কলতান দাশগুপ্ত
রাতের রেলস্টেশন। একের পর এক ট্রেন নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছে গোটা দিন ধরে জীবন-জীবিকার লড়াই করা ক্লান্ত মানুষদের। ট্রেন থেকে নেমেই স্টেশন থেকে সামান্য কেনাকাটা শেষ করে যে যার নিজের বাড়ির পথে দৌড়াতে থাকেন। কিন্তু সেই দিনটায় পথচলতি ক্লান্ত মানুষদেরও স্টেশনে নেমে খানিক থমকে দাঁড়াতে হয়েছিল। অবাক হয়ে তারা দেখছিলেন যে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার বদলে নতুন করে যেন রাত জেগে উঠছে রেল স্টেশনে। হকারদের চোখে ঘুম নেই। রাত দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। পাহারা দিচ্ছেন নিজেদের অন্নসংস্থানের শেষ অবলম্বন, নিজের দোকানটা। যেন ভোরের আলো ফোটার আগেই ভেঙে না যায় জীবিকার ছোট্ট জায়গাটি। এলাকার কমরেড, সহযোদ্ধারাও আছেন তাঁদের সঙ্গে। রেললাইনের ধারে সকলে মিলে ব্যবস্থা করেছেন রাতের আহার—ভাত, ডাল, আলু চোখা! এই বাংলার মানুষের বেঁচে থাকার দলিল হিসাবে আরও একটি রাত দখল।
একটা দোকান ভেঙে দেওয়া মানে শুধু টিন, ত্রিপল বা কাঠ ভাঙা নয়, আসলে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে এক শিশুর স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন, বৃদ্ধ বাবা মায়ের ওষুধ কেনার সামর্থ্য, রান্না ঘরে গরম ভাতের গন্ধের আকুতি, একটা শ্রমজীবী পরিবারের প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।
২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ব্যাঙ্ক, বিমা, কয়লা খনি, টেলিকম শিল্পের পাশাপাশি রেলকেও আদানি, আম্বানি, টাটা, বিড়লার মুনাফার জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। বিবেক দত্তরায় কমিটির সুপারিশে রেল বেসরকারিকরণের কাজ শুরু হয়। পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতা দখলের প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই রেল বেসরকারিকরণের কাজকে আরও দ্রুতগতিতে করার জন্য স্টেশনে স্টেশনে গরিব হকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মোদী সরকারের রেল দপ্তর। হকার উচ্ছেদের ক্ষেত্রে রেল দপ্তরকে সক্রিয় সহযোগিতা করছে রাজ্যের বিজেপি সরকার কারণ রাজ্য পুলিশের সহযোগিতা ছাড়া রেল কখনোই হকার উচ্ছেদ করে না। রাজ্যের বিজেপি সরকার তার কাজের অগ্রাধিকার নির্বাচন করেছে আরএসএস’র কথা অনুযায়ী। হকারদের দোকান ভাঙা পড়ছে কিন্তু আজ পর্যন্ত একটিও বন্ধ স্কুলের তালা ভাঙা পড়েনি।
রেল কর্তৃপক্ষ এই হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে কতগুলো দুর্বল যুক্তি খাড়া করছেন। যেমন যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য, হকারদের আইনি সংস্থান বিষয়ক কথা, সৌন্দর্যায়ন এবং আবর্জনা, যাত্রী নিরাপত্তা এবং খাবারের মান। বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থী রেল হকার নেতৃবৃন্দ যখন কথা বলতে গেছেন তখন রেলের আধিকারিকদের বক্তব্য ছিল যে যাত্রীরা হকারদের জন্যই নাকি প্লাটফর্মে হাঁটাচলা করতে পারেন না। অথচ বাস্তব একেবারেই তা নয়। এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে জায়গা কম পড়ছে বলে রেলের ফেন্সিং এর বাইরে হকাররা তাদের দোকান আগেই সরিয়ে নিয়েছেন। রেল কর্তৃপক্ষ এয় জানিয়েছিলেন যে ১৯৮৯ সালের রেলওয়ে অ্যাক্টে রেল হকারি বেআইনি বলা আছে। জীবন-জীবিকার রক্ষার জন্য একজন সাধারণ মানুষ তার নিজের পছন্দের পেশা বেছে নিতে পারবেন এই অধিকার সংবিধান তাকে দিয়েছে। যে মানুষ চুরি দুর্নীতি না করে নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সৎভাবে উপার্জন করছেন তার ওপর এই আক্রমণ অমানবিক। যে আইন মানুষের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয় তার বিরুদ্ধে লড়াই করার অধিকার অবশ্যই সাধারণ মানুষের আছে। প্রথম ইউপিএ সরকারের সময়ে রেল হকার নেতৃবৃন্দ তৎকালীন রেলমন্ত্রীর সাথে সভা করে হকারদের লাইসেন্সের দাবি আদায় করেছিলেন। তারপর রেল মন্ত্রী এবং সরকার উভয়েরই বদল ঘটে। প্রতিটি সরকার প্রচুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও রেল হকারদের জন্য একবিন্দু চিন্তা ভাবনা করেননি। বিজেপি তার আইটি সেল-কে ব্যবহার করছে এই দুর্বল যুক্তিগুলিকে আরও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। রেল হকারদের খাবারের গুণগত মান নিয়েও নানা প্রশ্ন তোলা হচ্ছে ইদানীং। কিন্তু অত্যন্ত অল্প দামে মুড়ি বা লুচি তরকারি খাওয়ার যে ব্যবস্থা রেলস্টেশনগুলোতে আছে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে আসলে গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষ বিপদে পড়বেন। এখনো পর্যন্ত কুড়ি ত্রিশ টাকার মধ্যে যে পেট ভরা খাবার মানুষ খেতে পারেন স্টেশনগুলিতে, রেল হকার বাতিল হয়ে গিয়ে বড় বড় দোকান তৈরি হলে পেট ভরানোর জন্য অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। গত পাঁচ বছরে যে মানুষের মজুরি সঠিকভাবে বাড়েনি তিনি বাড়তি অর্থের সংস্থান করবেন কিভাবে? রেল হকার উচ্ছেদ মানেই যে প্লাটফর্মে একটিও দোকান থাকবে না তা নয়। বিভিন্ন বড় বড় বেসরকারি সংস্থাকে প্লাটফর্মে দোকান বসানোর অনুমতি ইতিমধ্যেই রেল দপ্তর দিয়েছে। তাহলে যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য এবং খাবারের গুণগত মান পরীক্ষা করার যুক্তি কিছুতেই ধোপে টেকে না।
হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রচার ছিল যে প্রধানমন্ত্রী নাকি ছোটবেলায় স্টেশনে চা বিক্রি করতেন। চা বিক্রি করতে করতে হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী হয়ে গিয়ে রেলকে বেচে দেওয়ার এই প্রবণতা যেকোনও মূল্যে রুখতে হবে। এই প্রবণতার ফলে সবচেয়ে বিপদে পড়ছেন গরিব অংশের মানুষ, যারা রেল হকার। নতুন সরকারের নেতা মন্ত্রীরা আলোর ছটার মধ্যে থাকবেন আর অন্ধকারে তলিয়ে যাবেন গরিব রেল হকাররা, এ হতে দেওয়া যাবে না । যাঁরা বিপুল জনসমর্থন নিয়ে পশ্চিমবাংলায় মানুষের প্রতিনিধি হয়েছেন, এই দীর্ঘ রাতের অন্ধকারে তাঁদের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। কাজের বেলায় কাজী,কাজ ফুরোলে...?
রেললাইনের ধারে, উদ্বিগ্ন চোখের পাশে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে রাত জাগছেন বামপন্থীরা। বিরাটি, মধ্যমগ্রাম, হালিশহর, জগদ্দল, দমদম, সোদপুর, বিধান নগর, সোনারপুর, বারুইপুর সহ আরও বহু জায়গায় আন্দোলনের চাপে রেল কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু আমরা দেখলাম যে সময় দেওয়া হবে এই মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাতের অন্ধকারে দমদম ও উত্তরপাড়াতে রেল হকারদের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করা হলো। বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হলো। দমদম স্টেশনের হকারদের বলা হয়েছিল, "এখনই কিছু হবে না"। সেই আশ্বাসে ভরসা করেছিলেন গরিব মানুষ। কিন্তু রাত সাড়ে ১১টা বাজতেই নেমে এল রেল পুলিশ, রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। শুরু হো উচ্ছেদ অভিযান। গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জীবিকার শেষ সম্বল। সিপিআই(এম) ও সিটু নেতারা বারবার অনুরোধ করেছিলেন সময় দেওয়ার জন্য। যে স্টেশন আধিকারিকের সাথে কিছুক্ষণ আগেই কথা হলো, তিনিই হেলমেট পরে নেতৃত্ব দিলেন গরিব মানুষের পেটে লাথি মারার। ক্ষমতার বুলডোজারের সামনে চোখের জল গুরুত্ব পেল না। আমরা দাবি করছি বাস্তবতার নিরিখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী যখন বিরোধী দলনেতা ছিলেন তখন হকার উচ্ছেদ বা বুলডোজার চালানোর বিষয়ে যা মন্তব্য করেছিলেন আজ তার থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছেন। রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা থাকলে হকার উচ্ছেদ কখনোই সম্ভব হয় না। পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন রেল হকারদের গায়ে আচ লাগেনি কারণ সরকার সদর্থক ভূমিকা নিয়েছিল।
বিজেপি আসলে কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ নিয়েই চলে। কর্পোরেট সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের বিপুল টাকায় এই দলটা চলছে। বিজেপি যাদের নুন খেয়েছে তাদের গুণ গাইবার জন্যই স্টেশন চত্বর, প্ল্যাটফর্ম,রেলের আওতাধীন খালি জমি ব্যবসায়ীদের হাতে ওরা তুলে দিতে চায়। আমরা দাবি করছি বিধানসভায় অবিলম্বে এই গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের পেটে লাথি মারার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। বেপরোয়া হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে এবং তাদের প্রকৃত পুনর্বাসনের বিষয়ে আলোচনা হতে হবে বিধানসভায়। রেল হকার সমস্যার বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষ, রেল হকার সংগঠন গুলির প্রতিনিধি ও রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা হোক।
পশ্চিমবাংলায় সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভয়ঙ্কর অপশাসনের বিরুদ্ধে যে বিজেপি’র নেতারা জিতে এলেন, তারা এই রেল হকারদের থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ইতিহাস এই নিষ্ঠুর মুখ ফিরিয়ে নেওয়াকে মনে রাখবে, কারণ বিপদের সময়েই প্রকৃত বন্ধু চেনা যায়। ইতিমধ্যে ভয়ঙ্কর মানসিক যন্ত্রণায় দু’জন রেল হকার মৃত্যুকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই মৃত্যুর জন্য পরোক্ষে দায়ী কেন্দ্রীয় সরকার, এটা কিন্তু হকাররা ভোলেননি। এই যন্ত্রণা মনে আছে বলেই আগ্রাসী রেল পুলিশের সামনে নিজেদের জীবন বাঁচানোর লড়াইতে চোখে চোখ রেখে লড়ে যাচ্ছেন রেল হকাররা। আজকে এক স্টেশনে হকার উচ্ছেদ আটকে আগামীকাল সকালে আবার পৌঁছে যাচ্ছেন অন্য স্টেশনে হকার বন্ধুদের সাহায্য করতে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর সারা রাত জাগছেন পেট বাঁচাতে। এই ঐক্য আসলে তীব্র আন্দোলনের ফল। প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তো সরকারের দায়িত্ব। যে প্রান্তিক মানুষ দু’হাত তুলে কোনও সরকারকে আশীর্বাদ করেছে আবার সেই মানুষই দু’হাতে দিয়ে টেনে সেই সরকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।
Comments :0