West Bengal BJP

কোন পথে বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

স্পটলাইট

দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অষ্টাদশ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বিজেপি। দেড় দশক ধরে তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ জনতার ক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল সরকার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়াচ্ছে? বাংলার মানুষের রুটিরুজি জীবনজীবিকার সমস্যাগুলির সমাধান হবে নাকি লেনিন মূর্তি ভেঙে বাংলার বুকে শ্যামাপ্রসাদের জয়গানের নামে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্বের হামলা চলবে? 
মমতা ব্যানার্জির সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত অসন্তোষের সঙ্গে তীব্র মেরুকরণকে ব্যবহার করেই ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। বিজেপি’র মেরুকরণের রাজনীতির বিরুদ্ধে মতাদর্শগত লড়াইয়ে না গিয়ে সরকারি ক্ষমতাকে ব্যবহার করে মমতা ব্যানার্জিও দীঘায় জগন্নাথ মন্দির, নিউটাউনে দুর্গাঙ্গন, শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির গড়ার রাজনীতি করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সওয়ারি হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি রাজ্যটাকেও তুলে দিয়েছেন বিজেপি’র হাতে। বিপুল ভোট বৃদ্ধি হয়েছে বিজেপি’র, প্রায় সাত শতাংশ। অন্যদিকে জনবিক্ষোভে প্রায় এই পরিমান ভোট কমেও গেছে তৃণমূলের। রাজ্যের ৮টি জেলায় তৃণমূল একটি আসনও পায়নি, বাইশজন মন্ত্রী হেরে গিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে উচ্চহারে ভোট পড়েছিল, প্রায় ৯৩ শতাংশ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের বিপুল ক্ষোভ, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার আঁচ তখনই পাওয়া গেছিল। এর সঙ্গে এসআইআর’এর কারণে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গেছে, সেই কারণেও ভোট প্রদানের হার চড়া ছিল। নির্বাচনী প্রচার পর্বে অনুপ্রবেশের নামে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে তীব্রভাবে। এই সব কিছুর জেরে ১৫ বছর পর আরও একবার রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী থেকেছেন রাজ্যের মানুষ। বেশ কয়েকটি বুথ ফেরত সমীক্ষায় রাজ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। সেই সব অনুমানকে ব্যর্থ করে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি। বিজেপি একাই ২০৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। পর্যুদস্ত তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন। কংগ্রেস দুটি আসন, সিপিআই(এম) একটি আসন, বামফ্রন্টের সহযোগী হিসাবে আইএসএফ একটি আসনে জয়ী হয়েছে। পরপর দুটি বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী পদে থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাস্ত হয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। নির্বাচনে চূড়ান্তভাবে পরাজয়ের পরও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগ করার ন্যূনতম সৌজন্যটুকুও দেখাতে পারেননি। বরং পরাজয় অস্বীকার করে তিনি ইস্তফা দেবো না বলে জানিয়েছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২১৬ আসনে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। পাঁচ বছরের মধ্যে ভোটের শতাংশ হার থেকে আসন সংখ্যায় পর্যুদস্ত হয়ে গেছে রাজ্যের শাসকদল। এমনকি, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিপুল আসন প্রাপ্তির পরেও তৃণমূল এবারের বিধানসভা ভোটে বিপর্যস্ত হয়ে কার্যত দল টিকিয়ে রাখার সমস্যায় রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি থেকে প্রায় সব সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, আর জি করের ধর্ষণ করে হত্যা থেকে একের পর এক নারী নির্যাতন, কাজের সুযোগ না থাকা, স্কুল কলেজের বেহাল দশা, স্বাস্থ্য সহ সব পরিকাঠামো ভেঙে পড়া ইত্যাদি অজস্র কারণে মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিলোই। সেগুলোই সুনামি হয়ে আছড়ে পড়েছে ভোটে।  
কিন্তু তৃণমূলের বিপুল পরাজয়ের সঙ্গে বিজেপি’র রাজ্যে ক্ষমতা দখল নতুন অশনি সঙ্কেত নিয়ে এসেছে বাংলার বুকে। এরাজ্যে ভোট প্রচারে বারেবারে হিন্দুত্বের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে মেরুকরণের রাজনীতিকেই উৎসাহিত করে গেছেন বিজেপি-আরএসএস নেতারা। নির্বাচনে বিপুল জয়ের পরে তারা বাংলা দখলকে আরএসএস’এর বিচারধারা মজবুত করার সুযোগ হিসাবে দেখছে। সেই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের সুরক্ষিত করার পথ হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে। বাংলার মানুষের প্রত্যাশা পূরণের ইঙ্গিত এখনও অবধি দেখা যাচ্ছে না। ফলাফল প্রকাশের অব্যবহিত পরেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপি মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর হামলা আক্রমণ শুরু করেছে। বুলডোজার রাজনীতির প্রকাশ দেখা গেছে এরাজ্যেও। বিজেপি নেতারা এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে কিছু মৌখিক বিবৃতি দিয়ে ক্ষান্ত থাকছেন। মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে রাতের অন্ধকারে লেনিন মূর্তি সহ একাধিক স্থানে সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের মূর্তি, প্রতিকৃতির উপর হামলা, বামপন্থীদের পার্টি দপ্তরের দখল নিতে গেছে ২০১১ সালে ফল প্রকাশের পর তৃণমূলী সংস্কৃতির পথ অনুসরণ করেই। একাজে রাতারাতি রাজনৈতিক রং বদলানো কিছু তৃণমূলী দুষ্কৃতীদেরও অগ্রণী ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এর প্রতিবাদ প্রতিরোধে এখনও পর্যন্ত তৃণমূল কোনো উদ্যোগ তৎপরতা দেখায়নি। নির্বাচনে মাত্র বামফ্রন্ট মাত্র একটি আসন পেলেও প্রতিবাদে পথে নেমেছেন তাঁরাই। জিয়াগঞ্জে লেনিন মূর্তি ভাঙার পরেও বামপন্থীরা পথে নেমেছে, কলকাতায় ধর্মতলায় লেনিন মূর্তির সামনে থেকেও তাঁরাই প্রতিবাদ মিছিল করেছেন। 
এই কারণেই বিজেপি তাদের মতাদর্শগত মূল শত্রুকে চিহ্নিত করেছে। দেড় দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের সরকারের বামপন্থীরা নেই, তবুও কমিউনিস্ট ভীতিই যে এখনো তাদের তাড়া করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন অমিত শাহ। বিজেপি’র পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে শুভেন্দু অধিকারীকে বেছে নেওয়ার পরে অমিত শাহ বলেছেন, ‘৩৭০ ধারা বাতিলের পরে দেশজুড়ে খুশির হাওয়া বয়েছিল। কিন্তু তখনও কিছু বাকি ছিল। এখন বিজেপি সরকার তৈরি হওয়ায় বাংলার সংস্কৃতি পাঁচ দশকের বিদেশী বিচারধারায় প্রভাবিত শাসন মুক্ত হলো। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যেখানেই থাকুন আশির্বাদ করছেন বিজেপি’কে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘কমিউনিস্টদের সময় থেকে বাংলায় যে মহল তৈরি হয়েছিল, মমতা ব্যানার্জি তাকে আরও খারাপ ভয় হিংসার শাসন কায়েম করেছিলেন। আমি সারা দেশ ঘুরেছি, কিন্তু কেরালা ও বাংলার মতো হিংসা কোথাও দেখিনি। প্রথমে কমিউনিস্টরা, তারপর তৃণমূল এই হিংসা করেছে। বিজেপি’র প্রচন্ড জয়ে বাংলার সংস্কৃতি পাঁচ দশকের বিদেশী বিচারধারায় প্রভাবিত শাসনের থেকে মুক্ত হলো, এবার বাংলা রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ কবিগুরুর বিচারধারায় এগোবে। একশো বছরের চেষ্টায় গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর বিজেপি’র সরকার তৈরি হলো। এর ফলে শুধু বিজেপি’র সংগঠন নয়, বিচারধারাও মজবুত হলো।’
সোজা কথায় মার্কস এঙ্গেলস লেনিনের মতাদর্শকে বিদেশী হিসাবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে নিজেদের হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে কায়েম করার সুযোগ পেয়ে উল্লাস করছে বিজেপি। এটা কেবল ফ্যাসিবাদী বিপদেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। 
এই বিজেপি’কে পশ্চিমবঙ্গের বুকে জোট রাজনীতির ধারায় খাল কেটে কুমীর আনার মতো করে টেনে এনেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। বাংলার রাজনীতিতে পা রাখার জায়গা ছিল বিজেপি’র। তখন কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল তৈরি করে বিজেপি’র সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে লড়েছিলেন, কেন্দ্রের বিজেপি জোট সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ১৯৯৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনিই সাংবাদিকদের বলেছিলেন,‘‘তৃণমূল কংগ্রেসের আসল লক্ষ্য যাবতীয় সিপিআই(এম) বিরোধী শক্তিকে এক জায়গায় জড়ো করা। বাংলা বাঁচাও ফ্রন্ট খোলা হচ্ছে সেই কারনেই। সিপিআই(এম) বিরোধী সব রাজনৈতিক গোষ্ঠীকেই আমরা এই ফ্রন্টে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’’ আর সাম্প্রদায়িকতা? মমতা ব্যানার্জি সেদিন বলেছিলেন, ‘‘ধর্মনিরপেক্ষতা নন-ইস্যু। বিজেপি অচ্ছুৎ নয়। এত লোক ওদের ভোট দিচ্ছে।’’ বাবরি মসজিদ ভাঙার পরে যে বিজেপি’কে জ্যোতি বসু ‘অসভ্য বর্বর বলেছিলেন, সেই বিজেপি ছিল তৃণমূলের সঙ্গী। এই কারণেই জ্যোতি বসু বলেছিলেন, মমতা ব্যানার্জির সবচেয়ে বড় অপরাধ উনি পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বিজেপি’কে ডেকে এনেছেন। এবার নির্বাচনে পরাজয়ের পরে মমতা ব্যানার্জির কন্ঠে বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতার কোনো অবকাশ থাকে?
যেভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা জানানোর নামে আরএসএস’এর দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে বাংলার বুকে বাস্তবায়িত করতে বিজেপি নেমেছে তাতে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে। গান্ধী হত্যাকারীদের যারা পুজো করে, কাশ্মীরকে যারা ভারতের থেকে পৃথক রেখে হিন্দু রাষ্ট্র বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল, যারা বাংলায় সাম্প্রদায়িক হিংসায় অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে, তাদের হাতে বাংলার শাসনভার। তৃণমূলের অপশাসনের হাত থেকে মুক্তির জন্য বাংলার জনগণের রায়কে তারা হিন্দুত্বের পক্ষে রায় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। অনুপ্রবেশকারীর ধুয়ো তুলে বাংলার জনগণকে তারা সাম্প্রদায়িকতায় বিভাজিত করতে চাইছে। এই জন্যই তারা লেনিন মূর্তিগুলিকে আক্রমণ করছে। কারণ মার্কসবাদী বিচারধারাকেই তারা তাদের পথের বাধা হিসাবে উপলব্ধিতে রেখেছে। 
কিন্তু লেনিন মূর্তি ভেঙে কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানানো যায়? এবারের পঁচিশে বৈশাখে যারা রবীন্দ্রনাথের মূর্তিতে ও ছবিতে ফুল মালা দিয়ে বাঙালির হৃদয় জয় করার চেষ্টা করছে তারা কি রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠি পড়েছে? যারা গান্ধী হত্যাকারীদের পক্ষে, লেনিন মূর্তি ভাঙে, রবীন্দ্রনাথ কি কখনো তাদের পক্ষে থাকতে পারে? যারা নজরুল ইসলামকে মুসলিম কবি হিসাবে রবীন্দ্রনাথের থেকে পৃথক করে, যারা ‘একই বৃন্তে দুটি কুসুম’কে বিদ্রুপ করে, তারা বাঙালির সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহক হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিকতাবাদকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যারা রবীন্দ্রনাথের ছবিতে ফুল দেয় তাদের শ্রদ্ধায় সত্য থাকতে পারে না।

Comments :0

Login to leave a comment