ডাঃ মানস গুমটা
বাজার অর্থনীতিতে মানুষের কেনাকাটার অভিমুখ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ঝাঁ চকচকে বিশাল বিপুল শপিং মল আর অনলাইন কেনাকাটা দখল নিয়েছে আমাদের পরিচিত বাজারের। যা চাইবেন তাই পাবেন এই বাজারে। শপিং মলে এক ছাদের তলায়, অথবা এক ফোনে-চোখের পলকে । পালটে যাওয়া এই বাজারের ব্র্যান্ড ভ্যালু "ছাড়"। ছাড়ের নিরন্তর প্রতিযোগিতা। আগে বঙ্গবাসী সারা বছর অপেক্ষা করতো "চৈত্র সেলের"। এখন বছরের সব দিনেই "সেল", সব দিনেই "ছাড়"। মাঝে মধ্যে আবার মহা ধামাকা।
তবে আমাদের রাজ্যে, সরকারি হাসপাতালের "ফেয়ার প্রাইস শপ"গুলো ছাড়ের ব্যাপারে সবাইকেই টেক্কা দিচ্ছে। এক বিপুল "সেল" এর বাজার। বছর ভর, রাজ্যের সর্বত্র এই দোকানগুলোর ছাড় মোটামুটি ৫০ থেকে ৮০ শতাংশের আশেপাশে। বাজারে আলু পটল আপনি বেছে নিতে পারলেও, এই সব দোকানে বেছে নেওয়ার সুযোগ অবশ্য আমার আপনার নেই। ওরা ওদের পছন্দের ব্র্যান্ড দেবে। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। যা দেবে তাই নিতে হবে। চিকিৎসকরা জেনেরিক ওষুধ লিখলেও, আপনি পাবেন খুশি মতো দাম প্রিন্ট করা নানা ব্রান্ডের ওষুধ। পাঁচ টাকার ওষুধে পঞ্চাশ টাকাও প্রিন্ট থাকতে পারে। এই সব দোকানে বিক্রি হওয়া ওষুধ ঘাস পাতা বলছি না, তবে গুণমান পরীক্ষায় পাশ করে দোকানে এসেছে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। ফলে কতটা ওষুধ আর কতটা চকের গুঁড়ো বোঝা সম্ভব নয়। এই দোকানগুলো থেকে বিক্রি হওয়া ওষুধের গুণমান পরীক্ষার কোনও খবর সচরাচর পাওয়া যায় না। সরকারি অনুপ্রেরণায় চলা এই সমস্ত দোকানের ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণে প্রশাসন উৎসাহী বলেও জানা যায়নি।
অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সাপ্লাই অনিয়মিত। তালিকায় থাকলেও পর্যাপ্ত মেলে না। "স্টক আউট" প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। একই ওষুধের জন্যে বারবার আউটডোরে এসে-টিকিট এন্ট্রি করিয়ে-লাইন দিয়ে "রিপিট অল" লিখিয়ে-ফার্মেসির লাইনে গিয়ে দাঁড়ানোই এখন নিয়ম। তবে তারপরেও আপনার প্রয়োজনীয় ওষুধটি পাবেন তার নিশ্চয়তা নেই। ঘণ্টাখানেক লাইন দিয়ে কাউন্টারের মুখে পৌঁছেও শুনতে হতে পারে শেষ হয়ে গেছে বা এখন সাপ্লাই । ক্যানসার, কিডনি, লিভারের অসুখ ছেড়ে দিন— ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের বয়স্ক রুগীদেরও প্রতি হপ্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে লাইনে। না দাঁড়ালে হাতে পেনসিল ধরতে হবে। কারো সর্বনাশ হলে কারো পৌষ মাস হবেই। সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সাপ্লাই যত কমবে, "ফেয়ার প্রাইস শপ" এর তত পৌষ মাস।
সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মানুষের শিরদাঁড়ায় শীতল স্রোত বইয়ে, মাঝে মধ্যেই গুণমান পরীক্ষায় ফেল করা গুচ্ছ গুচ্ছ ওষুধের তালিকা প্রকাশিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে ৪০৭ টি ওষুধ "নট অব স্ট্যান্ডার্ড কোয়ালিটি" বলে রিপোর্ট পাওয়া গেছে। পরীক্ষা নিয়মিত হলে এই সংখ্যা আরও কতো হতো সেটা ভাবলে আতঙ্ক হবে বৈকি। এই তালিকার বেশিরভাগই আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও জীবনদায়ী ওষুধ। বাতিলের কারণ হিসাবে যা জানতে পারা যাচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হলো নিরাপদ, কার্যকর, গুণগত মান বজায় রাখতে "গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস" নির্দেশিকা কোম্পানিগুলি অনুসরণ করছে না। অনেক ওষুধের "স্টেরিলিটি ফেলিওর" বা মানে জীবাণু মুক্ত নয়। আবার কোনও কোনও ওষুধে ক্ষতিকর ক্ষুদ্র কঠিন কণার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
নিয়মিত ফেল করতে করতে বিখ্যাত!!!হয়ে উঠেছে আমাদেরই রাজ্যের দু’-একটি কোম্পানি। কিছুদিন আগে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে বেদনাদায়ক, দুঃখজনক মাতৃমৃত্যুর স্মৃতি এখনো তাজা। মৃত্যু না হলেও দূষিত স্যালাইন, ইনজেকশনে অসুস্থ হওয়ার খবর মাঝে মধ্যেই পাওয়া যায় রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে। কিন্তু মজার বিষয় হলো যে সমস্ত কোম্পানির ওষুধ বারবার ফেল করছে-তাদের শাস্তি হলো কিনা, তারা ব্ল্যাক লিস্টেড হলো কিনা, তাদের উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে কিনা— এসব জানতে পারা কার্যত অসম্ভব। ফলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে তাদের সাম্রাজ্য চলছে বহাল তবিয়তে।
তবে শুধু আমাদের রাজ্যের নয়, ভিন রাজ্যের বেশ কিছু কোম্পানির ওষুধও বাতিল তালিকায় থাকছে। পরীক্ষায় ফেল করা এই সমস্ত ওষুধ কতদিন মার্কেটে বিক্রি হয়েছে, কতো মানুষ খেয়েছে, কত মানুষ এই সমস্ত নিম্নমানের দূষিত ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হয়েছে তার হিসাব স্বাস্থ্য প্রশাসন রাখে বলে মনে হয় না। অবশ্য বেশি খোঁজ নিলে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসতে পারে। তার চেয়ে সিনিয়র-জুনিয়র ডাক্তারদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে, জনগণকে স্ক্যানার নিয়ে ওষুধ কেনার নিদান বাতলে দিলে ঝঞ্ঝাট কমে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার-আমাদের রাজ্যের পরীক্ষায় ড্যাং ড্যাং করে পাশ করে যাওয়া কিছু ওষুধ অন্য রাজ্যের পরীক্ষায় ফেল করার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এ এক অদ্ভুত রহস্য। মানুষের জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার দায় কোনও সরকার কি এড়াতে পারে?
অন্যদিকে আসল কোম্পানির প্যাকেজিং লোগো, রং, ডিজাইন, স্টিকার, কিউ আর কোড—সব কিছু হুবহু কপি করে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে নতুন স্টিকার লাগিয়ে নতুন বলে বিক্রি করার খবর আসছে। ২০২৫ সালে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলায় তল্লাশিতে মৃগী, ক্যানসার, ডায়াবেটিস সহ একাধিক জাল ওষুধ ধরা পড়ার খবরে মানুষের শিরদাঁড়ায় শীতল স্রোত বইছে। তথ্য বলছে পশ্চিমবঙ্গে কোভিডের পর জাল ওষুধের প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ।
শুধু জাল ওষুধ, ভেজাল ওষুধ, চকের গুঁড়ো মেশানো ওষুধ নয়-গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো ভয়ঙ্কর বিপদ ওষুধের দাম। প্রতিদিন ঝড়ের বেগে বাড়ছে। মানুষ ঘটিবাটি বেচে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। ১৯৭৫ সালে "হাথি কমিটি"র গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল সঠিক গুণমানের ওষুধ, কম দামে, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। ড্রাগ প্রাইস কন্ট্রোল অর্ডার বা সংক্ষেপে ডিপিসিও ভারত সরকারের ১৯৫৫ সালের "অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনে"র কার্যকর নির্দেশিকা। যার মূল উদ্দেশ্য হলো "জরুরি ওষুধ সাশ্রয়ী মূল্যে জনগণের জন্য সহজলভ্য করা"। ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটির অতীতে ওষুধের দাম নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে কিছু ভূমিকা ছিল। কিন্তু উদারীকরণের পথে এই সংস্থার বর্তমান অ্যা জেন্ডাই হলো ওষুধ কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ানো ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা। ড্রাগ প্রাইস কন্ট্রোল অর্ডারে নিয়ন্ত্রিত ওষুধের সংখ্যা ক্রমাগত কমে গেছে। আর কোম্পানিগুলি পেয়েছে লাভের অঙ্ক বাড়ানোর অনুমতি। ১৯৭৫ সালে ওষুধ কোম্পানিগুলি সর্বোচ্চ লাভ করতে পারতো উৎপাদন মূল্যের উপর ৪০ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে সেটাই বাড়তে বাড়তে পৌঁছে গেল ১০০ শতাংশে। আর ২০১৩ সালে হয়ে গেল আমূল পরিবর্তন। মূল্য নির্ধারণ এখন বাজারের হাতে। অর্থাৎ কোম্পানিগুলি নিজেরাই ঠিক করে নেবে কোন ওষুধ তারা কি দামে বিক্রি করবে-আর কতো লাভ করবে। শুধু তাই নয় উপরি হিসাবে কোম্পানিগুলি প্রতি বছর তাদের উৎপাদিত ওষুধের দাম ১০ শতাংশ করে বাড়াতে পারার অনুমতিও পেয়ে গেছে। মানে ফুর্তি-ই-ফুর্তি।
একদিকে জাল ওষুধ, ভেজাল ওষুধ, দূষিত ওষুধ বা চকের গুঁড়ো মিশ্রিত ওষুধ, অন্যদিকে ওষুধের দামে পুড়তে পুড়তে ঘটিবাটি বেচে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। আশার কথা এই লুট ও জীবন নিয়ে খেলার বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামছে।
তাই আগামী পথ চলায় কয়েকটি বিষয়ে নজর রাখা জরুরি। বর্তমান পণ্য বা প্রোডাক্ট পেটেন্টের পরিবর্তে, নীতির বদল ঘটিয়ে-ফিরতে হবে অতীতের প্রসেস বা প্রক্রিয়া পেটেন্ট ব্যবস্থায়। ওষুধের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য নির্ধারিত হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে। বাধ্যতামূলক হবে উৎপাদন খরচ-বিতরণ খরচ প্রকাশ করা। তাছাড়া নির্ধারিত দামের বেশি নিলে জরিমানা, নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনে কঠোর শাস্তি। পুনরাবৃত্তি হলে কোম্পানিকে ব্ল্যাকলিস্ট করা। ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (NPPA) ও সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশনকে ( CDSCO ) স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ ভূমিকা নিতে হবে। কারখানায় ওষুধ তৈরির সময় থেকেই রিয়েল-টাইম গুণমান পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যাতে কোনোভাবেই নিম্নমানের ওষুধ বাজারে না আসে। গুণমান পরীক্ষায় ফেল করা ওষুধের নাম প্রকাশ করতে হবে, সেইসঙ্গে কোম্পানির তথ্য।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওষুধে জিএসটি থাকবে কেন? অনেক জরুরি ওষুধে এখনো জিএসটি আছে। শুধু ক্যানসার বা ইমিউনোথেরাপির মতো দামি ওষুধ নয়— মানুষের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ওষুধ— যেমন অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসারের ওষুধ সহ অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধ জিএসটি শূন্য করতে হবে। ইলেক্টরাল বন্ড ও কর্পোরেট ওষুধ কোম্পানির অবদানের দগদগে ঘা এখনও শোকায়নি। ওষুধ কোম্পানি ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে অস্বচ্ছ ও দুর্নীতিগ্রস্ত যোগসাজশ বন্ধ করা জরুরি।
সর্বোপরি স্বাস্থ্য মন্ত্রক/স্বাস্থ্য প্রশাসন অন্যের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে চেয়ার অলঙ্কৃত করে বসে থাকবে— এটা দিনের পর দিন চলতে পারে না। মানুষ তাদের দায়বদ্ধতা দেখতে চায়।
সরকারি হাসপাতালের "ফেয়ার প্রাইস শপ" ছাড়ের ব্যাপারে সবাইকেই টেক্কা দিচ্ছে। এক বিপুল "সেল" এর বাজার। ছাড় মোটামুটি ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ। চিকিৎসকরা জেনেরিক ওষুধ লিখলেও, আপনি পাবেন খুশি মতো দাম প্রিন্ট করা নানা ব্রান্ডের ওষুধ। এই ওষুধকে ঘাস পাতা বলছি না, তবে গুণমান পরীক্ষায় পাশ করে এসেছে কিনা প্রশ্ন তো থেকেই যায়।
Comments :0