শারৎসব মানে আনন্দ, নতুন পোশাক, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা আর উৎসবের আবহে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু এই উৎসবের মরশুমেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সিপিআই(এম)-এর বুক স্টল ঘিরে তৈরি হয়েছে সংঘাত, বাধা ও বিতর্ক। বিজেপি ও আরএসএসের কর্মীদের হামলার মুখে পড়তে হয়েছে বুক স্টলকে, কোথাও আবার স্টল সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। কিন্তু সেই বাধার মধ্যেও বই বিক্রির পরিসংখ্যান দেখিয়েছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনও অটুট।
যাদবপুর থেকে হালতু, কসবা বিভিন্ন জায়গার এই ঘটনাগুলি শুধু কয়েকটি বুক স্টলের টিকে থাকার লড়াই নয়। বরং উৎসবের বাজারে বই, মতাদর্শ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং রাজনৈতিক অধিকারকে ঘিরে বৃহত্তর প্রশ্নও তুলে দিয়েছে।
এই ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যাদবপুরের বুক স্টল। প্রতি বছর যাদবপুর ৮বি-তে বুক স্টল হয়। এবারও হয়েছে। সেই স্টল ভেঙে দিতে বুলডোজার নিয়ে এসেছিল পুলিশ। কিন্তু সিপিআই(এম) কর্মী-সমর্থকদের দৃঢ় অবস্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হয় তাদের। স্টল ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে সংঘাতের আবহেও থেমে থাকেনি বই বিক্রি। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যাদবপুরের ওই বুক স্টলে ১৬ লক্ষ টাকারও বেশি মূল্যের বই বিক্রি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বাধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও পাঠকদের উপস্থিতি এবং বই কেনার আগ্রহ স্টলটিকে কার্যত এক সাংস্কৃতিক জমায়েতের চেহারা দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রচারের বাইরে বইয়ের এই বিপণন দেখিয়েছে, উৎসবের পরিসরকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প চিন্তা, ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনৈতিক তত্ত্বের বইও পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারে।
একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে হালতুর বুক স্টলকেও। অভিযোগ, ১০৬ নম্বর ওয়ার্ডের স্টল স্টল তুলে দিতে এসেছিল। কিন্তু বাধার পরিস্থিতির মধ্যেও বই বিক্রি চলতে থাকে। স্টল নেতৃত্বের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, হালতুতে ওই স্টলে প্রায় ৫০ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে।
যাদবপুরের তুলনায় বিক্রির অঙ্ক কম হলেও, এই ঘটনাকে শুধুমাত্র টাকার হিসাব দিয়ে বিচার করতে নারাজ বামপন্থী কর্মী-সমর্থকদের একাংশ। তাদের কাছে বুক স্টল মানে শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা, রাজনৈতিক-সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা এবং পাঠাভ্যাসকে উৎসাহিত করার একটি ক্ষেত্র।
কসবায় পরিস্থিতি ছিল আরও অন্য রকম। অভিযোগ, সেখানে বুক স্টল তুলে দেওয়া হয়। আক্রান্ত হন সিপিআই(এম) কর্মীরা। কিন্তু তাতেও উদ্যোগ থামেনি। মিলন ব্যানার্জি নামে এক ব্যক্তির বাড়ির গ্যারেজে নতুন করে সাজানো হয় বইয়ের স্টল। সেই অস্থায়ী পরিসরেও বিক্রি হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকার বই।
এই ঘটনা যেন দেখিয়ে দিল, নির্দিষ্ট জায়গা থেকে স্টল সরিয়ে দেওয়া গেলেও বইয়ের প্রতি আগ্রহকে সহজে সরিয়ে দেওয়া যায় না। রাস্তার ধারের স্টল না থাকলে গ্যারেজও হয়ে উঠতে পারে পাঠকের মিলনস্থল।
শুধু জাদবপুর, হালতু, কসবা নয়। দমদম, ব্যারাকপুর, পুরুলিয়া, বারাসাত সর্বত্র হয়েছে হামলা। কিন্তু বুক স্টল থামাতে পারেনি বিজেপি আরএসএস। উল্লেখ্য শারৎসবের আগেই স্টল নিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আক্রমণ হবে জেনেও জেদ নিয়ে রাজ্য জুড়ে চলেছে স্টল। আর এই জেদ নতুন করে লড়াইয়ের ইতিহাস লেখার সূচনা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এই সব ঘটনাগুলির মধ্যে পরিস্থিতিগত পার্থক্য থাকলেও একটি মিল স্পষ্ট বাধার মুখেও বুক স্টল চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। একদিকে স্টল ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের অভিযোগ, অন্যদিকে বই কিনতে মানুষের উপস্থিতি।
তবে এই ঘটনাগুলির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসন, বিজেপি ও আরএসএসের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন। অভিযোগগুলির স্বাধীন যাচাইও জরুরি।
তার পরেও একটি প্রশ্ন সামনে থেকে যায় উৎসবের জনপরিসরে বইয়ের স্টল থাকবে কি না, মানুষ নিজের পছন্দের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন কি না?
বিক্রির অঙ্ক সেই প্রশ্নের পুরো উত্তর দেয় না। কিন্তু যাদবপুরের ১৬ লক্ষ টাকার বেশি বিক্রি, হালতুর প্রায় ৫০ হাজার এবং কসবায় গ্যারেজের মধ্যে ৫০ হাজার টাকার বই বিক্রির তথ্য অন্তত এটুকু জানায় বাধা সত্ত্বেও বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহকে উপেক্ষা করা কঠিন। উৎসবের আলোয় তাই শুধু মণ্ডপ নয়, আলোচনায় উঠে এসেছে বইও।
Book Stall
হামলা, বাধা, বুলডোজারের হুমকি তবু বইয়ের টানে জনতা, শারৎসবে বামপন্থী বুক স্টলে বিক্রির নজির
×
Comments :0