অন্যকথা | বাঘ, বিদ্যাবুদ্ধি এবং বাঙালি : স্যার আশুতোষের ১৬২বছরের গর্জন
অয়ন মুখোপাধ্যায়
নতুনপাতা | বর্ষ ৪ | ২৯ জুন ২০২৬
আজ ২৯ জুন। বাঙালি ক্যালেন্ডারে আজকের দিনটার মহিমা একটু অন্যরকম হতে পারত, যদি না আমরা চিনেবাদাম চিবানো আর রকে বসে ‘সব শেষ হয়ে গেল’ মার্কা বিলাপ করার বাইরে একটু সিরিয়াসলি ইতিহাসচর্চা করতাম। আজ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ১৬২তম জন্মদিবস। ১৮৬৪ সালের এই সোমবারে, তখনকার ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার বৌবাজারের একটা ভাড়া বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়েছিল।
আশুতোষের বাবা গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার নামজাদা ডাক্তার, ওনার আসল বাড়ি ছিল হুগলির জিরাটে। কিন্তু কর্মসূত্রে কলকাতার বাসিন্দা। সেই গঙ্গাপ্রসাদ আর জগত্তারিণী দেবীর ঘরে যে সন্তান আশুতোষ, একদিন শুধু জজ বা উপাচার্য হলেন না, বরং একদিন হয়ে উঠলেন ‘বাংলার বাঘ’। এই যে ‘বাঘ’ উপাধিটা, এটা শুনলেই আজকাল আমাদের মনে কীরকম একটা মেঠো রাজনৈতিক নেতাদের ছবি ভেসে ওঠে, যিনি হুঙ্কার দিয়ে প্রতিপক্ষকে ছাতু করার হুমকি দেন। কিন্তু আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নামক বাঘটি কিন্তু খাঁচায় বন্দি বা সার্কাসের চাবুক খাওয়া বাঘ ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিদ্যাবুদ্ধির অরণ্যের এমন এক স্বাধীন রয়্যাল বেঙ্গল, যাঁর সামনে ব্রিটিশ রাজদণ্ডর মাথা পর্যন্ত অবনত করতে বাধ্য হয়েছিল।
আসুন, একটু তলিয়ে দেখা যাক এই ‘বাঘত্ব’ জিনিসটা আসলে কী।
বাঙালি সাধারণত দুটো জিনিসে খুব ভয় পায়—এক, অঙ্কের খাতা, আর দুই, পুলিশের লাঠি। আশুতোষ বাবু এই দুটো জিনিসকেই স্রেফ জলভাত বানিয়ে ছেড়েছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে তুখড় গণিতজ্ঞ এবং কলকাতা হাইকোর্টের ডাকসাইটে বিচারপতি।
আমরা যারা সামান্য ত্রৈরাশিক বা জ্যামিতির উপপাদ্য দেখলেই গায়ে জ্বর আসে, তাদের জেনে রাখা ভালো যে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কেমব্রিজ বা অক্সফোর্ডের ডিগ্রি ছাড়াই, স্রেফ দেশি শিক্ষায় গণিতের এমন সব জটিল তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন যা আন্তর্জাতিক স্তরে সমাদৃত হয়েছিল। কিন্তু তিনি শুধু সংখ্যার গোলকধাঁধায় আটকে থাকেননি। আইনকে বানিয়েছেন অস্ত্র। জজের আসনে বসে তিনি যখন রায় দিতেন, তখন আইনের ধারাগুলো শুধু কথা বলত না, গর্জে উঠত।
আজকের দিনে যখন ‘মেরুদণ্ড’ নামক হাড়টি বাঙালির কঙ্কালতন্ত্র থেকে প্রায় বিলুপ্তপ্রায়, আইসিইউ-তে অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে, তখন আশুতোষের জীবনী পড়াটা একটা থেরাপির মতো। লর্ড কার্জন যখন শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন, তখন আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সোজা দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—‘না’। এই ‘না’ বলার জন্য যে পরিমাণ বুকের পাটা লাগে, তা আজকের কর্পোরেট দাসত্বের যুগে বসে কল্পনা করাও কঠিন। তিনি বুঝিয়ে দিয়ে ছিলেন, সরকারি অনুদান মানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বিক্রি করে দেওয়া নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো সরকারের বাপের সম্পত্তি নয়, ওটা বিদ্যার্জনের পবিত্র ভূমি।
আশুতোষের এই বাঘমার্কা লড়াইটা শুধু সাহেবদের রাজদণ্ডের বিরুদ্ধেই ছিল না, এ লড়াই ছিল নিজের সমাজের শিকড় গেড়ে বসা অন্ধত্ব আর গোঁড়ামির বিরুদ্ধেও। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আদর্শ ও সমাজসংস্কারের আন্দোলনকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন আশুতোষ। নিজের বিধবা মেয়ের দুঃখ ঘোচাতে, বিদ্যাসাগরের অনুপ্রেরণায় তিনি যখন মেয়ের পুনর্বিবাহের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তাঁর নিজের মাটি হুগলির জিরাট আর বলাগড়ের রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ সমাজ খড়্গহস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ের ব্রাহ্মণরা বিভিন্ন শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে একজোট হয়ে এই প্রগতিশীল পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং । কুসংস্কারের এমনই মহিমা যে, আশুতোষ যখন নিজের গ্রামের উন্নতির জন্য, মানুষের যাতায়াতের সুবিধার স্বার্থে সেখানে রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে চাইলেন, তাতেও সেইসব রক্ষণশীল ব্রাহ্মণরা বাধা দিতে ছাড়েননি। সেই অভিমানে তিনি আর তার পুরনো বাড়ি তে অভিমানে আর ফিরে যান নি এই ঘটনা থেকে তিন বুঝেছিলেন, বিদেশি শাসকের চেয়ে ঘরের ভেতরের এই অন্ধ কুসংস্কারের অন্ধকার অনেক বেশি বিপজ্জনক। কিন্তু তিনি তো দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন, কারণ বাঘ কখনো শেয়ালের হুক্কাহুয়ায় নিজের রাস্তা বদলায় না।
আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা ‘ভিসি’ পদটার কথা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একজন অতি-ভদ্র, সরকারের দিকে হাত জোড় করে থাকা, মেরুদণ্ডহীন কোনো ভদ্রলোকের অবয়ব। কিন্তু আশুতোষ যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেন, তিনি একটা নতুন যুগের সূচনা করলেন।তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্রেফ কেরানি তৈরির কারখানা থেকে তুলে এনে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত করলেন। সি. ভি. রমন, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো নক্ষত্রদের তিনি স্রেফ জহুরির জহরত চেনার মতো করে চিনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেনে এনেছিলেন। রমন মহাশয় তখন রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টের চাকরি করছেন, আশুতোষ তাঁকে বললেন, "চাকরি ছাড়ুন, ফিজিক্স পড়ান।" রমন বলেছিলেন, "মাইনে তো অর্ধেক হয়ে যাবে!" আশুতোষের সোজাসাপটা উত্তর ছিল, "টাকা আমি দেব না, সুযোগ আমি দেব।" এই দূরদর্শিতা আজ কোথায়? আজ তো উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে দলদাসের পরিচয়পত্রটা বেশি জরুরি।
আশুতোষ জানতেন, একটা জাতিকে যদি বিশ্বমঞ্চে দাঁড় করাতে হয়, তবে তার মাতৃভাষাকে অবহেলা করলে চলবে না। তাই কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় কে তিনিই প্রথম স্নাত কোত্তর স্তরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানোর ব্যবস্থা করেন। অথচ আমরা কেমন আত্মবিস্মৃত জাতি দেখুন—আজকের দিনে ইংরেজি মিডিয়ামের বাচ্চা যদি গড়গড় করে ভুল বাংলায় কথা বলে, তবে আমরা গর্বে বুক ফুলিয়ে পাড়ার মোড়ে গল্প করি।আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আজ বেঁচে থাকলে বোধহয় সেই সব অভিভাবক দের ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলতেন।
সেকালের একটা বিখ্যাত গল্প আছে। আশুতোষ তখন ট্রেনে যাচ্ছেন। এক গোরা সাহেব তাঁর জুতো জোড়া জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছিল। আশুতোষ বাবুও কম যান না, সাহেব যখন ঘুমিয়ে পড়ল, তিনি সাহেবের কোটটা তুলে জানলা দিয়ে ফেলে দিলেন। সাহেব জেগে উঠে যখন জিজ্ঞেস করল, "আমার কোট কোথায়?" আশুতোষ শান্ত গলায় বলেছিলেন, "তোমার কোট আমার জুতো জোড়া কে খুঁজতে গেছে।"
এই গল্পটা স্রেফ একটা চুটকি নয়। এটা একটা স্টেটমেন্ট। "তুমিও মানুষ, আমিও মানুষ। তুমি সাদা চামড়া বলে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ নও।" এই যে আত্মসম্মানবোধ, এটা বাঙালি আজ কোথায় যেন বন্ধক রেখে এসেছে। আমরা এখন সাহেবদের দেখলে তো বটেই, এমনকি দিল্লির বা বম্বের কোনো বড় বাবুকে দেখলেও গদগদ হয়ে ‘জি হুজুর’ করতে ভালোবাসি। আমাদের বাঘের জাত এখন স্রেফ ফেসবুকের দেওয়ালে গর্জন করে, বাস্তবে বিড়ালের মতো ম্যাও ম্যাও করে দুধের বাটি খোঁজে।
আজ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ১৬২তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে যদি আমরা শুধু তাঁর মূর্তিতে মালা দিই, ধূপকাঠি জ্বালাই আর ফেসবুকে একটা লম্বা চওড়া স্ট্যাটাস দিয়ে লাইক গুনি—তবে তাঁর প্রতি এর চেয়ে বড় অপমান আর কিছু হতে পারে না।আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কোনো মিউজিয়ামের শো-পিস নন। তিনি একটা দর্শন। তিনি শিখিয়েছিলেন শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হলো মেরুদণ্ড শক্ত করা, স্রেফ একটা চাকরি পাওয়া নয়।ক্ষমতার সামনে সত্যি কথা বলার সাহস রাখা।
নিজের ভাষা এবং সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়েও আন্তর্জাতিক স্তরে শ্রেষ্ঠ হওয়া সম্ভব।আজকের বাঙালি সমাজ বড্ড বেশি আপস কামী। আমরা সস্তায় বিক্রি হতে ভালোবাসি। আমরা বিদ্যার চেয়ে ডিগ্রিকে বেশি গুরুত্ব দিই, আর চরিত্রের চেয়ে চাতুরীকে বেশি কদর করি। এই ক্ষয়ে যাওয়া সময়ে দাঁড়িয়ে স্যার আশুতোষের ওই বিশাল গোঁফ আর জ্বলজ্বলে চোখের ছবিটার দিকে তাকালে কেমন যেন লজ্জা লাগে আমার। মনে হয়, ভদ্রলোক যেন ছবি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের জিজ্ঞেস করছেন—"তোদের মেরুদণ্ডটা ঠিক কোন বাজারে বিক্রি করলি রে?"আসুন, আজ অন্তত একটা দিনের জন্য হলেও সেই বাঘের স্মৃতিকে ছুঁয়ে একটু সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করি। খাঁচায় বন্দি টিয়াপাখির মতো বুলি না আউড়ে, অন্তত নিজের কাজে, নিজের শিক্ষায় একটু সততা ফিরিয়ে আনি। সেটাই হবে এই মহান বাঙালির প্রতি আসল শ্রদ্ধাঞ্জলি। নতুবা, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাবে, ২৯ জুন পেরিয়ে ৩০ জুন আসবে, আর আমরা আবার সেই তিমিরেই রয়ে যাব—যেখানে বাঘেরা বিলুপ্ত, আর চারদিকে শুধু শেয়ালের হুক্কাহুয়া।
Comments :0