Police attack DYFI march demanding jobs

কাজের দাবিতে যুবদের মিছিলে তাণ্ডব পুলিশের

রাজ্য জেলা

জয়ন্ত সাহা ও অনিন্দিতা দত্ত: শিলিগুড়ি

বাড়ির ছাদ থেকে আন্দোলনকারী যুবক-যুবতীদের দিকে তাক করে টিয়ার গ্যাসের শেল ছুঁড়ছে মমতা ব্যানার্জির পুলিশ। শুধু তাই নয়, তিনবাত্তি মোড়ের অনেক আগে রাস্তার ধারে সাধারণ মানুষের বাড়ির ছাদে উঠে ইট, পাথর ছুঁড়তে দেখা গেল পুলিশকেই! 
যে বাড়ির ছাদ থেকে পুলিশ ডিওয়াইএফআই কর্মীদের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল, ইট ছুঁড়েছে, সেই বাড়ির লোকজনই রাস্তায় নেমে আহত যুব কর্মীদের জল দিয়ে, প্রাথমিক শুশ্রুষা করেছেন। এমনই এক বাড়ির গৃহবধূ সুমিতা সরকার বললেন, ‘‘পুলিশ আমাদের ছাদ ব্যবহার করছে, কিছুটা ভয়ে না করতে পারিনি। কিন্তু যখন জানালা দিয়ে দেখছিলাম ছেলেগুলো কাঁদানে গ্যাসের জন্য চোখ খুলতে পারছে না, পুলিশ এলোপাতাড়ি লাঠি চালাচ্ছে, তখন চুপ করে থাকতে পারিনি। বেরিয়ে এসে ছয় জনকে আশ্রয় দিয়েছি, ওদের বাঁচাতে। অন্যায় কিছু তো করিনি।’’
‘স্থায়ী কাজ দাও/ বিভাজন রুখে দাও’— এই কেন্দ্রীয় স্লোগানকে সামনে রেখেই ডিয়াইএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির ডাকে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিকে নিয়ে ‘উত্তরকন্যা চলো’র ডাক দেওয়া হয়েছিল। জনজীবনের জ্বলন্ত বিষয়, সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবন যন্ত্রণার কথা, বেকারের হাতে কাজের দাবি জানাতে উত্তরবঙ্গের ‘নবান্ন’ উত্তরকন্যায় যেতে চেয়েছিলেন যুবরা।
বিদেশে গিয়ে ‘গণতন্ত্রের বাণী’ বিলানো মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পুলিশ প্রশাসন সেই কর্মসূচি ঠেকাতে কার্যত ‘যুদ্ধং দেহী’ মেজাজে হামলা চালালো মিছিলে অংশ নেওয়া যুবক-যুবতীদের ওপরেই। জল কামান, টিয়ার গ্যাস, স্মোক বোম্ব, ইট, পাথর, লাঠিচার্জ, লোহার ব্যারিকেড, গোটা শহরকে সকাল থেকে অবরুদ্ধ করে রাখা— কোনও কিছু বাদ রাখেনি পুলিশ। পুলিশের ছোঁড়া পাথরের আঘাতে অন্তত ১৫ জন আন্দোলনকারী জখম হয়েছেন। লাঠির আঘাতেও একাধিক জখম। পাঁচ জন চিকিৎসাধীন। পুলিশ মীনাক্ষী মুখার্জি সহ ২৬ জন আন্দোলনকারীকে আটক করেছে। এছাড়াও বেশ কয়েকজন কর্মীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে রাতে এনজিপি থানার ভিতর থেকে অভিযোগ করেন মীনাক্ষী মুখার্জি।
তবুও জয় হয়েছে যুবশক্তির। লাঠির আঘাত নিয়ে, কাঁদানের গ্যাসে, জল কামানে ভিজেই সাদা পতাকা হাতে এগিয়েছেন যুবরা। রাস্তায় যত এগিয়েছেন তাঁরা সাধারণ মানুষও ততই যুক্ত হয়েছেন তাঁদের সঙ্গে। পিচগলা রাস্তা তখন যৌবনের দখলে। 
‘উত্তরকন্যা চলো’ কর্মসূচি ঘিরে শুক্রবার সকাল থেকেই ছিল রাজ্য পুলিশের বাড়াবাড়ি। বেলা বাড়তেই পুলিশের সেই অতি সক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল হিলকার্ট রোড, ফুলবাড়ি ক্যানেল রোড সহ শিলিগুড়ি প্রবেশের রাস্তায়। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয় শিলিগুড়িকে। বেলা বারোটার পর থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে আসা যুবকর্মীদের অন্তত ৫০টি গাড়ি পুলিশ এদিন আটকে দিয়েছে। আর বিকাল সাড়ে চারটার সময় বিনা প্ররোচনায় পুলিশ উত্তরকন্যা যাওয়ার পথে তিস্তা অ্যাডমিনিস্ট্র্বেশন বিল্ডিংয়ের সামনে পুলিশের গড়া ত্রিস্তরীয় বলয়ে ঘেরা ব্যারিকেডের ওপার থেকে জলকামান ব্যবহার করতে শুরু করে। মিছিলের পিছন দিকে রাস্তার পাশের সাধারণ মানুষের বাড়ির ছাদের ওপর থেকে টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটাতে শুরু করে। কোনোরকম প্ররোচনা ছাড়াই শুরু হয় নির্বিচারে লাঠিচার্জ।
বেলা ১টায় বিবাদী চকে সভা শুরুর কথা ছিল। আটকে পড়া যুবক-যুবতীরা তখন গাড়ি ছেড়ে কেউ ৮ কিমি কেউ বা ১০ কিমি দূর থেকে পায়ে হেঁটে শহরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। সভাস্থলে যুব নেতাদের কাছে ফোন আসছে, ‘‘আমরা আসছি, অপেক্ষা করুন, আমাদের বাদ দিয়ে উত্তরকন্যা চলো অভিযান শুরু করবেন না।’’ তখন সভা মঞ্চ থেকে পুলিশের উদ্দেশ্যে মীনাক্ষী মুখার্জি ও কলতান দাশগুপ্ত ঘোষণা করেন, ‘‘দশ মিনিটের মধ্যে আমাদের কর্মসূচিতে আসা যুবদের গাড়ি ছেড়ে না দিলে এখানেই পথ অবরোধ শুরু হবে।’’ 
দুপুর পৌনে দুটো নাগাদ জলপাই মোড়ে প্রথমে সভা শুরু হয়। ডিওয়াইএফ রাজ্য সভাপতি ধ্রুবজ্যোতি সাহার সভাপতিত্বে সভার কাজ শুরু হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন মীনাক্ষী মুখার্জি, হিমঘ্নরাজ ভট্টাচার্য, কলতান দাশগুপ্ত, শচীত খাতি। মীনাক্ষী মুখার্জি বলেন, আন্দোলনকারী যুবদের ভয় পাচ্ছে রাজ্য সরকার। আর সরকারের নির্দেশেই পুলিশ শিলিগুড়িকে আজ অবরুদ্ধ করেছে। ৫৩ বছর বেকারি বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে ২৮ মার্চ। এরমধ্যে পুলিশ কেন আসবে? উত্তরকন্যা তো এখন একটা রঙ্গিন ফানুস। ১৪ বছর ধরে উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ আসছে। কিন্তু কেন উত্তরের জেলাগুলিতে পরিযায়ী শ্রমিক বাড়ছে? মন্ত্রী উদয়ন গুহ আজ যুবদের ভয়ে উত্তরকন্যা ছেড়ে দিনহাটায় বসে গুন্ডামি করছেন। উত্তরকন্যা আসলে ঘুঘুর বাসা। এখানে বসে উত্তরের চা বাগানের জমি, নদীর বালি, পাথর লুট হচ্ছে। আর জাতের নামে, ভাষার নামে বিভাজনের রাজনীতি হচ্ছে।
এরপর শুরু হয় অভিযান। মিছিল যত এগিয়েছে ততই রাস্তার দু’ধারে সাধারণ মানুষকে মিছিলের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াতে দেখা যায়। মিছিল তখন নৌকাঘাটের কাছাকাছি। পুলিশ ততক্ষণে মাইকে ঘোষণা করতে শুরু করেছে ‘উত্তরকন্যা অভিযানের অনুমতি দেয়নি পুলিস প্রশাসন’। পালটা যুব নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের চিঠির কপি দেখিয়ে বলেন, ‘গত ২৫ তারিখে উত্তরকন্যা আমাদের এই চিঠি রিসিভ করেছে। চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা ছিল, আমরা আমাদের দাবি নিয়ে উত্তরবঙ্গের যুবরা মিছিল নিয়ে উত্তরকন্যায় যাবো। একটি ছোট প্রতিনিধি দল উত্তরকন্যায় গিয়ে দাবিসনদ নিয়ে আলোচনা করবেন।’ 
ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে যুব নেতা ধ্রুবজ্যোতি সাহা ঘোষণা করেন, ‘‘আমরা চাইলে দু’মিনিটে ব্যারিকেড ভেঙে উত্তরকন্যায় যেতে পারি। কিন্তু আমরা সেটা চাই না। আমরা এখানেই অবস্থানে বসছি। যতক্ষণ না আমাদের প্রতিনিধিদের উত্তরকন্যায় গিয়ে দাবিসনদ জমা দিতে দেবে না ততক্ষণ এই অবস্থান চলবে।’’
খানিক পরেই পুলিশ একইসঙ্গে জলকামান, টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটাতে শুরু করে। পুলিশের পাথরের আঘাতে যুব ও শিক্ষক নেতা দেবরাজ বর্মন ও গণেশ রায় গুরুতর জখম হন। পুলিশের লাঠির আঘাতে জখম হয়েছেন একাধিক।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মীনাক্ষী মুখার্জি, ধ্রুবজ্যোতি সাহা, কলতান দাশগুপ্ত শুভ্রালোক দাস, শম্ভু চৌধুরি সহ ২৬ জনকে আটক করে এনজেপি থানায় নিয়ে যায়। এঁদের মধ্যে ৬ জন গুরুতর জখম রয়েছেন। রাত ৯-৪৫ মিনিট নাগাদ মীনাক্ষী মুখার্জি সহ আটকদের থানা থেকে ছাড়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment