে চায়, কিন্তু বাংলার মেয়েরা কী চায় সেটা জানা দরকার। মেয়েদের বঞ্চনা এবং বৈষম্য বাংলায় নিয়ম হয়ে গিয়েছে। মজুরি কোথাও এক নয়। মেয়েদের মজুরি ন্যূনতম মজুরির চেয়ে অনেকটা কম। সংবিধানে সমান মজুরির কথা বলা রয়েছে। রাজ্য সরকার সেটা করছে না।"
তার কথায়, চটকল শিল্পে বিশাল মহিলা চুক্তি শ্রমিক রয়েছে। অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিল, আশাকর্মী। এদের ভাতা দেওয়া হয় মাইনে নয়।
রাজ্যে মেয়েরা কাজে যুক্ত হওয়ার হার ভারতীয় হারের চেয়ে কম। কী করে আসবে? আলাদা শৌচাগার, পোশাক পরিবর্তনের ঘর নেই। নেই নিরাপত্তা। অংগঠিত ক্ষেত্রে অভিযোগ করলে কাজ হারাতে হচ্ছে। সব স্তরে আইসিসি হওয়া দরকার। স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান রাজ্যের কেন্দ্রীয় স্তরে দেওয়া হয় না। কিশোরী বিবাহ, কিশোরী মাতৃত্ব রাজ্যে এক নম্বরে।"
ডাক্তার অরুণ সিং বলেছেন, "সমস্যার শিকড়ে যেতে হবে। পুনরুত্থানের কথা বলছি। বাংলাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাই। বাংলা একসময় সংস্কৃতি, শিল্পে এগিয়ে ছিল। যে শিশু আজ জন্মালো তার পরিচয় ছিল মানবসন্তান। তার কোনও ধর্মের পরিচয় ছিল না। আমেরিকার জন্ম নেওয়া শিশু, আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া শিশু আর এই বাংলায় জন্ম নেওয়া শিশুর কান্নার সুর এক।বিকল্পের আলোচনায়, পুনরুত্থানের আলোচনায় পিরামিডের একেবারে নিচের অংশকে রাখছি কিনা দেখতে হবে। সমাজের পিরামিড ব্যাখ্যা করেন তিনি। পরিবারেও পিরামিড আছে। শিশু এবং মা সবচেয়ে নিচের স্তরে। তাদের কথা ভাবতে হবে।"
তিনি বলেছেন, "যে উত্থানের কথা বলছি, সে বাংলা মানে 'আমার নাম তোমার নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম' সেই বাংলা মানে পৃথিবীর যে কোনও শোষিত মানুষের পক্ষেই সরব হতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যকে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। শিক্ষা যাতে মানুষ তৈরি করতে পারে সেটা দেখতে হবে।" সকলের জন্য শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
Comments :0