বর্তমান নির্বাচনী ও সাংগঠনিক দুর্বলতা দেখে হতাশ হওয়ার কারণ নেই বামপন্থীদের। নয়া উদারবাদের দেউলিয়াপনা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রায় সব বড় রাজনৈতিক শক্তিই নয়া উদারবাদী। বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্র বামপন্থারই রয়েছে। এই রাজনৈতিক পরিসরই ভারতের বামপন্থার ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয়। ইংরেজি পাক্ষিক ‘ফ্রন্টলাইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি। টি কে রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে আলোচনায় সদ্য সমাপ্ত বিধানসভাগুলি নির্বাচনের ফলাফল এবং বামপন্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছেন সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক।
নয়া উদারবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির চ্যালেঞ্জের বামপন্থীরা কি তাদের আদর্শগত কাঠামোর মধ্যে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারবে? এই প্রশ্নের জবাবে বেবি জোরের সঙ্গে বলেন অবশ্যই, নয়া উদারবাদ এবং পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির মোকাবিলায় আমাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত কাঠামোকে ক্রমাগত সময়োপযোগী করতে হবে। এগুলি মানুষের মৌলিক সমস্যার প্রকৃত সমাধান দেয় না। শ্রেণিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামের সঙ্গে তাকে যুক্ত করেই আমরা এগতে পারব। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মেরুকরণের বিরুদ্ধে লড়াইও এই পথেই সম্ভব। একই সঙ্গে সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষ ও যারা ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। প্রথমোক্তদের দ্বিতীয়দের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যুক্ত করতে হবে বামপন্থীদের।
ভারতে বামপন্থীদের প্রধান প্রতিপক্ষ কারা? এই প্রশ্নের জবাবে সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, বিজেপি ও আরএসএস’র বিরুদ্ধে আদর্শগত ও রাজনৈতিক সংগ্রামই আমাদের তাৎক্ষণিক প্রধান কাজ। এটি সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছে এমন চরম পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গেই যুক্ত। পাশাপাশি জাতপাতের নিপীড়ন, নারীর শোষণ, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষাও আমাদের প্রধান কর্মসূচির অংশ।
সংসদে প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ায় বামপন্থীরা কীভাবে জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে লড়বে? এই প্রসঙ্গে বেবি বলেছেন, সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্ব আছে, কিন্তু আমরা সংসদের বাইরেও মানুষের জীবিকা সংক্রান্ত প্রশ্নে আন্দোলন গড়ে তুলি। উত্তর ভারতের ১৩টি রাজ্যে সিপিআই (এম) ৩৩টি ‘জন আক্রোশ যাত্রা’ সংগঠিত করেছে, যেখানে গ্রামীণ দরিদ্র, কৃষি শ্রমিক, কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। এর পরিণতি ছিল ২৪ মার্চ দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিশাল সমাবেশ। তিনি বলেছেন, মানুষের জীবিকা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি আরও জোরালোভাবে তুলতে হবে। পাশাপাশি সর্বস্তরে মানুষের সঙ্গে নিয়মিত ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বেবি বলেছেন, ১৯৭৭ সালের পর এই প্রথম কোনও রাজ্যেই সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন সরকার নেই। সংসদীয় রাজনীতির বাইরেও আমাদের প্রভাব কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। আমরা নিশ্চিত যে এই ব্যর্থতার কারণগুলি চিহ্নিত করতে পারব এবং আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবো। এজন্য আমাদের মৌলিক রাজনীতি পরিবর্তন না করেই উপযুক্ত নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেছেন, বামপন্থী রাজনীতিকে যুব সমাজ ও জেন-জি প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে নতুন পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেছেন, ভারতে ক্রমবর্ধমান ধর্মভীরুতা, তার অপব্যবহারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং কমিউনিস্টরা ধর্মবিরোধী— এই ধরনের পরিকল্পিত প্রচারও বিশেষ চ্যালেঞ্জ বামপন্থীদের সামনে। এগুলির মোকাবিলা করতে হবে।
নির্বাচনের বাইরে গিয়েও কি বামপন্থীরা নিজেদের পুনর্গঠিত করতে পারবে? এই প্রশ্নের জবাবে বেবি বলেছেন, যদি বামপন্থীরা নির্বাচনের বাইরেও নিজেদের পুনর্গঠন করতে না পারে, তাহলে শুধু বামপন্থার নয়, গোটা দেশের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে। নয়ডায় আন্দোলনরত চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো তার একটি উদাহরণ। অন্য কোনও রাজনৈতিক দল বা ট্রেড ইউনিয়ন সেইভাবে এগিয়ে আসেনি। শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করাই বাম রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য।
অর্থশক্তি ও কর্পোরেট মিডিয়ার প্রভাব মোকাবিলা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বেবি বলেছেন, এখন রাজনীতি অনেকটাই নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বিপুল অর্থবল ও কর্পোরেট মিডিয়ার মাধ্যমে। বামপন্থীদের বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে—পাড়াভিত্তিক সভা, সরাসরি জনসংযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে। কেরালার কৈরালি টিভি এবং ‘লেফট ভিউজ’ পোর্টাল এই ধরনের উদ্যোগের উদাহরণ। পাশাপাশি নির্বাচনী সংস্কারের দাবিও জোরদার করতে হবে বলে তিনি মতপ্রকাশ করেছেন।
কেরালা এবং পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেছেন, গত এক দশকে কেরালার এলডিএফ সরকার দেখিয়েছে কীভাবে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অধিকতর সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন, চরম দারিদ্র দূরীকরণ এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে শিক্ষিত বেকারত্বের সমাধানের চেষ্টাও করা হয়েছে। তাহলে কেরালায় এমন বড় নির্বাচনী পরাজয় কেন? নিজেই এই প্রশ্ন তুলে বেবি বলেছেন, এর উত্তর জটিল। দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখনও আমাদের সঙ্গে আছে, কিন্তু মধ্যবিত্তের একটি অংশ দূরে সরে গেছে। এর পেছনে জাতপাত-সম্প্রদায় ভিত্তিক পরিচয় রাজনীতির প্রভাব আছে। কিছু কেন্দ্রে এনডিএ ও ইউডিএফ’র মধ্যে কৌশলগত ভোট স্থানান্তরও হয়েছে বলে আমাদের সন্দেহ। যদিও এলডিএফ’র ভোট কমেছে, এনডিএ’র ভোট শতাংশও কমেছে। এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো খুঁজে বের করা কেন ভোট সরে গেল। টানা সরকারে থাকলে অবক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। আমরা নিজেরাই সংশোধনমূলক নথিতে এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলাম। মনে হচ্ছে সেই দুর্বলতাগুলি কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট সফল হইনি। জনগণ বামপন্থীদের কাছ থেকে উচ্চতর মানদণ্ড প্রত্যাশা করে, সম্ভবত আমরা তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। তাই এখন নিচু স্তর থেকে শুরু করে মুক্ত ও খোলামেলা আত্মসমালোচনার প্রক্রিয়া চলছে। কেরালায় সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, শ্রমিক-কৃষক সংগঠন, ভূমি সংস্কার, মজুরি বৃদ্ধি, সর্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আমাদের ঐতিহাসিক ভিত্তি। তাই আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে যে, আমরা আবার নেতৃত্বের অবস্থানে ফিরব।
পশ্চিমবঙ্গে পুনরুদ্ধারের বিশেষ চ্যালেঞ্জ কী? এই প্রশ্নের জবাবে বেবি বলেছেন, এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন ছোট-বড় বাম সংগঠন, এমনকি সিপিআই(এমএল) লিবারেশনকেও একত্রিত করা সম্ভব হয়েছে। বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতী, ছাত্র, মহিলা ও প্রবীণ মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। বড় সমাবেশ সহ নানা গণআন্দোলনে ভালো সাড়া মিলেছে। এখন এই আন্দোলনকে ভোটে রূপান্তর করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, দ্রুত তা সম্ভব হবে। সিপিআই(এম) কিছু কেন্দ্রে বিজেপি--কে সাহায্য করেছে বলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যে দাবি করেছেন, তার সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে বেবি বলেছেন, এটি মুখ্যমন্ত্রীর একটি চতুর রাজনৈতিক কৌশল, যার লক্ষ্য ছিল সিপিআই(এম) সমর্থক ও বামমনস্ক মানুষদের আকৃষ্ট করা। আমাদের কর্মীরা যথেষ্ট রাজনৈতিকভাবে সচেতন। আরএসএস-নিয়ন্ত্রিত বিজেপি’র বিপদ তারা বোঝেন। সিপিআই(এম) সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপি’র বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। ধর্মনিরপেক্ষতা, জীবিকা, জাতপাতবিরোধী সংগ্রাম ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই— এগুলিই আমাদের প্রধান কাজ। এই বাস্তবতা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই এমন অসত্য প্রচার করা হয়।
ইন্ডিয়া মঞ্চ এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বেবি বলেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটের অংশ হলেও তাদের শাসনকালে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের শত শত কর্মী খুন হয়েছেন। অসংখ্য মিথ্যা মামলা, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হামলা ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজেপি-বিরোধী ঐক্যের ডাক মানানসই নয়। তিনি বলেছেন, ইন্ডিয়া মঞ্চের কাজে কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে নির্বাচন এলে বিজেপি-বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে রাজ্যভিত্তিক বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী একত্রিত করা সম্ভব হবে। সংসদেও সমন্বয় বজায় থাকবে। তবে কিছু রাজ্যে একসঙ্গে থাকা বাস্তবিক কারণে কঠিন এবং তা এড়ানো যায় না।
ma baby
শ্রমজীবীদের লড়াইয়ের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামকে যুক্ত করেই এগবে ভারতের বামপন্থীরা, সাক্ষাৎকারে বললেন এম এ বেবি
×
Comments :0