মধুসূদন চ্যাটার্জি
গত এক দশকে বিপন্ন বাঁকুড়ার বিড়ি শ্রমিকরা। ২০ হাজার বিড়ি শ্রমিক আছেন বাঁকুড়া জেলায়। এঁদের মধ্যে মহিলা বিড়ি শ্রমিকই বেশি। কম বয়সি যুবক একেবারেই নেই। আবার মহিলা শ্রমিক যাঁরা আছেন তাঁরাও মাঝ বয়সি। অনেকেই আবার কাজ ছেড়ে পরিচারিকার কাজ করতে চলে যাচ্ছেন। কারন একদিকে বিড়িতে কাজ ভীষনভাবে কমে গেছে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষার যে ব্যবস্থাগুলি ছিল তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পাওনা বলতে শ্বাসকষ্ট, ঘাড়ের স্পনডেলাইসিস, মেরুদন্ড বেঁকে যাওয়া, চোখের রোগে আক্রান্ত হওয়া। নেই ন্যুনতম মজুরি। অথচ রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার এই বিড়ি শিল্প থেকে বিপুল অর্থ উপার্জন করছে। সেখানে বিড়ি শ্রমিকরা ব্রাত্য থেকে যাচ্ছেন। এটা ঘটছে গত ১০ বছর ধরে।
শুক্রবার বাঁকুড়া জেলা বিড়ি কারিগর ইউনিয়ন( সিআইটিইউ) এর জেলা সম্পাদক ভৃগুরাম কর্মকার জানান, বিড়ি শ্রমিকরা আজ আর্থিকভাবে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। যেখানে সংগঠিতভাবে তাঁরা কাজ করেন যেমন বাঁকুড়া কোঅপারেটিভ, ৫২২, উষা কারখানা সহ কয়েকটি জায়গায় বিড়ি শ্রমিকরা হাজার বিড়ি বাঁধলে ২০০ টাকা মজুরি পান। কিন্তু বহু শ্রমিক আছেন যাঁরা সংগঠিতভাবে কাজ করেন না। মালিকের দেওয়া দোক্তা পাতা নিয়ে বিড়ি বাঁধেন,তাঁরা ১২০-১৪০ টাকা মজুরি পান হাজার বিড়িতে। কিন্তু কোন শ্রমিকই দিনে হাজার বিড়ি বাঁধার বরাত পাননা। ৫০০-৬০০ বিড়ি বাঁধেন। এই টাকায় কি করে সংসার চালাবেন তাঁরা? তাই যুবকরা কেউই বিড়ি বাঁধার কাজে আসছেন না। তিনি জানান, বিড়িতে কেন্দ্রীয় সরকার সব চেয়ে বেশি জিএসটি বসিয়েছে। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আসার আগে হাজার বিড়িতে সরকার ট্যাক্স নিত ১৬টাকা ৮০ পয়সা। এখন সেখান জিএসটি বসিয়ে ট্যাক্স হাজার বিড়ি পিছু নেওয়া হয় ১৪৫ টাকা। এই টাকা কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েই পাচ্ছে। এটা কতজন মানুষ জানেন। এরসঙ্গে আছে বিড়ি তৈরীর কেন্দপাতার জিএসটি। এই টাকায় বিড়ি শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা সহ একাধিক প্রকল্প ব্যবস্থা করতে পারত কিন্তু এই বিষয়ই সচেষ্ট নয় সরকার।
এদিন বাঁকুড়া কোঅপারেটিভ বিড়ি কারখানার শ্রমিক মমতা গড়াই, সুলেখা গড়াই, ৫২২ কারখানার অশোক বাগদিরা জানান, আগে বিড়ি শ্রমিকদের ঘরের জন্য সরকার টাকা দিত, সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার জন্য টাকা দিত সেটাও বন্ধ। উষা বিড়ি কারখানার শ্রমিক মঙ্গলা গড়াই, বেলারানী দাস'রা জানান, বিড়ি শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য যে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বাঁকুড়া লালবাজারে রয়েছে, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায়না। পাশাপাশি একাধিক শ্রমিক জানান, সপ্তাহে কোন শ্রমিকই ৬ দিনই কাজ পাননা। কেন্দ্রীয় সরকার বিড়ির উপর নানা ধরনের ভীতিমূলক বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষের মনকে আতঙ্কিত করেছে, অন্যদিকে বিড়ির খদ্দের তো মুলত গরীব মানুষ, তাঁদের হাতে কাজ কোথায়? দুবেলা খাবেন নাকি ধূমপান করবেন? তাই খুব বেশি হলে ১০০ টাকা আয় করতে পারেন শ্রমিকরা। কিন্তু পরিশ্রম, বিষাক্ত জিনিস শরীরের ভেতরে নেওয়ায় অচিরেই বহু শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। গত এক দশকে কেন্দ্র রাজ্য কোন সরকারই তাঁদের পাশে নেই।
কিন্ত এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও বাঁকুড়ার বিড়ি শ্রমিকরা লালঝান্ডার সঙ্গেই আছেন। বাঁকুড়া জেলায় কমিউনিষ্ট পার্টি তৈরীর সময়ই এই বিড়ি শ্রমিকদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে ব্যাপক প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেও সেই ঐতিহ্য তাঁরা ধরে রেখেছেন। এবারের নির্বাচনেও তাঁরা কারখানায় কারখানায় লালঝান্ডার প্রার্থীর হয়ে প্রচার ও করছেন।
Comments :0