Post Editorial

ভাগাভাগির বিরুদ্ধে রুজিরুটির মহাজোট

উত্তর সম্পাদকীয়​

শান্তনু চক্রবর্তী

আমাদের ঠিক জানা নেই, ২০২৬-এ ভারতীয় জনতা পার্টির ভোট প্রচারের ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ হিসাবে তিনি টুপ করে বঙ্গভূমিতে অবতরণ করবেন কি না। তবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখনও অবধি কাজল শিঙ্গনাকে বিশেষ চেনেন-জানেন বলে মনে হয় না। কিন্তু গুজরাটের জনগণ, বিশেষ করে সেখানকার পুলিশ তাঁকে হাড়ে হাড়ে চেনেন। এই ভারতে হিন্দুত্ববাদের জ্যান্ত পরীক্ষাগার তথা কেন্দ্রীয় শাসক দলের প্রধান মানিকজোড় মোদী-শাহর রাজনৈতিক শৈশবের লীলাভূমি গুজরাটে সবাই শ্রীমতী কাজলকে চেনে কাজল ‘হিন্দুস্তানি’ নামে। ঘৃণা-ভাষণের জন্য গুজরাট পুলিশ একাধিকবার এফআইআর করেছে। ২০২৩ সালে রামনবমীর সময় গুজরাটের উনা‍‌-তে তেনার ভাষণের জেরে তো রীতিমত সাম্প্রদায়িক দা্ঙ্গা বেঁধে যায়। তখনও পুলিশ এফআইআর করেছিল। আর তারপর গুজরাট সহ যে কোনও ডাবল ইঞ্জিন সরকার শাসিত রাজ্যে যেমনটি হয়ে থাকে— হিন্দুত্ববাদী ইকো-সিস্টেমের ভেতরে বা ধারেকাছে থাকা লোকজনের সাত-দু’গুণো চোদ্দ খুনও মাফ হয়ে যায়। শ্রীমতী কাজলের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। এফআইআর-এ নাম লিখেও পুলিশ অভিযুক্তকে ডাকতে ভুলে যায়। তারপর তদন্তটা শেষ করতেও ভুলে যায়। তারও পরে মানুষও সবটা ভুলে যায়। তাছাড়া কাজল দেবী তো যে সে লোক নন। তিনি একজন স্বঘোষিত (হিন্দু) জাতীয়তাবাদী। নামের থেকে পৈতৃক পদবি সরিয়ে সেখানে ‘হিন্দুস্তানি’ এঁটে দিয়েছেন। ইনস্টাগ্রামে যাঁর ঘৃণা ভাষণের লক্ষ লক্ষ ‘ভিউজ’! এক্স হ্যান্ডলে ‘ফলোয়ার্স-এর সংখ্যা লাখ ছুঁই ছুঁই। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীজীও সেখানে তাঁকে ‘ফলো’ করেন। সুতরাং সামান্য পুলিশের সাধ্য কী তাঁকে ছুঁতে পারে! 
এ হেন শ্রীমতী ‘হিন্দুস্তানি’ যেমন (সঙ্ঘ) পরিবারের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে পেশাদারিভাবে সম্প্রীতি মারা বিষ ছড়িয়ে আসেন, তেমনই স্বজনদের ডাকে বিদেশেও মোদী-মাহাত্ম্য প্রচার করে বেড়ান। আর কে না জানে, মোদীকে ‘মহাত্মা’ বানাতে গেলে, মোদীর যেখানে যা শত্রুপক্ষ তাকে তাদের ‘দুরাত্মা’ প্রমাণ করতেই হবে। কাজল নিষ্ঠাভরে সেই কাজটাই করে থাকেন। যেমন গত জুলাইয়ে নিউইয়র্কের গুজরাট সমাজের ডাকে সেখানে গিয়েছিলেন। তার মাসখানেক আগেই তরুণ জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচনের প্রাইমারি-তে আন্ড্রু কুওমোকে হারিয়ে ডে‍‌মোক্রাটিক দলের তরফে প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। আর ‘হিন্দুস্তানি’ কাজল নিউইয়র্কে জোহরালের নিজের পাড়া কুইন্স-এ গিয়ে তাঁকে ‘রাফম’ ‘অসুর’, ‘জোম্বি’, জিহাদি ইত্যা দি বলে এলেন প্রায় যে ভাষায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ অবধি মামদানিকে দুষে এসেছেন নির্বাচনে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরা। যে তালিকায় এক নম্বর নামটাই ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সেদিন অবধি যিনি ছিলেন আমাদের স্বঘোষিত বিশ্বগুরুর দোস্ত নাম্বার ওয়ান! তাই তো সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পরিয়ে মোদীজী মার্কিন মুলুকে গিয়ে আখরিবার ট্রাম্প সরকারের হুঙ্কার দিয়ে এসেছেন। ‘হাউডি মোদী’ মেগা শো-এ টেক্সাসের স্টেডিয়াম ভর্তি ভারতীয়-আমেরিকান জনতার সামনে দুই দেশের দুই রাষ্ট্রপ্রধান একে অন্যের বাহু জড়িয়ে ‘ইয়েহ দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে’ গোছের শপথ নিয়েছেন। ট্রাম্পের মঙ্গল কামনায় গুজরাট-মহারাষ্ট্র-হরিয়ানা-উত্তর প্রদেশে মন মন ঘি পুড়িয়ে ট্রাম্পের ছবিতে মালা পরিয়ে যাগযজ্ঞ হয়েছে।
এহেন জিগরি সখা, বুকেরই ধন ট্রাম্পজী যে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফেরার কয়েক মাসের মধ্যেই বন্ধুত্বকে চুলোর দোরে পাঠিয়ে, মোদীজির বিশ্বগুরু ইমেজ-এ এতগুলো ছ্যাঁদা করবেন, সে তো স্বপ্নেও ভাবা যায়নি। কিন্তু তার পরেও তো ট্রাম্পের শত্রু আমাদের শত্রু, ট্রাম্পের মত আমাদের মত। তাই ট্রাম্প যাঁকে ‘সন্ত্রাসী’ ‘জিহাদি’ ‘কমিউনিস্ট’ (মার্কিন মুলুক ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটা সন্ত্রাসবাদী’-র চেয়েও কড়া গালাগালি), অসভ্য জংলি (মোহরান হাত দিয়ে বিরিয়ানি খেয়েছেন, পশ্চিমি সভ্যতা-বিরুদ্ধ ভাবে!) ইত্যাদি বলেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদের অগ্নিকন্যা কাজলদেবী তাঁকে আর্য মতে রাক্ষস, অসুর-টসুর বলতেই পারেন। সাচ্চা হিন্দুস্তানি দেশভক্ত কাজল শুধু এটুকুতেই থেমে থাকেননি। তিনি জোহরান মামদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, মামদানি নাকি জুতো পায়ে নিউইয়র্কের হিন্দু মন্দিরে ঢুকেছেন। আর জোহরান সহ নিউইয়র্ক তথা গোটা যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়কে হুমকি দিয়েছেন, ‘‘তুম মুল্লো কা বাপ কা আমেরিকা থোড়ি হ্যায়—’’! অবিকল এই ভাষাতেই তো কাজলের স্বদেশবাসী হিন্দু বীররা হুঙ্কার দেন— ‘বাবর কা আওলাদ, পাকিস্তান যাও’! গুজরাট সমাজের আয়োজন করা কুইন্সের সভায় কাজল ওটুকুতেই থেমে থাকেননি। নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছেন, একজন হিন্দু কা বেটি’ ঘর থেকে বেরোতেই নিউইয়র্কে মুসলিমদের হাল খারাপ হয়ে গেছে। এরপর যখন সমস্ত সনাতনি দুর্গারা দরজা খুলে বেরিয়ে আসবেন, তখন এই মহিষাসুর মামদানিরা পালাবার পথ খুঁজে পাবে না। 
মানে খোদ নিউইয়র্কের বুকে দাঁ‍‌ড়িয়ে রীতিমত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উসকানি! আর গুজরাট সমাজের ডাকে সাড়া দিয়ে কাজল হিন্দুস্তানির এই ঘৃণা ভাষণের জলসায় হাজির থেকেছিলেন স্বয়ং এরিক অ্যাডামস — আগামী ৩১ ডিসেম্বর অবধি যিনি নিউইয়র্কের মেয়র পদে আছেন। এখন মামদানি তথা মুসলিম বিদ্বেষী এই সমাবেশে শামিল হওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাডামসের নিজস্ব একটা সমীকরণ থাকতে পারে। তিনি আরও একবার মেয়রের কুর্সিতে বসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় ডেমোক্রাটিক পার্টি তাঁকে প্রাইমারিতেই মনোনয়ন দেয়নি। সেই জ্বালাতে জোহরান বিরোধী সভা-সমাবেশে তাঁর চলে যাওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়। প্রাইমারিতে মামদানির কাছে গো হারান হেরে, নিউইয়র্ক প্রদেশের প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো তো স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে নির্দল প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁকে জেতাতে (বৈা ‘জিহাদি, কমিউনিস্ট ’ জোহরানকে হারাতে) নিউইয়র্কের অতিধনী ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা ডলারের থলি নিয়ে নেমে পড়েছিলেন বলেও শোনা গেছে। কিন্তু নিউ ইয়র্কের ‘গুজরাট সমাজ’ বা কাজল হিন্দুস্তানিরা কেন জোহরান মামদানিকে টার্গেট করবেন? জোহরান তাঁদের কোন পাকা ধানে মই দিয়েছেন? সেটা বুঝতে গেলে সঙ্ঘ পরিবারের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির স্বদেশি ও আন্তর্জাতিক বাজার আর সেটার সঙ্গে জোহরান মামদানির মতাদর্শগত সংঘাতের জায়গাগুলো বোঝা দরকার। আমাদের বুঝতে হবে, ঋষি সুনক যুক্তরাজ্যের প্রথম ‘হিন্দু প্রধানমন্ত্রী’ হওয়ার পরে, এমন কী কমলা হ্যারিস আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার পরেও, এই ভারতের প্রচার মাধ্যমে যে হিল্লোল উঠেছিল, মামদানি সব বাধা পেরিয়ে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বিষাক্ত আক্রমণ উপেক্ষা করে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরে সেই উচ্ছ্বাসের সিকিও কিন্তু দেখা যায়নি। কেন? পুরোদস্তুর ভারতীয় মা ও উগান্ডা-প্রবাসী গুজরাটি মুসলিম পিতার সন্তান জোহরানের ‘ভারতীয় শিকড়’ এখানে বিবেচিত হলো না কেন? তার অন্যতম একটা কারণ তো অবশ্যই জোহরানের মুসলিম পরিচয়। নির্বাচনী প্রচারের কোনও সময়েই তিনি যে আত্মপরিচয়টা আড়াল রাখার চেষ্টা করেননি। ইসলাম ফোবিয়া বা মুসলিম আতঙ্ক-বিদ্বেষের লালন-চারন-ধাত্রীভূমি মার্কিন-মুলুকের মাটিতে দাঁড়িয়েও নয়। তবে তার চেয়েও বড় কারণ জোহরান আরএসএস ও তার প্রাক্তন প্রচারক ও বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত সমালোচক ও বিরোধী।
আর এই বিরোধিতা সম্পূর্ণভাবেই মতাদর্শগত। প্রচার-বক্তৃতা-সাক্ষাৎকারে জোহরান যেমন এক নিঃশ্বাসেই বলেছেন, ‘আমি তরুণ, আমি মুসলিম, আ‍‌মি গণতান্ত্রিক সমাজবাদী’— তেমনই তিনি একই সঙ্গেই ট্রাম্প এবং মোদী দু’জনকেই ‘ফ্যাসিস্ত’ বলেছেন। হিন্দু হৃদয়সম্রাট নরেন্দ্রভাই আর জায়নবাদী-আগ্রাসনের ‘পোস্টার বয়’ বেঞ্জামিন নেতানেয়াহু দু’জনকেই যথাক্রমে গুজরাট ও গাজার গণহত্যার জন্যে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলেছেন, এবং নিউইয়র্কের মাটিতে পা রাখলে গ্রেপ্তারেরও হুমকি দিয়েছেন। জোহরানের কথায় তারুণ্যের জোস যতটা ছিল, বিশ্বাসের দৃঢ়তা, নিজের মতপ্রকাশের প্রত্যয় আর সততাও কিছু কম ছিল না। আর এদেশের গোদি মিডিয়া ও সমাজ-মাধ্যমে মোদীজির ভক্তকূল, এই জায়গা থেকেই জোহরানকে সরাসরি ‘হামাস-পন্থী’, ‘সন্ত্রাসবাদী’, ‘পাকিস্তানের বন্ধু’ ইত্যাদি বলে দাগিয়ে দিতে নেমে পড়েছিল। তাদের সমীকরণ খুব সহজ আর পরিষ্কার। মোদী মানেই ভারত আর মোদী বিরোধী মানেই ভারত-বিরোধী তার মানেই পাকিস্তানপন্থী। একইভাবে প্যালেস্তাইন মানেই ইসলাম-আরব-জঙ্গি-জিহাদ। মানে হামাস। আর গাজায় ইজরায়েলি আগ্রাসন মানেই জঙ্গি-ইসলামের নাশ মানে মুসলিমদের সঙ্কট, দেওয়ালে পিঠ। মানে সঙ্ঘ-পরিবারের কাঙ্ক্ষিত, আদর্শ রাজনৈতিক পরিস্থিতি। হিন্দুত্ববাদ তাই জায়নবাদী রাজনীতিকে রোল মডেল করতে চায়। নেতানেয়াহু তাই ট্রাম্পের চেয়েও নরেন্দ্র মোদীর আরও স্বাভাবিক আদর্শগত বন্ধু। আর জোহরান এই ‘সবকটা রাজনীতি, মানে ট্রাম্প-বাদ, জায়নবাদ, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের বিরুদ্ধতা, প্রতিবাদ ও মোকাবিলা করতে চান তাই তিনি সঙ্ঘের পারিবারিক বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক শত্রু।
যে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রতন্ত্র নির্মাণের জন্য জোহরান ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ত বলে থাকেন, সেই একই মাপকাঠিতেই মোদীর শাসন পদ্ধতিও তাঁর কাছে ফ্যাসিবাদ বলেই মনে হয়। আর সেটা ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করার অনেক আগে থেকেই। ২০২৩ সালে সেই ফ্যাসিবাদী শাসক মোদীর আমেরিকা সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মামদানি প্রকাশ্য জমায়েতে, বিনা বিচারে বন্দি উমর খালিদের জেলখানার ডায়েরি থেকে কিছু অংশ পাঠ করেছিলেন।
এখানেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান আর পক্ষপাতটা স্পষ্ট হয়ে যায়। জোহরানও ভারতে থাকলে তাঁকে নিঃসন্দেহে ‘শহুরে নকশাল’ বলা হবে, গোদি-মিডিয়া তাঁর পাকিস্তান যোগ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যেত। কিন্তু তিনি নিউইয়র্কের মতো একটা অভিবাসী শহর, যেখানে প্রচুর সংখ্যায় ভারতীয়দের বাস, সেখানকার মেয়র পদপ্রার্থী হয়ে যাওয়ায় সেখানে কাজল হিন্দুস্তানিকে পাঠানো হলো। তিনি জোহরানকে জম্বি, রাক্ষস ইত্যাদি বলে এলেন। আসলে ছবিটা অনেক বড়। সম্প্রতি মার্কিন মুলুক থেকেই একটা খবর এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে এই ভারতের ‘মহামানবদের’ ‘মহান’ সংগঠন আরএসএস—স্বদেশে যাদের কোনও রেজিস্ট্রেশন-ই নেই যারা নিজেদের কখনো সামাজিক, কখনো সাংস্কৃতিক সংস্থা বলে— কখনো আবার বলে আমরা কোনও সংগঠনই নই—আমরা বিওআই, ‘বডি অব ইন্ডিভিজুয়ালস্‌— মানে কিছু ব্যক্তি মানুষের খেয়াল খুশির আড্ডাখানা গোছের— তারাই আমেরিকায় এক কাণ্ড করেছে। আরএসএস’র হয়ে নিজেদের ভাবমূর্তির ঝাড়াই-বাছাই শোধনের জন্য একটা পেশাদারি সংস্থাকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাসের জন্য ৩ লক্ষ ৩০ হাজার ডলার ‘ফি’ দিয়েছে।
ভাবুন একবার। যে স্বয়ংসেবকদের সব খরচাপাতি নাকি অনামা-অজানা সব ব্যক্তি-মানুষদের ‘গুরুদক্ষিণা’র অনুদানে চলে, আর সে দানের ‘পবিত্র’ ম্লেচ্ছ বিধর্মী ভূমিতে আরএসএস’র প্রভাব বাড়াতে এত টাকা বিনিয়োগ করে ফেলল! ওদিকে জোহরানের প্রাইমারি-তে জয়, আরএসএস’র স্ট্র্যাটেজিস্ট নিয়োগ, কাজল হিন্দুস্তানির নিউইয়র্ক-সফর, সময়গুলোও যেন বড্ড কাছাকাছি মিলে যাচ্ছে। তবে ঘটনা হলো, এত চেষ্টা করেও, জাতীয়তাবাদী হিন্দুস্তানিদের এত ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রচারের পরেও নিউইয়র্কের হিন্দুদের কিন্তু তেমন টলানো যায়নি। বরং কুইন্সে কাজলের সমাবেশের পালটা নিউইয়র্কের সজাগ-সচেতন হিন্দু নাগরিকরা ‘হিন্দুজ ফর ডেমোক্র্যাসি’ নামে একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন। আর এই প্রতিরোধ থেকেই উঠে আসে ‘হিন্দুজ ফর জোহরান’ গোষ্ঠী, যাঁরা মিথ্যের প্রাচীর ভেঙে, ঘৃণার পাঁক সরিয়ে, তাঁদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারের ঢেউ তুলেছিলেন। আসলে এখানেই জোহরানের সাফল্যের আসল চাবিকাঠি। তিনি তাঁর নিজের দক্ষিণ এশীয়, পূর্ব আফ্রিকান, মুসলিম অভিবাসী আত্ম পরিচয় বজায় রেখেই, ঐতিহ্যগতভাবে অভিবাসী শহর নিউইয়র্কের শ্রমজীবী স্বল্প ও মধ্যবিত্ত মানুষের একটা ঐক্য গড়ে তুলতে পেরেছেন। সেখানে খ্রিস্টান-ইহুদি-হিন্দু-মুসলিম-শিখ, সাদা-কালো-লাতিনো-হিস্পানী-ক্যারিবীয়, সেনেগালি ট্যাক্সিচালক, ইয়েমেনি দোকানদার, ত্রিনিদাদের রাঁধুনি, উজবেক নার্সকন্যা, সব্বাই নিজেদের রোজকার দিনগুজরানের সমস্যা আর তার সমাধানের দাবিগুলো নিয়েই জোহরানের পেছনে জোট বেঁধেছিলেন। শহরের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চরিত্রকে অটুট রেখে, পেটের ভাত-মাথার ছাদ-শিশু সুরক্ষা নিখরচার সুগম পরিবহণ হয়ে উঠেছিল রাজনীতির মূল ইস্যু। জাত-ধর্মের বিভাজন নয়, মানুষের বুনিয়াদি চাহিদার দাবির ঐক্য।
এই ঐক্যের জোটেই জোহরান, ট্রাম্পের ওভাল অফিসে তাঁর মুখের ওপর বলে দিতে পেরেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যাঁরা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন তাঁরাই এবার জোহরানের সমর্থন ভিত্তি। আর এখানেই তো মোদি-সাহু-যোগীদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে জোহরানের ফারাক। মোদীরা হিন্দু-মুসলিম বাটোয়ারা করে, কৃষদের মৃত্যু, শ্রমিক বিরোধী শ্রম-আইন, মূল্যবৃদ্ধির চাপে গ্রাম-শহরের নাভিশ্বাস-সবকিছু ধামাচাপা দেন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, সাংবিধানিক অধিকারের ওপর দিয়ে ফ্যাসিবাদী বুলডোজার চালায়। ধ্বজারোহনের সেই জুমলাবাজির বিরুদ্ধে প্রান্তিক-খেটে খাওয়া মানুষের রুজি-রুটির দাবিকে রাজনীতির মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতেই তো জনতার ঢল বাংলা বাঁচানোর মহাযাত্রায়। নিউইয়র্কের মিছিল যেন কোথাও এসে মিলে যাচ্ছে বাংলায় লাল পতাকার লং মার্চ।

Comments :0

Login to leave a comment