Khargram Assembly

মইদুলের প্রাণ ব্রাহ্মণীর পাড়ে জিন্দা ধ্রুব লক্ষ্যে

রাজ্য বাংলা বাঁচানোর ভোট

খড়গ্রামের বাগরাইনে সিপিআই(এম)’র প্রচার। আছেন প্রার্থী ধ্রুবজ্যোতি সাহা। ছবি: শ্যামল মজুমদার।

চন্দন দাস: খড়গ্রাম


বিজেপি’র প্রচারে গোরুর কথা নেই। বামফ্রন্টের দাবির তালিকায় তিন নম্বরে গোরু!
কেন? কিরণ বললেন, ‘‘কাছেই বাগরাইন। দেখে আসুন। বুঝতে পারবেন।’’ কিরণ শেখ যুবক। নগর মহাবিদ্যালয়ের কাছে তাঁর কাপড়ের দোকান। তাঁর হেঁয়ালির উত্তর দিলেন উজ্বল ঘোষ। নগর থেকে তিন-চার কিমি দূরে বাগরাইনের গ্রামে ‘ঘোষ’রা সংখ্যালগুরু। প্রতিটি বাড়িতে নানা মাপের খাটাল। খাটলের উপর অ্যাসবেস্টসের ছাদ। তার নিচে দড়ি বাঁধা নানা উচ্চতার গোরু। উজ্বল বললেন, ‘‘দুধের দাম ৫০ টাকা কেজি। এই দামে পোষায়? একটি দেশি গোরু বড়জোর ৭-৮কেজি দুধ দেয় দিনে। তার খাওয়ার খরচও বেড়েছে। লালন পালনে আরও খরচ আছে। কিন্তু গোরু চাষে যে কষ্ট, তা আর দেখে কে? ধ্রুবর বাহিনী দেখছি দুধের দামের কথা বলছে।’’ 
খড়গ্রামের বয়স্কদের কাছে ধ্রুবজ্যোতি সাহার পরিচয় ‘মানব সাহার ছেলে।’ ছোটরা বলে ‘ধ্রুব’ নয়তো ‘ধ্রুবদা’। ধ্রুবজ্যোতি সাহার কথায়, ‘‘বাবা বিধায়ক ছিলেন। এলাকায় সবার শ্রদ্ধার মানুষ ছিলেন। আমাকে সবাই ছোট থেকে বামপন্থী হিসাবেই চেনে। যাঁরা গোরু পোষেন তাঁদের সমস্যা কাছ থেকে দেখেছি। ফলে গোরুর দুধের দাম, পশু হাসপাতালের দাবিকে সামনের দিকে রাখতে চেয়েছি আমরা।’’
‘গোরু চাষি’দের রকম ফের আছে। একদল গোরু নিয়ে বিভিন্ন মাঠে মাঠে তিন চারদিন ধরে ঘুরে বেরান। একেকটি মাঠে তাঁবু খাটিয়ে থেকে যান। আর একদল শুধু বাড়িতেই গোরু পালন করেন। সেই গোরুর লালন পালন করা মানুষের বসবাসের এলাকায় পোস্টার সেঁটে গিয়েছে খড়গ্রামে পঞ্চাশ ভাগ মুসলিম আর বাকি পঞ্চাশ ভাগ হিন্দু। বিজেপি’র প্রচার চলছে হিন্দুদের ভোট লক্ষ্য রেখে। এখানে ‘গোরু’ তাদের অ্যাজেন্ডায় নেই। আছে সিপিআই(এম)-এর অ্যাজেন্ডায়।
আর তৃণমূলের? ঝিল্লীর তপন দাস হাত তুলে দেখালেন। বললেন, ‘‘দেখছেন? মানুষ কী ভাবে যাতায়াত করছে। নদী এখন শুকনো তাই হেঁটে যাচ্ছে। অন্য সময় নৌকায় যেতে হয়। ছেলেমেয়েরা নৌকায় স্কুলে যায়। বাড়ির মেয়ে বৌদের সন্তান হলে ওই নৌকাতে নিতে হয়। আশিস মার্জিত ১৫ বছর আগে এমএলএ হয়েছেন। প্রতিবার বলেন ব্রিজ হবে। আজও হয়নি। তাই এবার ভোট নেই।’’ ঝিল্লী খড়গ্রামের মধ্যে। তার লাগোয়া বীরভূমের রামপুরহাট। ঝিল্লীর হাজার তিরিশ বাসিন্দাকে খড়গ্রামে আসতে ‘শুকনো’ সময়ে নদীর উপর দিয়ে হেঁটে আসতে হয়। সিপিআই(এম)’র খড়গ্রামের দাবিপত্রে তাই প্রথম দাবি, ঝিল্লী পুরাডাঙা ব্রিজ। আরও দুটি সেতুর কথা তারপরই—বালিয়ার পুরন্দরপুর থেকে ধামালিপাড়া নদীর সেতু, ব্রাহ্মণী নদীর যাদবপুর জাফরপুর সেতু। 
আর আছে ‘পলু’র কথা। পলু থেকে গুটি, গুটি থেকে সুতো, সুতো থেকে ‘মুর্শিদাবাদ সিল্ক’। ইব্রাহিম সেখের দু’টি জার্সি গোরু আছে। একসময় সিল্ক তৈরিতে তাঁর হাতযশ ছিল। বললেন, ‘‘সেই দিন আর নেই। মাড়গ্রাম, ঝিল্লী, মহিষাতে রমরমা ছিল সুতো উৎপাদন। এখন দাম পায় না তাঁতি। অথচ বাজারে বিশাল দাম। আর সেই শাড়িতেও আগের মতো কোয়ালিটি নেই।’’ সিপিআই(এম) দাবি করেছে বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি সরকারে এলে, খড়গ্রামে বামপন্থীরা জিতলে ‘পলু’ থেকে সুতোর রূপান্তরের ঐতিহ্য তারা ফিরিয়ে আনবে।
খড়গ্রামের প্রধান সঙ্কট অবশ্য অন্য জায়গায়? আতাই গ্রামের রহিম সেখ বললেন, ‘‘আমার সঙ্গে আমার ইস্তিরি আছেন। দুই ছেলে বাইরে থাকে। চেন্নাইয়ে একজন, কেরালায় একজন। আমাদের এই গ্রামে এমন কোনও ঘর নেই যেখানে ঘরের কোনও না কোনও ছেলে বাইরে নেই। অনেক ঘরে কোনও জওয়ান ছেলেই নেই। শুধু আমাদের মতো বুড়োবুড়িরা আছে। আমরাই আমাদের পাহারা দিই। ও তো জানে সব।’’
এই ‘ও’ হলেন ধ্রুবজ্যোতি সাহা। কাজের দাবিতে কলকাতায় মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের হামলায় শহীদ হয়েছিলেন মইদুল মিদ্যা। কাজের দাবিতে মিছিল করার ‘অপরাধে’ খড়গ্রামের ধ্রুব কলকাতার জেলে দিন কাটিয়েছেন। নগর মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রর বাড়ি খড়গ্রামের বড় রাস্তার পাশে। সম্পন্ন পরিবার। দোতলা বাড়ি। বাবা তৃণমূলের কর্মী। বাড়ির দেওয়ালে বড় করে ঘাসফুল আঁকা। লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে যুবকের গলা থেকে ঝুলছে গামছা। তৃণমূলের সমর্থক যুবকও বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে বললেন, ‘‘কাজের অভাব খুবই এখানে। এই একটা জায়গায় তৃণমূল সরকার কিছু করতে পারেনি। কিন্তু ভাতার কারণে তৃণমূল বেরিয়ে যাবে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাঁচিয়ে দেবে দিদিকে।’’
খড়গ্রামে ধানই প্রধান চাষ। রেজাউল বললেন, ‘‘উয়ারা ভাতার কথা বলছে। পাড়ার মোড়ে সভা করে বলছে, উয়াদের সরকার গেলে ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এই যে ধান দেখছেন, দাম পাই না আমরা। ১২০০ টাকা কুইন্টাল। চাষ ছাড়তে পারি না। আবার দাম না পেলে কী যে দুঃখ হয়!’’ এই যন্ত্রণার ছাপও ইভিএম-এ থাকবে, মনে করছেন সিপিআই(এম) কর্মীরা। এবার আর হেঁয়ালি করলেন না কিরণ শেখ। খড়গ্রামের হৃদয় তাঁর গলায়, ‘‘কিছু পাইনি আমরা ১৫ বছরে। তার উপর থানা হয়েছে তৃণমূলের অফিসের মতো। কোনও প্রতিবাদ হলে কেস। অথচ এত চুরি করেছে তৃণমূল, মারামারী, ওদের নামে কোনও কেস নেয় না। এর বিহিত এবার করতেই হবে।’’
‘ধ্রুব’ তাঁদের ত্যেজের জ্যোতি।
 

 

Comments :0

Login to leave a comment