Mohan Bhagwat

ভাষা দিয়েই অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার নির্দেশ আরএসএস প্রধানের

জাতীয়

 অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত। একই সঙ্গে জানালেন, ভাষা শুনেই অনুপ্রবেশকারীদের ধরে ফেলে আরএসএস কর্মীরা। সেইভাবেই অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করার নির্দেশ দিলেন সঙ্ঘ প্রধান। রবিবার মুম্বাইয়ে সঙ্ঘে একশো বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে এই কথা বলেছেন ভাগবত। দেশের বিভিন্ন শহরে এক বছর ধরে এই অনুষ্ঠান করে চলেছে আরএসএস। সেখানে সমাজের নানা স্তরের লোকদের ডাকা হচ্ছে। তেমনই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল শনি-রবিবার। মুম্বাইয়ে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের বহু তারকা উপস্থিত ছিলেন। রবিবার সেখানে প্রশ্নোত্তরের আয়োজন করা হয়। ভাগবত জবাব দেন বিভিন্ন বিষয়ে। 
ভাগবত বলেন, কম জন্মহার, ধর্মান্তর এবং অনুপ্রবেশ এবং—এই তিনটি বিষয়ই জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতার প্রধান কারণ। তিনটি প্রসঙ্গেই ভাগবত তাদের দাওয়াই বাতলেছেন। জন্মহার বাড়ানো নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সরব হয়েছেন আরএসএস প্রধান। তিনি বলে চলেছেন, অন্তত তিনটি সন্তান হওয়া প্রয়োজন। এদিনও সেই কথা বলেছেন। সঙ্ঘপ্রধানের বক্তব্য অনুযায়ি, ‘‘ বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী’’ একটি পরিবারে তিনটি সন্তান থাকা উচিত। দ্বিতীয় বিষয় ধর্মান্তর বন্ধ হওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু ‘ঘর ওয়াপসি’ বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের হিন্দু বানানোর পক্ষেও সওয়াল করেছেন আরএসএস প্রধান। তবে এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যের মূল জোরের জায়গা ছিল অনুপ্রবেশ। যা এখন বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারেরও প্রধান ইস্যু। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ভোটকে ঘিরে লাগাতার অনুপ্রবেশ নিয়ে বলে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। মুসলিমদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে ঘৃণা ছড়ানো এবং  বিভাজনের রাস্তা করতে চাইছেন তাঁরা। ভাগবতও এদিন সেই বিষয়েই সুনির্দিষ্ট ‘গাইডলাইন’ দিয়েছেন বলা যায়। 
অনুষ্ঠানে ভাগবত বলেন, “অনুপ্রবেশের বিষয়ে সরকারের অনেক কাজ করতে হবে। তাদের শনাক্ত করতে হবে এবং বহিষ্কার করতে হবে। আগে এটা হচ্ছিলো না, কিন্তু এখন ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়বে। যখন জনগণনা বা এসআইআর পরিচালিত হয়, তখন অনেক মানুষ সামনে আসে যারা এই দেশের নাগরিক নয়; তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়’’। যদিও বিহারে যে এসআইআর হয়েছে, তাতে দেশের নাগরিক নন বা বিদেশি এমন বিশেষ কোনও তালিকা দিতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। একইভাবে বর্তমানে যে ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর হচ্ছে, সেখানেও প্রাথমিক খসড়া প্রকাশের পরে দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অনুপ্রবেশকারী আছে, তার কোনও প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু মোদী-শাহরা যেমন বলছেন, ভাগবতও তেমনই বলেছেন এদিন। 
এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যের পরের অংশটি তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু সরকার বা নির্বাচন কমিশন অনুপ্রবেশকারী খুঁজলে হবে না। সঙ্ঘ কর্মীদের করণীয় কী এই প্রসঙ্গে, সেটাও বাতলেছেন। ভাগবত বলেছেন, ‘‘আমরা শনাক্তকরণের ওপর কাজ করতে পারি। তাদের ভাষাই তাদের ফাঁস করে দেয়। আমাদের উচিত তাদের শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো। আমরা পুলিশকে জানাবো যে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে এরা বিদেশি, এবং পুলিশ তাদের তদন্ত করবে ও নজরদারিতে রাখবে; আমরাও তাদের ওপর নজর রাখব। আমরা কোনও বিদেশিকে চাকরি দেব না। আপনাদের একটু বেশি সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।” আরএসএস প্রধানের এই বক্তব্য বিপজ্জনক। বিশেষ করে বাংলাভাষীদের জন্য। কারণ পশ্চিমবঙ্গ, আসার, ত্রিপুরার বহু মানুষের কথ্য ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশের বহু জায়গার ভাষার মিল পাওয়া যায়। শুধুমাত্র এই কারণেই তাঁরা নিপীড়নের শিকার হতে পারেন। ইতিমধ্যেই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী শ্রমিকরা আক্রান্ত হয়েছেন। খুন হয়েছেন। ভাগবতের নির্দেশের পরে এই ঘটনা আরও বাড়বে তা স্পষ্ট। 
আরএসএস প্রধান এদিন আরও বিবিধ বিষয়ে মতামত দেন। তার মধ্যে ৭৫ বছর বয়সে তাঁর অবসরের প্রসঙ্গও ওঠে। জবাবে তিনি জানান, তাঁর ৭৫ বছর বয়স হয়ে গেছে সেটা তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। সঙ্ঘ তাকে কাজ চালাতে বলেছে। সঙ্ঘ বললেই তিনি পদ ছেড়ে দেবেন। সঙ্গে জুড়েছেন, আরএসএসে একশো বছরে কোনও সঙ্ঘপ্রধানকে জোর করে পদ ছাড়াতে হয়নি। আদতে যারা আরএসএস’র কাঠামো সম্পর্কে অবগত, তারা জানেন আরএসএসে এমন কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই নেই। বর্তমান প্রধানই পরের প্রধানকে মনোনীত করেন। ফলে তার অবসরের বিষয়টিও সঙ্ঘ প্রধানের ইচ্ছের উপরেই নির্ভরশীল। আসলে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ৭৫ বছর বয়সের সীমা দেখিয়ে আদবানি, যোশী প্রমুখকে রাজনীতির বানপ্রস্থে পাঠিয়ে ছিলেন। কিন্তু এখন নিজের ৭৫ বছর হওয়ার পরে মোদীও অবসর নিচ্ছেন না। সঙ্ঘ প্রধানও নিজের পদে আসীন আছেন। এই নিয়েই আরএসএস-বিজেপি’র মধ্যে মৃদু হলেও আলোচনা প্রকাশ্যে এসেছে। সেই বিষয়টিকে চাপা দিতেই এদিন ভাগবত এমন কথা বলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। 
আরএসএসে কোনও জাতের বিষয় নেই, এসসি-এসটি-ওবিসি যে কেউ সঙ্ঘপ্রধান হতে পারেন বলে দাবি করেছেন মোহন ভাগবত। সেটাও সম্পূর্ণভাবে সত্যের অপলাপ বলে মনে করিয়ে দিয়েছেন আরএসএস সম্পর্কে ওয়াকিবহালরা। একশো বছরে মোহন ভাগবতকে নিয়ে আরএসএস’র মোট ৬ জন সরসঙ্ঘচালক হয়েছেন। এদের মধ্যে ৫ জনই ব্রাহ্মণ এবং মহারাষ্ট্রের ব্রাহ্মণ। অন্যজন উত্তর প্রদেশের রাজপুত-ঠাকুর। সকলেই জাত ব্যবস্থার উঁচু জাতের। সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ার, এম এস গোলওয়ালকার, বালাসাহেব দেওরস- পরপর তিন সঙ্ঘপ্রধানই ছিলেন মারাঠী ব্রাহ্মণ। এরপরে প্রথম অমারাঠী এবং অব্রাহ্মণ হিসাবে আরএসএস’র প্রধান হন রাজেন্দ্র সিং বা রাজ্জু ভাইয়া। ঘটনাচক্রে তিনিই সব থেকে কম সময়ের জন্য সঙ্ঘ প্রধান হয়েছিলেন। এরপরে ফের মহারাষ্ট্রীয় এবং ব্রাহ্মণে ফিরে যায় আরএসএস। সঙ্ঘপ্রধান হন কে এস সুদর্শন, তারপর ২০০৯ সাল থেকে রয়েছেন মোহন ভাগবত। ব্রাহ্মণ এবং মহারাষ্ট্রীয়। আরএসএস প্রধান এদিন ফের দাবি করেছেন, ভারতে জাতব্যবস্থা এখন মূলত স্বার্থপরতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই টিকে আছে, কারণ জাতের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহ্যগত পেশাভিত্তিক কাঠামো বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মনুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে হিন্দু সমাজের যে চতুর্বর্ণ ব্যবস্থা, সেটাকে অস্বীকার করার জন্য আরএসএস বহুদিন ধরেই জাত কাঠামোকে পেশাগত সুবিধার কারণে বিভাজন বলে দেখানোর চেষ্টা করে। এদিনও সেই অবস্থানে অনড় থেকেই ভারতের জাত ব্যবস্থার বাস্তবতাকেই অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন আরএসএস প্রধান। 
সাভারকরকে ভারতরত্ন দেওয়া হচ্ছে না কেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে এদিন ভাগবত বলেছেন, সাভারকরকে ভারতরত্ন দিলে ভারতরত্নেরই সম্মান বাড়বে। বাংলাদেশে হিন্দুদের উপরে অত্যাচারের প্রসঙ্গে সঙ্ঘপ্রধান সেই দেশের হিন্দুদের পালিয়ে না গিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আরএসএস তাদের জন্য কী করবে, সে কথা স্পষ্ট করে বলেননি।

Comments :0

Login to leave a comment