Naxalbari Tea Estate

‘আমাদের কি পেট নেই, না খেয়ে থাকব’: গনগনে ক্ষোভ নকশালবাড়ির সবুজ বাগানে

রাজ্য স্পটলাইট

নকশালবাড়ি টি এস্টেটে দল বেঁধে ক্ষোভের কথা বলছেন শ্রমিকরা।

অনিন্দিতা দত্ত: নকশালবাড়ি

সকাল তখন ঠিক ১১ টা বেজে ২০ মিনিট। নকশালবাড়ি টি এস্টেটে কর্মরত চা শ্রমিকরা তখনও পাতা তোলার কাজ করে যাচ্ছেন আপন মনে। আর কিছুক্ষণ পর, অর্থাৎ সকাল সাড়ে এগারোটায়, জলখাবারের বিরতি। বাগানের খুব কাছে সংবাদ মাধ্যমের গাড়ির দিকে একবার দেখে ফের পাতা তোলার কাজ শুরু করে দিলেন। 
বিরতির সাইরেন বাজতেই চা শ্রমিকরা একসঙ্গে সংবাদ মাধ্যমের গাড়ির কাছে এলেন। প্রশ্ন করতেই বোঝা গেলে বিগত তৃণমূল এবং এখন আসীন বিজেপি সরকারের কাছে চা শ্রমিকরা সব সময়ই ' ব্যাক বেঞ্চার'। কোনও সরকারের ভূমিকায় সন্তুষ্ট নন শ্রমিকরা। 
তাঁদের বক্তব্য, বড় বড় আগাছায় ভরা থাকে চা বাগান। সাপ, পোকা মাকড় থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তবুও সুরক্ষার জন্য জুতো দেয় না মালিকপক্ষ। তাঁরা বললেন, ‘‘আমরা অনেক কষ্টে থাকি, যা টাকা পাই সেটা দিয়ে কোনোমতে দিন পার করি। সেটাও যখন পাই না, তখন চলবো কিভাবে? আমাদের কি পেট নেই? না খেয়ে থাকবো?” 
কাছেই ছিলেন নকশালবাড়ি টি এস্টেটে গণ আন্দোলনের নেতা বিনোদ প্রধান। তিনিও চা শ্রমিক, বললেন এই বাগানে অনেক শ্রমিক আছেন যাঁরা প্রায় ৪০ বছর চা পাতা তোলার কাজ করছেন। আবার অনেকে পাঁচ ছয় বছর কাজ করছেন। নিজেদের ব্যবহারের জমি আছে, কিন্তু সরকার এখনও পাট্টা দেয়নি। তিনি বললেন, দেওয়া হোক পাট্টা। সেই সঙ্গে মজুরি বাড়ানো হোক।
দুর্গা পূজার আগে বোনাস আর বেতন পাবেন? প্রশ্ন শুনেই চা শ্রমিকরা একসুরে বলে উঠলেন, আগের সরকার ঘোষণা করেছিল ২০ শতাংশ বোনাস দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা গেলো না। অনেক বাগিচা শ্রমিক বোনাস পাননি আজও। কোনও কোনও চা বাগানের মালিকরা আবার বোনাস না দেওয়ার জন্য বাগান বন্ধ করে দিয়ে চলে গিয়েছে। প্রায় ৭০টি চা বাগান শ্রমিকদের বোনাস দেয়নি। অনেক বাগান আবার দুই, তিন বা চার কিস্তিতে বোনাস দিয়েছে। 
চা শ্রমিকরা বললেন, এবারও মুখ্যমন্ত্রী উৎসবের আগেই বাগিচা শ্রমিকদের জন্য ২০ শতাংশ বোনাসের দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। শ্রম দপ্তর থেকে নির্দেশিকা জারি হয়েছে। কিন্তু এবারও আশাবাদী নই আমরা। 
শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা নিদারুণ।  প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপি নেতারা বিধানসভা নির্বাচনের আগে বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বাংলায় বিজেপি সরকারে এলে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করা হবে। মহিলাদের অন্নপূর্ণা যোজনার ৩ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। বাস্তবে তা হয়নি। আবেদন করা হয়েছে, তবুও মেলেনি অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা। প্রতিশ্রুতি মতো বাড়েনি চা শ্রমিকদের মজুরি। দেওয়া হয় না ঘরে খাওয়ার জন্য মাসে ৫০০ গ্রাম চা। আগে দেওয়া হতো, কিন্তু গত দু’মাস বন্ধ। 
চা শ্রমিকদের ৬৬১ টাকা মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে অনেক দিন আগে। কিন্তু বাস্তবে চা শ্রমিকরা এখনও সেই মজুরি পান না। তাদের দৈনিক ২৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করতে হয়। সেখানেও নিয়ম রয়েছে প্রতিদিন ২৪ কেজি পাতা তুললে সেই মজুরি দেওয়া হবে শ্রমিককে। তার বেশি পাতা তুললে প্রতি কেজি ৩টাকা করে বাড়তি পাবেন।  
চা শ্রমিকরা এদিন জানলেন যে বাগান মালিক দিল্লিতে থাকেন।  রেশন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব মারাত্মক। তাঁরা বলছেন, সংবাদ মাধ্যমের উচিত এই দাবি সকলকে জানানো। 
শান্ত সবুজ ছায়াঘেরা চা-বাগান, যেন মনে হচ্ছে সবুজ কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। পর্যটকরা ক্যামেরা বন্দি করছে সেই দৃশ্য কিন্তু শ্রমিকের কঙ্কালসার দেহ, আর ক্ষুধার্ত চোখ দেখে বোঝা গেল ‘সোনালি তরলের সোনালী অধ্যায়’ আসলে লিখিত হয়েছে শোষণ আর বঞ্চনার রক্তাক্ত অক্ষরে। বাগানের হাল হকিকতের তথ্য সে ইতিহাসেরই নির্মম দলিল। এখানকার চা-বাগান আসলে বৃহৎ বুর্জোয়ার নেতৃত্বে বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র ব্যবস্থার বোঝাপড়া হিসাবে টিকে রয়েছে। এ বন্দোবস্তে রয়েছে শ্রমশক্তির যথেচ্ছ শোষণ ও উদ্বৃত্ত মূল্যের চুরি।
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই কাজে নেমে পড়েন শ্রমিকরা। কাঠফাটা রোদে দিনভর সংগ্রহ করেন চা পাতা। বৃষ্টিতে ভিজে, খালি পায়ে, জোঁক আর বিষাক্ত সাপের সঙ্গে যুদ্ধ করে চা বাগানকে আঁকড়ে জীবন পার করছেন তারা। তবুও মেলে না সুরক্ষার জন্য জুতো, রুমাল। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি করেও দৈনিক মজুরির অর্ধেকও মেলে না। হাজার কষ্টের মধ্যেও সবুজ চা বাগানের সীমানাতেই আটকে আছে তাঁদের জীবন।

Comments :0

Login to leave a comment