SIR West Bengal

শ’য়ে শ’য়ে মানুষ লাইন সিউড়িতে, চলছে হয়রানি, বাড়ছে ক্ষোভ

রাজ্য জেলা

একরাশ আতঙ্ক নিয়ে শ’য়ে শ’য়ে মানুষের লাইন – বৃহস্পতিবারের তপ্ত দুপুর এমনই বিপরীত চিত্রের সাক্ষী হয়েছে বীরভূমের জেলাশাসকের দপ্তরে। হাতে নথির গোছা নিয়ে সেই লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সুদূর কোটাসুরের প্রজাপাড়া থেকে আসা অশীতিপর বৃদ্ধা সাদেকা বিবি। সেই সময় বাজনা বাজিয়ে উল্লাস, সমর্থকদের উদ্যম নৃত্যকে সঙ্গী করে প্রথমে তৃণমূল ও ঘন্টাখানেক পরে বিজেপি প্রার্থীরা জেলাশাসকের দপ্তরে প্রবেশ করেন মনোনয়ন জমা দিতে। রাস্তায় দুই দলের সমর্থকরা একের অপরের দিকে ‘জয় শ্রীরাম’ আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মাধ্যমে মরিয়া হয়ে ওঠেন জোর কার বেশি তা প্রমানে। সেই সময়ই ভোররাতে উঠে ঘন্টা দুয়েকের পথ পেরিয়ে জেলাশাসকের দপ্তরে কয়েক ঘন্টার লাইনে ঘেমে নেয়ে একাকার বৃদ্ধা সাদেকা বিবি। স্রেফ নিজের নাম ভোটার তালিকায় তোলার তাগিদে। সাদেকা বিবি একা নন, হয়রানির লাইন ভরেছিল কয়েকশো মানুষের ভীড়ে। প্রতিদিনই হচ্ছে এমন লাইন। সিউড়িতে জেলাশাসকের দপ্তর থেকে বোলপুর, রামপুরহাটের মহকুমা শাসকের দপ্তর- দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত, বিষন্ন, বিধ্বস্ত হওয়ার চেহারায় ফারাক নেই কোনোই।
সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, ‘‘প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য সরকার এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।’’ সেলিম বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী নিজে প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি। মানুষজন নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। ওয়াকফ থেকে ওবিসি- এ বা এসআইআর প্রক্রিয়া চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে নাগপুরের নির্দেশের সামনে তৃণমূল আত্মসমর্পন করছে।’’
এদিন সেই তিন জায়গাতেই ফারাক ছিল না তৃণমূল-বিজেপি’র মনোনয়নের নামে আড়ম্বরে, উদ্দামতায়, বিপুল খরচে গাড়িঘোড়া, বেলুন, পতাকা, বাজনার আয়োজনে। তা দেখেছেন  ‘ভোটের উৎসবে’ অংশগ্রহন করতে পারা না পারার সন্ধিক্ষনে দাঁড়ানো অগুণিত মানুষ। সাদেকা বিবি থেকে সিউড়ির জবা মন্ডল তাঁদের অন্যতম। প্রথমজনের কাঁপা ঠোটে প্রশ্ন, ‘‘এবার ভিটেমাটি ছাড়তে হবে না তো ?’’ আর দ্বিতীয় জন হতবাক, ‘‘আমি তিরিশ বছর ধরে ভোট দিচ্ছি। আমার সাথে আমার যুবক ছেলে অচিন্ত্যর নামও বাদ হয়ে গেল!’’ 
ইট পেতে লাইন পড়ছে জেলাশাসকের দপ্তরের হওয়া ‘ডিলিটেড’ ভোটারদের ট্রাইবুন্যালে যাওয়ার কাউন্টারে। বৃহস্পতিবার সাত সকালেই সেখানে হাজির হয়েছিলেন বড়তুড়িগ্রাম অঞ্চলের বিশিয়া গ্রামের বহু মানুষ। গ্রামেরই অন্তত ৩৬ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বৃদ্ধ বাবা রহমত মোল্লাকে নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো খাসিবুর মোল্লা বলেছেন, ‘‘বাবার ২০০২ সালের তালিকায় নাম ছিল। বাবার নথি দিয়ে ম্যাপিং করেই মা, তিন বোনের নাম ভোটার তালিকায় উঠলেও আমার ও বাবার নামই বাদ পড়েছে।’’ বীরভূম জেলাতে ‘বিচারধীন’র সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ২ হাজার। রাজ্যের ষাট লক্ষাধিক ‘বিচারাধীন’ মানুষের মধ্যে চল্লিশ লক্ষের নিষ্পত্তি হয়েছে। নাম উঠেছে ছাব্বিশ লক্ষের। জেলাগত কোনো স্পষ্ট পরিসংখ্যান নেই তবে রাজ্যের নিরীখে বিচার করলে যা আভাস পাওয়া যায় তাতে জেলার উৎকন্ঠার প্রহর গোণা মানুষের সংখ্যাটা বিপুলই। প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘‘আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। উপরমহল থেকে যেমন নির্দেশ আসবে, সেই অনুযায়ীই পদক্ষেপ করা হবে।’’
ভোটের বাদ্য যখন বেজেছে, ভোট যুদ্ধে জয়লাভের জন্য সর্বস্ব উজার করে দিচ্ছেন প্রার্থীরা তখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রহমত থেকে জবা, সাদেকা থেকে অচিন্ত্য।

Comments :0

Login to leave a comment