Editorial

শ্রমদাসত্বের শ্রমকোড চালু

সম্পাদকীয় বিভাগ

সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের আনন্দে দেশের শ্রমজীবী মানুষকে শোষণের যুপকাষ্ঠে ফুলিয়ে দিয়ে পুঁজির মালিকদের মুনাফার নৈবেদ্য সাজিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। ভোটের ফল বেরিয়েছে চারদিনই হয়নি চটজলদি চালু করে দেওয়া হয়েছে শ্রমকোড। সেই প্রাক্‌ স্বাধীনতা যুগ থেকে শুরু করে দেশের শ্রমিক শ্রেণি বহু লড়াই-আন্দোলন, আত্মত্যাগ, রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে যে অধিকার ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে সেই অধিকারগুলি সুরক্ষিত হয় ২৯টি শ্রম আইনের মধ্য দিয়ে। মোদী সরকার শ্রমিকদের অধিকার সম্বলিত ও স্বার্থবাহী আইনগুলি বাতিল করে দিয়ে সেই জায়গায় নিয়ে এসেছে চারটি শ্রমকোড।
দে‍‌শের শ্রমিকশ্রেণি তথা সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের জীবন-জীবিকা, শ্রমের বিনিময়ে মজুরি, কাজের ও মজুরির নিরাপত্তা, কর্মস্থলের পরিবেশ, তাদের সামাজিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে যে আইনগুলি অতীতে বিভিন্ন সময় তৈরি হয়েছিল সেগুলিকে একতরফা স্বৈরাচারী কায়দায় পালটে ফেলার আগে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন, এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ন্যূনতম আলোচনার প্রয়োজনও বোধ করেনি সরকার। এমনকি সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ না দিয়ে করোনা অতিমারীর সময় শুধুমাত্র সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে পাশ করিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তেমনি কালবিলম্ব না করে রাষ্ট্রপতিও তাতে চোখ বুজে স্বাক্ষর করে দিয়ে আইনে পরিণত করে দিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার সম্ভব একেই বলা হয়।
শ্রমিকশ্রেণির প্রতিবাদ, রাজ্যে রাজ্যে আন্দোলন, সর্বোপরি সর্বভারতীয় ধর্মঘট ইত্যাদির জেরে থমকে যায় সরকার। সংসদে পাশ হওয়া এবং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর কোনও আইন লাগু করতে হলে তার বিধি তৈরি করতে হয়। বেশ কয়েক বছর নীরব থাকার পর গত ডিসেম্বর মাসে তৈরি হয় আইনের বিধি। কথা ছিল ১এপ্রিল থেকে লাগু হবে। কিন্তু পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তা স্থগিত রেখে শেষ পর্যন্ত চালু করা হলো। সরকারের দাবি এর ফলে নাকি ব্যবসার পরিবেশ সহজ হবে। কাজের সুযোগ বাড়বে। নিশ্চিত হবে মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। যদি তাই হতো তাহলে শ্রমিকরা সানন্দে তাকে স্বাগত জানাত। পরাজগের আশঙ্কায় ভোটের আগে চালু না করার সিদ্ধান্ত নিত না। তেমনি এর বিরুদ্ধে সমস্ত ট্রেড ইউনিয়ন দেশজুড়ে বড় আকারের আন্দোলনের কথা বলত না।
আসলে এই শ্রমকোড আগাগোড়া শ্রমিকের স্বার্থের বিরুদ্ধে। শ্রমিকদের অর্জিত অধিকারগুলি কাটছাঁট করে মালিকদের শোষণের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে যাতে অল্প সময়ে অনেক বেশি মুনাফা সম্ভব হয়। যেমন, আজকের বাজারে যখন ন্যূনতম মজুরির দাবি উঠেছে ২১ হাজার টাকা তখন শ্রমকোড মজুরি বেঁধে দিয়েছে ৪,৬২৮ টাকায়। অর্থাৎ শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে মালিকদের মুনাফা বৃদ্ধির ব্যবস্থা হয়েছে। স্থায়ী চাকরির সুযোগ কার্যত তুলে দিয়ে সর্বক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা হয়েছে। ফলে কাজের নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হবেন। মজুরি বৃদ্ধি বা অন্যান্য দাবি দাওয়া নিয়ে দরকষাদষির অধিকারও তারা হারাবেন। মালিকের মরজিতে তাদের কাজের সময়, মজুরি নির্ধারিত হবে। অতীতের দাসশ্রমিক প্রথাই ফেরানো হয়েছে নতুন মোড়কে। ৩০০ শ্রমিকের কম এমন সংস্থায় ছাঁটাইয়ের পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে মালিককে। বস্তুত দেশের ৮০ শতাংশ শ্রমিকই কাজ করে এমন কারখানায়। ইউনিয়নের কর্মকর্তা নির্ধারণেও মালিকের অধিকার কায়েম করা হয়েছে। সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধর্মঘটকে আটকাতে নানা বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আসলে শ্রমকোডের নামে শ্রমিকদের যাবতীয় অধিকার কেড়ে নিয়ে মালিকদের শোষণের ও মুনাফার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। অবশ্য এই কোড যে শ্রমিকরা মানবেন না সেটা বলাই বাহুল্য। আগামী দিনে মালিক ও সরকারের সঙ্গে বড়সড় বিরোধ অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

Comments :0

Login to leave a comment