Editorial

সংসদে পরা‍‌জিত

সম্পাদকীয় বিভাগ

সমস্ত রকমের কূটকৌশল প্রয়োগ করে এবং স্বয়ং সংসদে পড়ে থেকেও মহিলা সংরক্ষণ, আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গত এগারো বছরে এভাবে সংসদে মোদী সরকারের মুখে চুনকালি মাখতে আর দেখা যায়নি। ৫৬ ইঞ্চি ছাতিওয়ালা বিশ্বগুরুকে সম্মিলিত বি‍রোধী জোট বুঝিয়ে দিয়েছে তিনি অপরিহার্য নন। ক্ষমতার সিংহাসন হাতছাড়া হতে আর বেশি দেরি নেই।
সংসদে গোহারা হেরে মোদীরা প্রচারে ঝাঁপিয়েছেন এই বলে যে বিরোধীরা মহিলাদের বিরোধী। চায় না মহিলারা বেশি সংখ্যায় সংসদে যাক, নীতি নির্ধারণের অংশীদার হোক। কিন্তু মোদীদের এহেন প্রচারও শঠতায় ভরা। বস্তুত মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে বিরোধীরা কোনও বিরোধিতা করেননি। তারা আসলে বিরোধিতা করেছেন আসন পুনর্বিন্যাস বিলের। মোদীরা তাদের ক্ষমতা রক্ষার সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে মহিলা বিলকে আসন পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে একসঙ্গে পাশ করানোর অসৎ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তাই মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ না হবার দায় বিরোধীদের উপর বর্তায় না। তার দায় পুরোপুরি মোদী সরকারের। বিরোধীরা বার বার বলেছিলেন মহিলা সংরক্ষণ বিল, আসন পুনর্বিন্যাস বিল এবং কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বিল আলাদা আলাদাভাবে ভোট করার। কিন্তু মোদীরা তা করেননি তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণ হবে না বলে। আলাদা ভোট হলে সরকার পক্ষ ও বিরোধী পক্ষের সব ভোটে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ হয়ে যেত। কিন্তু আটকে যেত বাকি দু’টি বিল। মোদীরা সেটা চাননি।
মোদীদের কাছে মহিলা সংরক্ষণ বিল থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আসন পুনর্বিন্যাস বিল। কারণ আগামী লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরতে হলে আসন পুনর্বিন্যাস ছাড়া কোনও উপায় নেই। মনে রাখতে হবে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর উত্তরোত্তর মোদী জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি বেড়েছে। ২০১৯ সালে তুঙ্গে বৃহস্পতি হয়ে যায়। তারপর থেকে ধাপে ধাপে মোদী সরকারের ধার ও ভার পড়তির দিকে। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা হারিয়ে টিডিপি এবং জেডিইউ-র সমর্থনে কোনও রকমে সরকার গড়তে সক্ষম হয় বিজেপি। সাম্প্রতিককালে দেশে-বি‍দেশে মোদী সরকার বারে বারে ধাক্কা খেয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছে‍ছে যে আগামী ২০২৯ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফেরা পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে গেছে।
এই অবস্থায় ২০২৩ সালে পাশ হওয়া মহিলা সংরক্ষণ বিলকে কার্যকর না করে নতুন করে সংশোধনের জন্য নিয়ে আসে সংসদে। তার সাথে আনে আসন পুনর্বিন্যাস বিল। তাতে লোকসভার বর্তমান আসন সংখ্যা ৫৪৪ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার ব্যবস্থা হয়েছে। উদ্দেশ্য এর ফলে উত্তর ভারতের গো বলয়ের জনবহুল বড় রাজ্যগুলিতে বাড়বে বেশিরভাগ আসন। তুলনায় অনেক কম বাড়বে দক্ষিণ ভারত, পূর্ব ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের ছোট রাজ্যগুলিতে। বিজেপি-র এই মোক্ষম চালে তাদের শক্ত ঘাঁটি গোবলয়ের জোরেই তারা সহজে ক্ষমতা দখল করতে পারবে। অবশিষ্ট ভারতের কোনও দরকারই হবে না। বিরোধীরা এই শয়তানি বরদাস্ত করবে না বুঝেই তার সঙ্গে মহিলা বিলকে জুড়ে দিয়ে বিরোধীদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির ছক কষে। কিন্তু বিরোধীরা সব ছক বরবাদ করে দিয়েছে।
বিজেপি যদি সত্যি সত্যি মহিলা সংরক্ষণ চাইত তাহলে ২০২৩ সালের বিলেই ২০২৯ সালের ভোটে সেটা লাগু করার ধারা যুক্ত করতো। কিন্তু তা করেনি। এখন সেই পাশ হওয়া বিল ফের সংশোধন করছে ২০২৯ সা‍লে কার্যকর করার জন্য। এখন খারিজ হলেও ২০২৩ সালে পাশ হওয়া বিল অটুট আছে। সরকার চাইলে তাকে ২০২৯ সালে কার্যকর করার জন্য সংশোধন করতে পারে। বিরোধীরা সমর্থন করবে। কিন্তু আসন পুনর্বিন্যাসের বিলের সঙ্গে মহিলা বিলকে জড়ানো যাবে না। মোদীদের শঠতাকে বিরোধীরা কোনও অবস্থাতেই সমর্থন করবে না।

Comments :0

Login to leave a comment