ABRAHAMIC ACCORD

‘আব্রাহামিক অ্যাকর্ড‘: শান্তি আলোচনায় ট্রাম্পের শর্তে বাড়ছে জটিলতা

আন্তর্জাতিক স্পটলাইট

প্রতীম দে

ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনার মাঝেই ‘আব্রাহামিক অ্যাকর্ড’-এ সই করার শর্ত চাপিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোশাল মিডিয়া দীর্ঘ পোস্টও করেছেন। এই সমঝোতায় বেশি দেশকে সই করার শর্ত দিয়েছেন। ট্রাম্পের অবস্থান শান্তিচুক্তিতে সমস্যা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা ছড়িয়েছে।
‘সমঝোতা‘ বলা হলেও আমেরিকার আসল লক্ষ্য ইজরায়েলের সঙ্গে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলির সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক এবং ব্যাপক মাত্রা দেওয়া। ইজরায়েলের প্রভাব বাড়ানোর অর্থ মধ্য প্রাচ্য সহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে আমেরিকার মুঠোবন্দি করার সুযোগ বাড়ানো। স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র এবং পূর্ব জেরুজালেমকে তার রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির দাবিকে নাকচ করে এই সমঝোতা। 
ট্রাম্প যা বলেছেন তার অর্থ ইজরায়েলের আধিপত্য মানতে রাজি হয়ে ইরানকেও সই করতে হবে এই সমঝোতায়। ইরানের পক্ষে এই শর্ত মেনে নেওয়া অসম্ভব। শত চেষ্টা করেও মাত্র ৬ দেশ সই করেছে এই সমঝোতায়। ইজরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ছাড়া রয়েছে বাহরিন, মরক্কো, সুদান, কাজাখস্তান। 
কিন্তু সৌদি আরব, কাতারের মতো প্রভাবশালী একাধিক দেশ এই চুক্তিতে সই করেনি। পাকিস্তান সরাসরি সমঝোতায় সইয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ‘ইজরায়েলের সঙ্গে আদর্শগত পার্থক্যের’ কারণ দেখিয়ে। 
২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে স্বাক্ষরিত 'আব্রাহামিক অ্যাকর্ড' মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। প্রায় ছয় বছর পর আজও এই চুক্তি বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে আছে। মধ্য প্রাচ্যে স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এই সমঝোতার প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
গাজা এবং তারপর ইরানে ইজরায়েল-আমেরিকার হানাদারি মধ্য প্রাচ্যে অস্থিরতা তীব্র করেছে।
আমেরিকার মধ্যস্থতায় ইজরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, বাহরিন, মরক্কো ও সুদানের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। পরে যোগ দেয় কসোভো। 
চুক্তির মূল শর্ত ছিল ইজরায়েলকে পারস্পরিক স্বীকৃতি, দূতাবাস স্থাপন, সরাসরি বিমান চলাচল, প্রযুক্তি, পর্যটন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম ‘ধর্মীয় সহাবস্থান’-এর বার্তা দিয়ে আমেরিকার মুখ্য উদ্দেশ্য্ তাদের সঙ্গী রাষ্ট্র ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে বাধ্য করা।
ইরানকে ঠেকাতে এই ‘নতুন অক্ষ’-কে ওয়াশিংটন মধ্য প্রাচ্যে নিজের প্রভাব ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে দেখে। 
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে অবস্থান
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা গাজা আগ্রাসন মধ্য প্রাচ্যে আমেরিকার সহযোগী ইসলামিক দেশগুলিতে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। ইরান ঘিরে শান্তিচুক্তির আলোচনায় মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিকে এই সমঝোতায় সঙ্গী হতে চাপ দিচ্ছেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বয়ং। 
সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলেও ‘আব্রাহামিক অ্যাকর্ড’-এ সই করা সমস্যাজনক রিয়াধের। অতীতে বাইডেন ও এখনকার মার্কিন প্রশাসন ২০২৬ সালেও রিয়াদকে রাজি করাতে চেষ্টা করছে। শর্ত হিসেবে সৌদি আরবকে আমেরিকা নিরাপত্তা গ্যারান্টি ও অসামরিক পরমাণু কর্মসূচি দিতে চাইছে। 
কিন্তু গাজায় আগ্রাসনের পরিস্থিতিতে সৌদির যুবরাজ বলেছেন, ‘‘স্বাধীন প্যালেস্তাইনের স্বীকৃতি ছাড়া ইজরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক সম্ভব নয়।’’ 
মধ্য প্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব কমাতে চীন ২০২৩ সালে সৌদি-ইরান সমঝোতায় মধ্যস্থতা করে। বেইজিং এখন বিভিন্ন দেশকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ‘-এ টানছে। আবার রাশিয়া সিরিয়া ও ইরানের পাশে থেকে ইজরায়েল-বিরোধী শিবিরকে জোরদার করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য এখন ‘বহু-মেরু’ প্রতিযোগিতার কেন্দ্র বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্ব, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্যালেস্তাইন প্রশ্নের ভবিষ্যৎ— সব কিছুর সঙ্গেই এই চুক্তির ভাগ্য জড়িয়ে আছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধে নেমে আমেরিকা কিছু পায়নি। বরং দেশে-বিদেশে ইজ্জত খুইয়েছেন ট্রাম্প। ইজরায়েলের মাধ্যমে খবরদারির এই সমঝোতায় কিছুটা এগতে পারলেও তাকেই ‘জয়‘ বলে দেখাবেন তিনি।

Comments :0

Login to leave a comment