২০২৭ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জোট শক্তিশালী করার বার্তা অখিলেশ যাদবের। তবে কংগ্রেসের আসন দাবি নিয়ে সমাজবাদী পার্টির অন্দরে সংশয়।
উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশেষে আসন সমঝোতা নিয়ে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে কংগ্রেস। সূত্রের খবর, রাজ্যের ৪০৩টি বিধানসভা আসনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১৭৫ থেকে ২০০টি আসনে লড়ার দাবি জানিয়ে সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বের কাছে তালিকা জমা দিয়েছে হাত শিবির। তবে কংগ্রেসের এই দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে সমাজবাদী পার্টির অন্দরে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কংগ্রেসের উত্তরপ্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা রাজেন্দ্র পাল গৌতম সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, দিন দুয়েক আগেই সমাজবাদী পার্টির নেতাদের হাতে সম্ভাব্য আসনের তালিকা তুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও আসন সংখ্যার বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাননি তিনি। গৌতমের কথায়, প্রায় ১৭৫ থেকে ২০০টি আসনের একটি তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। আসন ভাগাভাগির খুঁটিনাটি নিয়ে দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শীঘ্রই আলোচনায় বসবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে কংগ্রেসের এই আসন দাবিতে খুব একটা খুশি নন সমাজবাদী পার্টির একাংশের নেতারা। তাদের মতে, নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জয়ের সম্ভাবনাই হওয়া উচিত একমাত্র মাপকাঠি। সমাজবাদী পার্টির এক প্রবীণ নেতার কথায়, দলের প্রধান অখিলেশ যাদব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যার জয়ের সম্ভাবনা বেশি, তাকেই প্রার্থী করার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাজনৈতিক দর কষাকষিতে যে কেউ যে কোনও দাবি জানাতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে হলে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করতেই হবে।
কংগ্রেসের আসন দাবি ঘিরে এই সংশয়ের পিছনে রয়েছে উত্তরপ্রদেশে দলের দীর্ঘদিনের দুর্বল নির্বাচনী ফলাফল। ১৯৮৯ সালে শেষবার রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল কংগ্রেস। তার পর থেকে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে ক্রমশ প্রভাব হারিয়েছে হাত শিবির। ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সাতটি আসনে জয় পেয়েছিল কংগ্রেস। ২০২২ সালের নির্বাচনে এককভাবে লড়ে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র দু'টিতে।
তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে কংগ্রেসকে। ওই নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস ছ'টি আসনে জয়ী হয়। অন্যদিকে, সমাজবাদী পার্টি পায় ৩৭টি আসন। বিজেপির আসন সংখ্যা নেমে আসে ৩৩-এ। দুই দলের নেতাদের মতে, বিরোধী ভোট একজোট হলে উত্তরপ্রদেশে বিজেপিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা সম্ভব।
কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতার কথায়, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলই প্রমাণ করেছে যে, দুই দল একসঙ্গে লড়লে উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি করতে পারে। রাজনীতিতে পারস্পরিক সমঝোতা ও দেওয়া-নেওয়ার জায়গা থাকা জরুরি।
এদিকে, শুক্রবার লখনউয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জোট নিয়ে আশাবাদী বার্তা দিয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। তার বক্তব্য, কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং বিরোধী মঞ্চ ‘ইন্ডিয়া’-কে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরানোই তাদের সম্মিলিত লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে মানুষের কাছে পৌঁছে বিজেপির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। অখিলেশের দাবি, বিজেপিকে পরাজিত করতে বিরোধী জোট কার্যকরভাবেই এগিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের সাম্প্রতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনও আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। রাজ্য কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অজয় রাইয়ের জায়গায় বিধায়ক আরাধনা মিশ্র ‘মোনা’-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেসের কয়েকজন নেতার মতে, সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বের সঙ্গে মোনার সুসম্পর্ক আসন সমঝোতার পথ মসৃণ করতে পারে।
দলের একাংশের দাবি, অজয় রাই ভোটের আগে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোটের বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। বরং নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বুঝে সমঝোতার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২৭ সালের নির্বাচনের আগে জোটের সমীকরণ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা হয়েছে বলে মনে করছেন কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা।
সূত্রের খবর, বিজেপির কৌশল অনুসরণ করে কংগ্রেসও নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী সম্ভাবনার ভিত্তিতে বিভিন্ন আসনকে চিহ্নিত করেছে। কোন আসনে দলের জয়ের সম্ভাবনা বেশি, কোথায় সাংগঠনিক ভিত শক্তিশালী এবং কোথায় জোটের শরিকের অবস্থান ভালো এই বিষয়গুলিই আসন সমঝোতার আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে মূল লড়াই বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ এবং সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই পরিস্থিতিতে জোটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন নিশ্চিত করতে চাইছে কংগ্রেস। এনডিএ-র শরিক হিসেবে আপনা দল (এস) এবং নিষাদ পার্টিও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে বহুজন সমাজ পার্টি বা বিএসপি এখনও একটি স্বতন্ত্র শক্তি। ফলে আসন সমঝোতার পাশাপাশি জাতপাতের সমীকরণ, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভোটের মেরুকরণও আগামী নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিজেপিকে পরাস্ত করার লক্ষ্যে কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি ফের একজোট হওয়ার পথে এগোলেও আসন বণ্টনই হতে চলেছে দুই দলের কাছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কংগ্রেসের ১৭৫ থেকে ২০০টি আসনের দাবি শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়িত হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
Uttar Pradesh
উত্তরপ্রদেশে আসন সমঝোতা নিয়ে কংগ্রেস-সমাজবাদী পার্টির আলোচনা শুরু, ১৭৫-২০০ আসনে লড়তে চায় হাত শিবির
×
Comments :0