Naida Bus Accident

গ্রেটার নয়ডায় বাসে আগুন, এফআইআরে চাঞ্চল্যকর তথ্য: পোড়া গন্ধের কথা বললেও যাত্রীদের অভিযোগ উড়িয়ে দেন চালক

জাতীয়

যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডায় ভয়াবহ বাস অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এফআইআরে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। আগুন লাগার কয়েক মিনিট আগে বাসের ভিতর থেকে পোড়া গন্ধ পাচ্ছিলেন যাত্রীরা। তারা বিষয়টি চালক ও কন্ডাক্টরকে জানালেও অভিযোগ, দু’জনেই তা গুরুত্ব দেননি। উল্টে বাসের ভিতরেই ধূমপান চালিয়ে যান তারা। এই ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও বহু যাত্রী।
এফআইআরে উল্লেখ করা হয়েছে, বাসের ভিতরে চালক ও কন্ডাক্টরের ধূমপান নিয়ে আগেই আপত্তি জানিয়েছিলেন কয়েকজন যাত্রী। অভিযোগ, তাদের আপত্তি শুনে চালক ও কন্ডাক্টর হাসাহাসি করেন এবং চুপ থাকতে বলেন।
এর কিছুক্ষণ পর বাসের ভিতরে পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রীরা চালককে বিষয়টি জানান। কিন্তু চালক ও কন্ডাক্টর তাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বাসের ভিতরে তারা প্রায়ই এমন গন্ধ পান। যাত্রীদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও চালক বাস থামিয়ে কোনও পরীক্ষা করেননি। বরং ধূমপান চালিয়ে যেতে থাকেন।
এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাসের সামনের দিকে আগুনের শিখা দেখা যায়। আতঙ্কে যাত্রীরা চিৎকার শুরু করেন। এফআইআর অনুযায়ী, সেই সময় চালক নাকি যাত্রীদের বলেন, “তোমরা মরলেও আমার কিছু যায় আসে না, আমি বাস থামাব না।”
দিল্লি থেকে উত্তরপ্রদেশের মহোবার দিকে যাচ্ছিল বিহারের নম্বরপ্লেটযুক্ত ওই পর্যটক বাসটি। বাসে ৩৫ জনেরও বেশি যাত্রী ছিলেন। আগুন দ্রুত গোটা বাসে ছড়িয়ে পড়ে। ঘন ধোঁয়ায় বেরিয়ে আসার পথও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং যাত্রীদের উদ্ধারে নামে। আগুনে বাসটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। সেই ঘটনার পর ইঞ্জিনের লুব্রিকেটিং অয়েলে আগুন ধরে যায় এবং দ্রুত তা গোটা বাসে ছড়িয়ে পড়ে বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান।
ঘটনার পর বাসের চালক ও কন্ডাক্টর আগুন থেকে বেঁচে যান। পুলিশ তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে ৬৪ বছরের এক মহিলা যাত্রী জানান, তিনি শাশুড়ির মৃত্যুর পর মহোবার দিকে যাচ্ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি বাসে ঘুমিয়ে ছিলেন।
তার কথায়, হঠাৎ কেউ চিৎকার করে সবাইকে দ্রুত বাস থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। মুহূর্তের মধ্যে বাস ধোঁয়ায় ভরে যায়। প্রাণ বাঁচাতে যাত্রীরা ছোটাছুটি শুরু করেন। পালানোর সময় অনেকে তার উপর দিয়ে উঠে যান। তার স্বামী বাসের ভিতর থেকে বেরোতেও পারেননি। তার পা ভেঙে গিয়েছে বলেও জানান ওই মহিলা।
আর এক যাত্রী জানান, ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন চারদিকে ব্যাপক ভিড়। কোনও জিনিসপত্র নেওয়ার সুযোগ পাননি। এমনকী জুতোও পরেননি। শুধু মোবাইল ফোনটি নিয়ে বাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। প্রচণ্ড ধাক্কাধাক্কির মধ্যে কেউ তাকে টেনে বাইরে বের করে আনেন।
ওই যাত্রীর দাবি, খুব কম সংখ্যক মানুষই বাস থেকে বেরোতে পেরেছিলেন। যারা ধাক্কাধাক্কি করে পথ করে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন, তারাই প্রাণে বেঁচেছেন। তার পিছনে থাকা বহু যাত্রী বেরোতে পারেননি বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
গ্রেটার নয়ডার এই মর্মান্তিক বাস অগ্নিকাণ্ডে শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মৃতদের পরিবারের জন্য ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তরফে সোশ্যাল মিডিয়ায় জানানো হয়, গ্রেটার নয়ডায় বাসে আগুন লাগার ঘটনায় প্রাণহানির খবর অত্যন্ত দুঃখজনক। মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। আহতদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনিক আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি মৃতদের পরিবার ও আহতদের জন্য একই ধরনের ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাসটির বিরুদ্ধে অতীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ৬০টিরও বেশি চালান বা জরিমানা ছিল। তার মধ্যে ২০টি এখনও বকেয়া রয়েছে।
গাড়ির তথ্য সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, BR32PA8647 নম্বরের ওই বাসটির বিরুদ্ধে করা বিভিন্ন চালানের মোট বকেয়া জরিমানার পরিমাণ ১.৭ লক্ষ টাকারও বেশি। এর মধ্যে সর্বশেষ ১৮,৫০০ টাকার জরিমানাটি করা হয়েছিল ১৯ আগস্ট দিল্লির ময়ূর বিহারে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে।
ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর বাসটির রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চালক-কন্ডাক্টরের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment