Shailajananda Mukhopadhyay

কুলিকামিনদের ক্ষতবিক্ষত জীবনের ছবি এঁকেছিলেন শৈলজানন্দ

স্পটলাইট

শিবানন্দ পাল

বাংলা সাহিত্যে নজরুলকে সাম্যবাদী ধারার প্রথম লেখক হিসাবে গণ্য করা হলেও তাঁর বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে কেউ কেউ শুধু কয়লাকুঠির লেখক হিসাবেই জানেন। কয়লা কিভাবে এদেশের প্রান্তিক মানুষের জীবন দূষিত করেছিল শৈলজানন্দ দেখেছিলেন নিজের চোখে। লিখেছেন সেসব কথা, সেলুলয়েডে তুলেও ধরেছেন। রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা সাহিত্যে বাস্তববাদী ধারার অন্যতম প্রধান কথাকার তিনি, বাংলা সাহিত্যে আঞ্চলিকতার ধারণা গড়ে তুলেছেন, শরৎচন্দ্রের পর সাড়া জাগানো সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম-কোন শৈলজানন্দকে ফিরে দেখবো তাঁর জন্মের ১২৫ বছর পর?
তাঁর জন্ম ১৯০১ সালের ১৯ মার্চ, এই বাংলায় বীরভূম জেলার রূপসীপুর গ্রামে। মাতামহ বিশাল কয়লা ব্যবসায়ী, রানিগঞ্জে তাঁর বিশাল বাড়ি। ভর্তি হয়েছিলেন সিয়াড়শোল রাজ হাইস্কুলে। দু’বছরের বড় নজরুলের সঙ্গে পরিচয় হয় সেই সময়। নজরুল পড়তেন রানিগঞ্জ হাই স্কুলে। দু’জনে একসঙ্গে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। সেটা হয়নি। নজরুল চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধে। নজরুল বিহনে শৈলজানন্দ উদাস অবস্থায় কবিতা লিখেছিলেন। আর সেনা ছাউনিতে বসে কোয়ার্টার গার্ড নজরুল লিখেছিলেন গল্প 'বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী'। 
ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করে কলেজে পড়ার ইচ্ছে নিয়ে শৈলজানন্দ ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতায় কলেজে। কিন্তু না। টাইপ শর্টহ্যান্ড শিখে কয়লা খাদানে কাজ নিতে হয়েছিল। সম্পন্ন ঘরের ছেলে বিবাহ করে শ্বশুরের সাহায্যে কয়লার ডিপো খুলে কয়লাখনিতে কুলিমজুর সরবরাহের কাজ শুরু করেন। এজন্য সাঁওতাল পরগনা চষে বেড়াতে হয়। ভালো লাগেনি— একসময় কাশীতে চলে গিয়েছিলেন। পিসিমার বিবাহ হয়েছিল কাশীতে, সেখানে নিয়েছিলেন স্কুল শিক্ষকের চাকরি। বীতশ্রদ্ধ হয়ে আবার সব ছেড়ে কলকাতায় ফিরেছিলেন সাহিত্যে মনোনিবেশ করবেন বলে। 
যুদ্ধ শেষে কাজ হারিয়ে হাবিলদার নজরুল‌কেও ফিরতে হয়েছিল কলকাতায়। ১৯২২ সালের শুরুতে নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা সাহিত্য নজরুলকে বরণ করে নিয়েছিল বিদ্রোহী কবি হিসাবে। শৈলজানন্দের 'কয়লাকুঠি' গল্পটি প্রকাশিত হয় ওই বছরের শেষদিকে মাসিক বসুমতী পত্রিকায়। 'রেজিং রিপোর্ট' প্রকাশিত হয় পরের বছরের গোড়ায়। রেল লাইনের ধারে লোহা লক্করের যন্ত্রপাতি, চিমনির ধোঁয়া, কয়লাখনির হেডগিয়ারের চাকা, ডুলির ওঠা নামা, কুলিকামিনদের নড়াচড়া, চাকুরে বাবুদের হুমকি— সব মিলিয়ে উচ্ছৃঙ্খলতার ইশ্‌তেহার! নিন্দুকেরা রে রে করে তেড়ে এসেছিলেন, বস্তির সাহিত্য, সাহিত্যের আভিজাত্য নষ্ট করেছেন শৈলজানন্দ!
১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে 'কল্লোল' পত্রিকার জন্ম হয়। যুক্ত হয়েছিলেন শৈলজানন্দ। ১৯২৩ সালে শ্রমজীবীদের একটা মাসিক মুখপত্র প্রকাশিত হয়েছিল 'সংহতি'। পত্রিকার উদ্যোক্তা ছিলেন প্রেস কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা জীতেন্দ্রনাথ গুপ্ত। জাতীয়তাবাদী নেতা বিপিনচন্দ্র পালের পুত্র জ্ঞানাঞ্জন পাল ছিলেন সম্পাদক। মুরলীধর বসু ছিলেন অন্যতম কর্মকর্তা। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত যুক্ত ছিলেন। একজন নতুন লেখকের প্রয়োজন ছিল। তাঁদের চোখে পড়ে শৈলজানন্দের গল্প 'কয়লাকুঠি'। 'সংহতি'তে প্রকাশিত হয় শৈলজানন্দের প্রথম গল্প 'খুনিয়ারা'। তারপর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে কারখানা আর কুলিবস্তির মানুষজন নিয়ে বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস— 'বাঙালি ভাইয়া'। 
লেখক শৈলজানন্দ প্রথা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন, মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু বারবার বিতর্ক তৈরি হচ্ছিল। অর্থকষ্ট তাঁর দূর হচ্ছিল না। সংসারি হয়েছিলেন। গল্পে যখন গ্রাম শহরের নিম্নবিত্তদের কথা লিখেছেন, নিজের জীবনে চলছিল তার চেয়েও কঠিনতর পরিস্থিতি। শেষপর্যন্ত সংসার চালানোর জন্য ভবানীপুরে একটি পানের দোকান দিয়েছিলেন। 
যদি কিছু বেশি টাকা রোজগার হয়, এই আশায় যুক্ত হয়েছিলেন চলচ্চিত্র শিল্পে। ১৯৩৫ সালে তাঁর গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয় 'পাতালপুরী' ছবি। ১৯৩৮ সালে কৃষক অভ্যুত্থানের কাহিনি নিয়ে তৈরি হয় 'দেশের মাটি'। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। চিত্রনাট্যকার হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেলেন। ১৯৪০ সালে নির্মিত 'ডাক্তার' দ্বিতীয় স্থান দখল করল। দেশ পত্রিকার ২৩ অক্টোবর, ১৯৪০ সংখ্যায় লিখলেন— বাংলা ছবির পরিচালকরা ক্যামেরা ব্যবহার করার টেকনিক আয়ত্ত করতে পারলেও গল্প বলার টেকনিক আয়ত্ত করতে পারেননি। 
যুক্ত হলেন চলচ্চিত্র পরিচালনায়। তৈরি করলেন 'নন্দিনী'। ১৯৪১ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের সম্মান পেল। সঙ্গীতবহুল এই ছবিতে ব্যবহৃত নজরুলের জনপ্রিয় গান শচীন দেব বর্মণের কণ্ঠে "চোখ গেল, চোখ গেল", "মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা", আজও আমাদের মুগ্ধ করে। ১৯৪৫ সালে তাঁর পরিচালনায় 'মানে না মানা', বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম হীরক জয়ন্তী রেকর্ড গড়ে তাঁকে বছরের শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান দিল। 
বাঁধন সেনগুপ্ত লিখেছেন, শৈলজানন্দ পরিচালিত সেই সময়ের আটটি ছবি তেত্রিশটি পুরস্কার লাভ করার গৌরব অর্জন করে। চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর দক্ষতার কথা স্মরণ করে তরুণ মজুমদার লিখেছেন, আধা শহর আধা গ্রামীণ চরিত্রগুলো যে সিনেমার গল্পেও নিয়ে আসা যায় তা তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন। তাঁর কাহিনি নিয়ে হিন্দি ভাষাতেও তৈরি হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র। 'ধরিত্রী মাতা' (দেশের মাটি), 'দুশমন' (জীবন মরণ), 'দুলহা' (ডাক্তার), 'এক গাঁও কি কহানি' (শহর থেকে দূরে) তার কয়েকটি। 
১৯৪১ থেকে ১৯৫৫ দেড় যুগ ধরে শৈলজানন্দ ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। নিজের কাহিনি নিয়ে কাজ করেছেন যখন, এক‌ই সময়ে অন্য পরিচালকরা তাঁর কাহিনি নিয়েই ছবি করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরেও সেই ধারা অব্যাহত। 'আনন্দ আশ্রম' তার প্রমাণ। তাঁর কাছে বোম্বাই থেকে ছুটে এসেছিলেন অশোককুমার, দিলীপকুমার। অশোককুমার তাঁকে বোম্বাই নিয়ে গিয়ে রাজার হালে রেখে বলেছিলেন, এখানে থাকুন, গল্প লিখুন, ছবি করুন। টাকা যা লাগে পাবেন! 
টাকা? মাতামহ ছিলেন বিলাসবহুল জীবনযাপনকারী রায়সাহেব, পিতামহ বহু জোতের মালিক, শ্বশুর মশাই জমিদার। ছবি পরিচালনা করার পারিশ্রমিক পেয়েছেন পঞ্চাশ হাজার টাকা। শৈলজানন্দ জীবনে যেমন চরম দারিদ্রকে দেখেছেন, তেমনি চলচ্চিত্র শিল্পে যুক্ত হবার পর দেখেছেন পরম বৈভবকে। কারোর অধীনে থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করার চেয়ে স্বাধীনভাবে কয়েকশো টাকা রোজগার করাটাই শ্রেয় মনে করেছেন। ফিরে এসেছিলেন কলকাতায়। আর্থিক অনটনের জীবন তাঁর নৈতিকতাকে কখনও নষ্ট করতে পারেনি। চলচ্চিত্র শিল্পে প্রভূত অর্থ, যশ পেয়ে যখন বুঝেছেন অর্থ তাঁর মনুষ্যত্বকে গ্রাস করতে চাইছে, সে জগৎ থেকে দূরে সরে এসেছেন। আজকের অবৈধ কয়লা পাচার, গরু পাচার, বালি পাচার, শিক্ষা বিক্রি, স্বাস্থ্য বিক্রি, চাকরি বিক্রি, কাটমানি দুর্নীতির বিশাল পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে শৈলজানন্দের কথা ভাবতে আশ্চর্য লাগে! 
চলচ্চিত্রের জগৎ ছেড়ে ১৯৫৬ সালে তিনি যোগ দিয়েছেন কলকাতা বেতার কেন্দ্রে। অনেক সফল বেতার নাটক প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছেন। আকাশবাণীর অজস্র কথিকায় পাওয়া যায় শৈলজানন্দের অনন্য পরিচয়। মঞ্চ নাটকেও তিনি সফল। তাঁর অভিনয় সুধীজনের প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশ্বরূপায় মঞ্চস্থ করেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আরোগ্য নিকেতন'। 
সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র, বেতার বা মঞ্চ— সব মাধ্যমে বাধাছিন্ন বাউলের মতো সফর করেছেন— চরৈবেতি। প্রতিটি মাধ্যমে সমাজের নিচুতলার কথা বলার চেষ্টা, জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন, বারবার মাধ্যম পরিবর্তন, গতানুগতিকতার অচলায়তন ভাঙা— এটা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য! সবকিছুর মধ্যে একটা অতৃপ্তি তাঁকে সবসময় তাড়া করে বেড়িয়েছে। ১৯২৬ থেকে ১৯৬৮ আটটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তাঁর সম্পাদনায় কালি-কলম, কল্লোল পত্রিকার সমতুল্য হয়েছে। সিনেমা পত্রিকা সাহানার সম্পাদক হিসাবে চলচ্চিত্র পর্যালোচনায় যে ছক তৈরি করেছিলেন, পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র সমালোচকরা সেই কাঠামোতেই বিচরণ করেছেন। 
পিতৃহারা নজরুলের সঙ্গে মাতৃহারা শৈলজানন্দের বন্ধুত্ব হয়েছিল স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়। সে বন্ধুত্বে ছিল না কোনও ধর্মাধর্ম। ছিল শুধু সৃষ্টির বন্ধন। নিজে শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে, নজরুল গল্প। সাহিত্য দু’জনের পথ পালটে দিয়েছিল। যুদ্ধ শেষে বেকার নজরুল ফিরেছিলেন শৈলজানন্দের মেসে। মেসের চাকর জানতে পারেন নজরুল মুসলমান, এঁটো বাসন ধুতে অস্বীকার করে। শৈলজানন্দ সেই বাসন ধুয়েছিলেন। মেসের বাসিন্দাদের মধ্যে গুঞ্জন উঠেছিল। মেস ত্যাগ করে নজরুল চলে গিয়েছিলেন রাজনৈতিক অভিভাবক মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সংসর্গে। 
জীবনের চরম সন্ধিক্ষণে নজরুল পেয়েছিলেন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের আন্তরিক সান্নিধ্য, সেই অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন একাত্ম বন্ধুর মধ্যে। কিন্তু সে চেষ্টা তাঁর থেমে যায় মাঝপথে। দু’জনের কেউই দীক্ষিত সাম্যবাদী ছিলেন না। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি হ‌ওয়ার পর নতুন চিন্তা ভাবনা সাংস্কৃতিক জগতে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল; সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছিল— কয়লা ব্যবসার কাঁচা টাকার লোভ সংবরণ করে সেই ভাবনায় চালিত হয়েছিলেন শৈলজানন্দ। 
'সংহতি' পত্রিকার অবলুপ্তির পর নজরুল সম্পাদিত 'লাঙল' পত্রিকায় যুক্ত হয়েছিলেন। প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের ধারাতে যুক্ত ছিলেন। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে নজরুলের সৃজনশীলতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা শৈলজানন্দের চিত্তকে দুর্বল করেছিল! দু’জনে একসাথে চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করছিলেন। নজরুলকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন দু’খানা ব‌ই— 'আমার বন্ধু নজরুল', 'কেউ ভোলে না কেউ ভোলে'। একটি ব‌ই উৎসর্গ করেছেন বন্ধুপত্নী প্রমীলাদেবীকে। নজরুলের জীবনের নিগূঢ়তম বেদনার কাহিনি জানতেন শুধু শৈলজানন্দ। 
সিনেমা করে বাড়ি হয়েছিল, গাড়ি হয়েছিল— কিন্তু বিষয়-বুদ্ধির অভাবে মামলা মোকদ্দমায় প্রতারণার শিকার হয়ে রিক্ত হয়েছিলেন শৈলজানন্দ। নিঃসন্তান ছিলেন, কিন্তু তাঁর সংসার মোটেও ছোট ছিল না। অনেক মানুষের ভরসার স্থল ছিলেন, অর্থ কষ্টের মধ্যেও অন্যের সন্তানদের লালন করেছেন। শেষের দিনগুলি কেটেছে শয্যাশায়ী অবস্থায়, অভিমান আর নিঃসঙ্গতায়। তিনবার স্ট্রোক হয়েছিল। নামী দামি ফিল্ম কোম্পানি, প্রকাশন সংস্থার কাছে টাকা পেতেন, অথচ প্রাপ্য টাকা চাইতে পারতেন না। তাঁর লজ্জা ছিল, অথচ যাদের কাছে টাকা পেতেন, তাদের কোনও লজ্জা ছিল না। কারোর কাছে হাত পাতেননি। জীবনের শেষ দিকে একটি চিঠিতে বন্ধুকে লিখেছেন, "সারাজীবন ধরে আমি রোজগার করেছি আর দুঃস্থদের সাহায্য করেছি। বিচার বিবেচনা করে করিনি, তাই আজ সর্বস্বান্ত এবং অকর্মণ্য হয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছি। রোজগার করেছি প্রচুর, অথচ ভবিষ্যতের জন্য কিছুই রাখিনি। কারও কাছে হাত পাততে, ধার দেনা করতে মাথা কাটা যাচ্ছে।” 
স্ত্রী এবং পালিতা কন্যা শেষ সময় সবসময় পাশে ছিলেন। পঞ্চাশ বছর আগে ২ জানুয়ারি, ১৯৭৬ শৈলজানন্দ চলে গিয়েছেন। শেষ জীবনে হতাশ শৈলজানন্দ ফিরতে চেয়েছিলেন আবার লেখালেখিতে। তাঁর লেখায় বাংলা সাহিত্যের পাঠক রাঢ় বাংলার অন্ত্যজ মানুষ সাঁওতাল, বাউড়িদের মুখের ভাষার স্বাদ পেয়েছিলেন। 'কালি কলম' পত্রিকায় 'জনি ও টনি' নামে তাঁর লেখা রাস্তার দুটি কুকুরের অপত্য স্নেহের গল্প পাঠে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় অবাক হয়েছিলেন! বলেছিলেন, "শৈলজানন্দ যদি তাঁর সাহিত্য নিয়ে আবির্ভূত না হতেন তাঁর পথরেখা অনুসরণ করে সাহিত্যের অঙ্গনে উপস্থিত হতাম কিনা সন্দেহ" (বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন-এর মুদ্রিত প্রতিবেদন, সিউড়ি, বৈশাখ, ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ)।
ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের স্বার্থে কয়লা খনির ম্যানেজার, বড়বাবু, রেজিংবাবুরা খনির মালিক না হয়েও মালিকের মতো ক্ষমতা ভোগ করে, মালিকের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের উপর শোষণের বুলডোজার চালিয়ে ছিল। শ্রমিকদের বিপজ্জনক খনিতে কাজে নামানো, তাদের মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া- শোষক আর শোষিতের নির্মম বাস্তবতার কাহিনি এঁকে নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছিলেন শৈলজানন্দ একশো বছর আগে! 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কুফলের খেসারত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুঁজির নিয়ন্ত্রণে মালিকদের মুনাফা বৃদ্ধির নেশা যে কতখানি ভয়ঙ্কর হতে পারে, তাদের কাছে নারী শ্রমিক ভোগ্যপণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়; জীবনের সরলতা পবিত্রতা বিনষ্টকারী বণিক সভ্যতায় বহমান শারীরিক মূল্যবোধে ক্ষয় মনুষ্যত্ব বিবর্জিত আগ্রাসী লোভার্ত দৃষ্টির যে জগত তৈরি করেছিল, তার‌ই প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে বর্তমান সময়ে কামদুনি থেকে আর জি কর কাণ্ডের মধ্যে। 
রুশ বিপ্লবের আলোকে, শ্রমিক মালিক সম্পর্কে- শ্রমিক জাগরণ এবং আন্দোলনের প্রেক্ষাপট যুবক শৈলজানন্দকে নাড়া দিয়েছিল একশো বছর আগে। কয়লাখনি অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে নিষ্ঠুর ভয়ঙ্কর অবক্ষয়ের মধ্যে—তিনি দেখেছিলেন অসম জাতের প্রেমে হৃদয়াবেগের তীব্রতা, অতৃপ্ত ভালোবাসার চিরন্তন বেদনা, কত নারীকে যে চরম বাস্তবের মুখে ঠেলে দিয়েছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। কয়লা খাদানের পাশাপাশি রানিগঞ্জ, বীরভূম, বাঁকুড়ার গ্রামীণ জীবন শুধু নয়, কলকাতার বস্তির জীবনের কথাও উঠে এসেছে তাঁর কলমে অনাবিল মুনশিয়ানায়। অথচ মহাযুদ্ধের কালপর্বে হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র তাঁকে বাংলা সাহিত্যে কথা সাহিত্যিক হিসাবে গুরুত্ব দিয়েছেন, অধিকাংশই গুরুত্ব দেননি। 
‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত শৈলজানন্দের 'নারীমেধ' (১৯২৮) গল্প পাঠ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অসহায় বিধবা নারীর উপর শারীরিক অত্যাচার, তাঁকে ভ্রুণ হত্যায় প্ররোচিত করা এবং মৃতদেহ কয়লা খাদানে ফেলে দেওয়ার বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথ শিউরে উঠেছিলেন। নিচুতলার সমাজের নারী বিশেষ করে বিধবা নারীদের উচ্চবর্ণের কাছ থেকে কত যে অপমান আর অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে, ব্যাভিচারের চিহ্ন গোপন করতে গিয়ে মরতে হয়েছে, তার করুণ কাহিনি পাঠের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রবাসী, অগ্রহায়ণ, ১৩৩৪ সংখ্যায় 'যাত্রীর ডায়েরি', শিরোনামে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "... দরিদ্র জীবনের যথার্থ অভিজ্ঞতা এবং সেই সঙ্গে লেখবার শক্তি তাঁর আছে বলেই তাঁর রচনায় দারিদ্র ঘোষণার কৃত্রিমতা নেই। ..." প্রবাসীতে রবীন্দ্রনাথের এই লেখা প্রকাশিত হলেও পরে 'সাহিত্যে নবত্ব' নামে যখন লেখাটি পুনর্মুদ্রিত হয়, শৈলজানন্দ সম্পর্কিত অংশটি বাদ দেওয়া হয়— এও পরম আশ্চর্যের ঘটনা!

Comments :0

Login to leave a comment