ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (ILO) যৌথভাবে প্রকাশিত ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪ অনুসারে, ভারতের কর্মক্ষম জনসংখ্যা ২০১১ সালে ছিল ৬১ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২১ সালে ৬৪ শতাংশ হয়েছে এবং ২০৩৬ সালে তা ৬৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর অর্থ ১৮-৬০ বছর বয়সি যারা কাজ করতে সক্ষম তারাই মোট জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশ। কিন্তু উদ্বেগজনক ভাবে এই কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের শতাংশ ২০২২ সালে মাত্র ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। অর্থাৎ ৬৩ শতাংশই কোনও কাজকর্মে যুক্ত নয়, মানে তাদের কোনও কাজ জোটেনি। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি-এর (CMIE) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ভারতে বেকারত্বের হার ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৭.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালের আগস্টে ৮.৫ শতাংশ থেকে সামান্য কমেছে। তবে অপরদিকে শ্রম অংশগ্রহণের হার ৪১.৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪১ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের হার ২০২৪ আগস্টে ৩৮ শতাংশ থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ৩৭.৮ শতাংশ হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন তখন বেকারত্বের হার ছিল ৫.৪৪ শতাংশ। অথচ ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ তারিখে শ্রম ব্যুরো প্রকাশিত পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS) তথ্য প্রকাশ করে দাবি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য বেকারত্বের হারে কোনও বড় পরিবর্তন হয়নি। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার (LFPR) ২০১৭-১৮ সালে ৫০.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ৬৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে এটি ৪৭.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫২.০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় বেকারত্বের হার ২০১৭-১৮ সালে ৫.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩-২৪ সালে ২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে এটি ৭.৭ শতাংশ থেকে কমে ৫.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তাহলে নরেন্দ্র মোদীর ১১ বছরের শাসনকালে বেকারত্বের হার ৫.৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালের আগস্টে ৮.৫ শতাংশ হলো কি ভাবে? কোনও ব্যাখ্যা নেই। ‘মিথ্যা বলো, বারবার বলো – এই মিথ্যাকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করো’; গোয়েবেলসীয় এই ফর্মুলা মেনে ধারাবাহিক ভাবে তথ্যের কারচুপি চালিয়েও, দেশজোড়া বেকারত্বের ভয়াবহ চেহারার বাস্তবতাকে ঢাকা দিতে পারছেন না নরেন্দ্র মোদী। মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GDP) বৃদ্ধির হারের ঢক্কানিনাদে বৈষম্যের আসল চেহারাটাকেই আড়াল করার অদম্য প্রয়াস চালাচ্ছেন মোদী। সহজ অঙ্কেই দেখা যায় ১৪০ কোটি মানুষ আর দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমবেশি ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, মানে মাথাপিছু জিডিপি ২৮০০ মার্কিন ডলার। শুধুমাত্র আদানি-আম্বানিকে যদি সরিয়ে রাখা যায় তাহলে মাথাপিছু জিডিপি নেমে আসে ২৭০০, আর উপরের ৫ শতাংশ অতি ধনীদের সরিয়ে রাখলে তা নেমে আসবে ১১৩০ ডলারে। অর্থাৎ ৯৫ শতাংশ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে মাথাপিছু জিডিপি মাত্র ১১৩০ মার্কিন ডলার, যা আফ্রিকার অনেক দেশের চাইতে কম। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, আনুমানিক ৩০ কোটি শ্রমজীবী মানুষ অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিযুক্ত এবং অকৃষি ক্ষেত্রের মোট শ্রমিকের ৭৩.২% অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। জানুয়ারি, ২০২৫ প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে কৃষি ক্ষেত্রে ১৬ কোটির বেশি অসংগঠিত শ্রমিক নিযুক্ত ছিলেন এবং গৃহস্থালী কাজে নিযুক্ত শ্রমজীবীর সংখ্যা ছিল ২.৮ কোটিরও বেশি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ অর্থবর্ষে কর্মসংস্থানের সংখ্যা আনুমানিক ৬৪.৩ কোটি বলে দাবি করা হয়েছে। দেশের জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশের বয়স ১৮-৬০। অর্থাৎ প্রায় ৯০ কোটি মানুষ কর্মক্ষম। যদি সরকারি দাবি মানাও হয়, তাহলেও প্রায় ২৬ কোটি কর্মক্ষম মানুষের হাতে কোনও কাজ নেই। যত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা কমবে চাহিদা ততই কমতে থাকবে, দেশের অর্থনৈতিক অধোগতিও বাড়তে থাকবে। অবশ্যই আম্বানি আদানির সম্পদ বাড়লেই মোদী খুশি, বাকি বেকার বাহিনী নিয়ে উনি চিন্তিত নন।
Editorial
ফুলছে অতি ধনী বাড়ছে বেকারত্ব

×
Comments :0