প্রবন্ধ
মুক্তধারা
প্রাচীন ভারতে নৃত্য ও সঙ্গীত
অরিজিৎ মিত্র
২০২৬ এপ্রিল ৩০ | বর্ষ ৩
ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসে নৃত্য ও সঙ্গীত এমন এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, যা মানবজীবনের আনন্দ, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং সমাজব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে নৃত্য ও সঙ্গীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; বরং তা ছিল আধ্যাত্মিক সাধনা, সামাজিক অভিব্যক্তি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাহক।
মৌর্যবংশের পতনের পর ভারতে বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজ্যের উত্থান ঘটে—যেমন উত্তর ভারতে শুঙ্গ ও কান্ববংশ এবং দক্ষিণ ভারতে সাতবাহন ও চেদি বংশ। এই সময়েও নৃত্য ও সঙ্গীতচর্চা অব্যাহত ছিল। সাঁচি স্তূপ ও বারহুতের ভাস্কর্য থেকে জানা যায় যে, তখনকার সমাজে নৃত্যগীতের যথেষ্ট প্রচলন ছিল। বিশেষত, বারহুতের ভাস্কর্যে অপ্সরা ও গন্ধর্বদের নৃত্যগীতের চিত্র এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে।
এরপর কুষাণ যুগে সম্রাট কণিষ্কের আমলে নৃত্য ও সঙ্গীতের বিশেষ উন্নতি ঘটে। তিনি নিজে সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন এবং তাঁর সময়ে অশ্বঘোষ ও নাগার্জুনের মতো নাট্যকারদের আবির্ভাব ঘটে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নৃত্য তখন রাজসভা ও সাধারণ উভয় স্তরেই সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল।
গুপ্তযুগকে ভারতীয় সংস্কৃতির “স্বর্ণযুগ” বলা হয়। এই সময়ে নৃত্য, সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পকলার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। সমুদ্রগুপ্ত ও চন্দ্রগুপ্ত দ্বিতীয়ের আমলে নারী ও পুরুষ উভয়েই স্বাধীনভাবে নৃত্য ও গীতচর্চা করতেন। ফা-হিয়ানের বিবরণ থেকেও এই সময়কার সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। অজন্তা ও ইলোরার গুহাচিত্রে নৃত্য ও সঙ্গীতের অসাধারণ নিদর্শন আজও সেই ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।
প্রাচীন ভারতের নৃত্য ও সঙ্গীত ধর্মীয় প্রভাব থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিল না। গুপ্তযুগে হিন্দুধর্মের প্রসারের ফলে নৃত্যে শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবধারার প্রভাব পড়ে। নটরাজ শিবের মূর্তি নৃত্যের এক মহাজাগতিক রূপকে তুলে ধরে। মন্দিরের নাটমণ্ডপে দেবদেবীর উদ্দেশ্যে নৃত্য পরিবেশন ছিল এক অপরিহার্য প্রথা।
হর্ষবর্ধনের আমলেও নৃত্য ও সঙ্গীতের মর্যাদা অটুট ছিল। তিনি নিজেই নাট্যরসিক ছিলেন এবং ‘রত্নাবলী’ ও ‘নাগানন্দ’ নাটক রচনা করেন। তাঁর রাজসভায় নট-নটী ও সঙ্গীতজ্ঞদের বিশেষ সম্মান দেওয়া হত।
এই সময়ে বিভিন্ন সঙ্গীতশাস্ত্র রচিত হয়, যা নৃত্য ও সঙ্গীতের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তোলে। ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’, নন্দিকেশ্বরের ‘অভিনয় দর্পণ’, শারঙ্গদেবের ‘সঙ্গীত রত্নাকর’ প্রভৃতি গ্রন্থে নৃত্যের বিভিন্ন অঙ্গ, রস ও ভঙ্গিমার বিশদ আলোচনা পাওয়া যায়। এই গ্রন্থগুলিই ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের মূল ভিত্তি।
মন্দির, গুহাচিত্র ও ভাস্কর্যেও নৃত্যের বিস্তৃত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সাঁচি, অমরাবতী, অজন্তা, ইলোরা, খাজুরাহো ও কোনার্কের মন্দিরে নৃত্যরত মূর্তি থেকে প্রাচীন নৃত্যকলার রূপ স্পষ্ট হয়। বিশেষত চিদাম্বরম মন্দিরে খোদিত ১০৮টি নৃত্যের করণ ভারতীয় নৃত্যের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করে।
তবে মধ্যযুগে বৈদেশিক আক্রমণ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে শিল্পকলার চর্চা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবুও নৃত্য ও সঙ্গীত সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়নি। বরং বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিকশিত হয়ে আজকের কথক, ভরতনাট্যম, মনিপুরী ও কথাকলির মতো নৃত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, প্রাচীন ভারতের নৃত্য ও সঙ্গীত শুধুমাত্র একটি শিল্পরূপ নয়—এটি ভারতীয় সভ্যতার আত্মা। যুগে যুগে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই ঐতিহ্য টিকে আছে এবং আজও আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।
দশম শ্রেণী কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা কল্যাণনগর খড়দহ
Comments :0