মোনালিস সিনহা
‘ভোটার তালিকায় আমার নাম ফিরিয়ে দাও’ এই দাবিতে আগামী ২৫সেপ্টেম্বর ধর্মতলায় সমবেত হবেন এ রাজ্যের ভোটাধিকার হারানো অসংখ্য মানুষ, তাঁদের নিয়ে আমরা যাবো মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)’র দপ্তরে। নির্বাচন কমিশনকে জবাব দিতে হবে কি অপরাধে রাজ্যের ২৭ লক্ষ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লেন।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছিল ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজ (এসআইআর-স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)। এর মধ্যে দিয়ে মৃত ও ভুয়ো ভোটার বাদ দিয়ে প্রকৃত ভোটারদের তালিকা তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল এসআইআর করে বৈধ ভোটারদের নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো।
পূর্ব বর্ধমানের সেলিমা বেগম ২০২৪ সালেও ভোট দিয়েছেন, ২০০২সালেও ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল, এবারের এসআইআর’র পর তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তারকেশ্বরের সুষমা মণ্ডলের নামও এবারের ভোটার তালিকায় নেই। অথচ এদের দু’জনের কাছেই নির্বাচন কমিশনের বলা ১২টি ডকুমেন্টের মধ্যে অনেকগুলো ডকুমেন্ট এবং আধার কার্ড আছে। তাহলে? ভোটার তালিকায় এদের নাম নেই কেন ?
এরা কি ‘বাংলাদেশি’? ‘রোহিঙ্গা’? ‘অনুপ্রবেশকারী’? না এমন কোনও প্রমাণ নির্বাচন কমিশন দিতে পেরেছে? না, তারাও পারেনি।
এদের কারোর নামের বানান ভুল আবার কারোর হয়তো বয়স ভুল হয়েছে। কিন্তু এই অপরাধ কি সুষমা মণ্ডল-সেলিনা বেগমদের? সরকারের পক্ষ থেকে যারা এই এসআইআর’র কাজ করেছিলেন অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে এই তথ্য যখন নথিভুক্ত করা হয়েছিল, ভুল তো তারা করেছেন। সেই ভুলের দায় কি নার্গিস বিবি বা অঞ্জলির মতো মানুষদের? কেন সুষমা মণ্ডলদের ভোটার তালিকায় নাম নেই বলে রেশনও বন্ধ করে দেওয়া হবে? দু’মাস ধরে রেশন পাচ্ছেন না, অনেকেই সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, ভোটার তালিকায় নাম না থাকার জন্য। রাজ্যজুড়ে এরকম অসংখ্য ঘটনা সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির সমীক্ষার রিপোর্টে উঠে এসেছে। প্রায় ২৭লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকায় নেই। ট্রাইব্যুনালে আবেদনও করেছেন অনেকে। কেউ ডাক পেয়েছেন, কেউ ডাকও পাননি। রাজ্যের লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটার তাদের ভোটাধিকার হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।
ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধনের সময় ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারকে যুক্তিসঙ্গত অসঙ্গতির কারণ (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) দেখিয়ে বিচারাধীন তালিকায় রাখা হয়েছিল।
বিধানসভা ভোটের আগে বিচারাধীন ৩৩লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেলেও বাকি ২৭ লক্ষ মানুষ গত বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। অর্থাৎ রাজ্যে একটা বিধানসভা নির্বাচন হয়ে গেল ২৭ লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়ে। এই ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেবার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১৯জন প্রাক্তন বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত হয় ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ঠিক করে বলতেই পারছিল না ঠিক কত সংখ্যক ভোটার ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন। অথচ মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলে দিলেন ২৭ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারের মধ্যে মাত্র ৭ লক্ষ ভোটার ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন। আমাদের প্রশ্ন, এই তথ্য তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন? নির্বাচন কমিশনের কাছে যে তথ্য নেই সেই তথ্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কোথা থেকে এল? এ খবর তো তাঁর জানার কথা নয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে যা জানা যাচ্ছিলো ট্রাইবুনালে এক লক্ষের কাছাকাছি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ৩৫থেকে ৪০টি আবেদন ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। এভাবে চললে ট্রাইব্যুনালে সমস্ত আবেদনের নিষ্পত্তি করতে কয়েক যুগ সময় লেগে যাবে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এসআইআর সংক্রান্ত ৩৮.৩১ লক্ষ আপিল ট্রাইব্যুনালে জমা পড়েছে, তার মধ্যে ৩৭ লক্ষেরও বেশি এখনো বিচারাধীন। এখনো পর্যন্ত প্রায় ১.২৬ শতাংশ লক্ষ মানুষের আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে।
এদিকে সরকার বলছে, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ গেছে তারা সরকারি কোনও সুযোগ সুবিধা পাবে না। আবার কখনো বলছে, ট্রাইব্যুনালে যারা আবেদন করেছে, কেবলমাত্র তারাই সরকারি প্রকল্পের সুযোগ পাবে। অথচ সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম থাকা না থাকার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক নেই। তাহলে ভোটার তালিকায় নাম নেই বলে প্রয়োজনীয় নাগরিক সামাজিক প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার কথা ওঠার যৌক্তিকতা কোথায়?
দেখা যাচ্ছে ভোটার তালিকায় নাম না থাকার জন্য অনেকে পাসপোর্ট করতে পারছেন না, পাসপোর্ট নবীকরণ করাও তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। অথচ এটার সাথে ভোটার তালিকায় নাম থাকার কোনও সম্পর্কই নেই।
নির্বাচন কমিশনের অপদার্থতা এবং অদক্ষতার কারণে ভোটাধিকার হারিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ যে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, কমিশনকেই তার দায় নিতে হবে। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজ করতে গিয়ে কমিশন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান ভোটারের সাদৃশ্য খুঁজতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অসংখ্য ভুল করেছে। নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত তালিকায় যে ভোটারের নাম রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ভোটারের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে। চট্টোপাধ্যায়কে চ্যাটার্জি করে তথ্যের গরমিল দেখিয়ে মানুষকে বিব্রত করেছে। এই তথ্যগত গরমিলকে হাতিয়ার করে তথ্যগত অসঙ্গতি অর্থাৎ লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির মোড়কে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বিচারাধীন তালিকায় রাখা হয়েছে। তারাই এখন ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছে। অথচ এই কাজটা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট কর্মীরা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে পারতেন। উপযুক্ত পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন সচেতন ভাবে সেই পথ না নিয়ে কৃত্রিম মেধার সাহায্য নিয়েছে। এখানেই প্রশ্ন জাগে তাহলে কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ বিশেষ এলাকা থেকে বিশেষ সম্প্রদায়ের ভোটারকে বাদ দিতে কমিশন এই কাজ করেছে?
এই কাজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই নয় তো?
এমনিতে নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা। আগে নির্বাচন কমিশন গঠন করতো সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতা। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের সেই চরিত্রের বদল ঘটেছে, এখন নির্বাচন কমিশন তৈরি হয় প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন এবং বিরোধী দলনেতা দ্বারা। তার মানে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন উঠে যায়, শাসক দলের হয়েই নির্বাচন কমিশনের কাজ করার যথেষ্ট সম্ভাবনা থেকে যায়। কারণ সংখ্যাটা ২:১ হয়ে গেল।
তাই আমাদের রাজ্যেও আমরা নির্বাচন কমিশনকে নির্দিষ্ট দলের হয়েই কাজ করতে লক্ষ্য করছি। আর আমাদের এ সন্দেহ যে অমূলক নয়, বুধবার থেকে আলোড়ন ফেলে দেওয়া ঘটনাই তার প্রমাণ। নির্বাচন কমিশনের কাজ নিয়েই মানুষের মধ্যে খুবই গুরুতর প্রশ্ন উঠছে, সিপিআই(এম) সহ সমস্ত বিরোধীদল এসআইআর সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে একথা বারবার বলেছে। কিন্তু তখন নির্বাচন কমিশন বলেছে তাদের কাজ অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং বিকেন্দ্রীকৃত। কিন্তু বুধবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন থেকে একথা স্পষ্ট যে এই সন্দেহ যথেষ্ট সঠিক ছিল। এসআইআর’র বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তিনজন সদস্যের মধ্যে দারুণ মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দু’জন সদস্য অন্তত ১৪ বার এসআইআর’র প্রশ্নে তাঁদের মতপার্থক্য জানালেও তা গ্রাহ্য হয়নি। তার অর্থ, জ্ঞানেশ কুমার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা ও কাজের স্বচ্ছতার পরিপন্থী। এরকম একটি সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই স্বেচ্ছাচারমূলক ঘটনা কখনোই চলতে পারে না। জ্ঞানেশ কুমারের এই পদে থাকার আর কোনও অধিকার নেই, আমরা অবিলম্বে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছি।
আমাদের রাজ্যে বাদ পড়া ২৭লক্ষ মানুষের মধ্যে অধিকাংশই প্রান্তিক খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। এই মানুষগুলোর ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার মত সামর্থ্য, সচেতনতা দুটোর কোনটাই নাও থাকতেই পারে। সরকারের নীতির ফলে রুটিরুজির জোগাড় করতেই এই অংশের মানুষ হিমশিম খান। এরা কি করে ট্রাইব্যুনালের জন্য ছোটাছুটি করবেন? নাম বাদের তালিকায় অনেক মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ আছেন, ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে একটা শ্রেণির মানুষকে অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কারণ, দেশ এবং রাজ্যের ডবল ইঞ্জিনের সরকারের মনোভাবের কারণেই দলিত, মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপরে, পিছিয়ে পড়া মানুষের উপরে বেশি আক্রমণ হয়।
আগে পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটার বেশি ছিল, কিন্তু বর্তমানে এই ২৭ লক্ষের মধ্যে ৬৩ শতাংশ মহিলাদের নামই বাদ গেছে। এবং এই মহিলাদের বেশিরভাগটাই প্রান্তিক গরিব মহিলা। বিয়ের পরে মহিলাদের নামের পদবি পরিবর্তন হয়, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ডেও ভুল থাকে। অনেক সময় স্বাভাবিক কারণেই নামের এদিক-ওদিক হলে তাকে অজুহাত করে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অন্নপূর্ণা যোজনা, বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতা রেশন সহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা এরা পাচ্ছেন না।
আমাদের দাবি, নিজের পঞ্চায়েত এবং পৌরসভায় ট্রাইব্যুনাল করাতে হবে। যাতে মানুষকে অযথা দূরে গিয়ে হয়রানির শিকার না হতে হয়। এই দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে, নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।
মানুষের ভোটের অধিকার সব থেকে বড় গণতান্ত্রিক অধিকার, সেই ভোটাধিকার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া এবং সেই মানুষগুলোকে সমস্যায় ফেলার বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে হয়। ২৫সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে। যে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা ছিল, তারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের উর্দি গায়ে চাপিয়ে কাজ করছে। তাই রাজ্যের হাজার হাজার মানুষ, মহিলা, পুরুষ নির্বিশেষে যাদের নাম ভোটার তালিকায় নেই, তারা প্রত্যেকেই এই অভিযানে আসবেন। এছাড়াও যারা মনে করেন, এই অধিকারের লড়াইয়ে এদেশের নাগরিক হিসাবে আপনিও পাশে থাকবেন। কারণ, ভোটাধিকার হারানো মানুষগুলো অধিকার অবশ্যই পাওয়া উচিত, তারাও আসবেন জবাব চাইতে।
স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারোর থাকতে পারে না। নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃত ভোটারদের ভোটার তালিকায় নাম ফিরিয়ে দিতেই হবে, আসুন সেদিন ধর্মতলা থেকে নির্বাচনের কমিশনের রাস্তায়, অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লড়ইয়ে এ রাজ্যের মহিলারা সহ অসংখ্য মানুষের সাথে আপনিও পা মেলান।
‘‘কারণ অধিকার কেড়ে নিতে হয়
অধিকার লড়ে নিতে হয়।’’
Comments :0