অরিজিৎ মণ্ডল
লক্ষ্য যিনি তাঁর নামেই নয় রাস্তা। তবু বদলে গেল সেই রাস্তারই নাম।
লক্ষ্য ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। যে রাস্তার নাম বদলেছে সেটি সোহরাবর্দি অ্যাভেনিউ। কিন্তু রাস্তাটি হয়েছি, আরেক ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর স্মৃতিতে।
লক্ষ্য যে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী তা স্পষ্ট হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যেই। গত রবিবার সোহরাওয়ার্দি অ্যাভেনিউ থেকে গোপাল মুখার্জি রোড নাম বদলের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি পোস্ট করেন সোশাল মিডিয়ায়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘কলকাতা কর্পোরেশনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কয়েক দশক ধরে কলকাতা শহরের বিভিন্ন রাস্তার নাম এমন কিছু ব্যক্তির নামে ছিল যারা ক্ষমতাকে অস্ত্র মনে করে তার অপব্যবহার করেছে। গোপাল মুখার্জি সেই সময় এগিয়ে এসে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছেন।’
প্রশ্ন উঠেছে, মুখ্যমন্ত্রীই কি গুলিয়ে ফেললেন দুই সোহরাওয়ার্দির নাম? নাকি গুলিয়ে দিতে চাইলেন? প্রশ্ন উঠেছে সেই উদ্দেশ্য নিয়েই। হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা নিয়ে, যেখানে মুসলিম নাম মুছে দেওয়া হয় কোনও না কোনও ছুতোয়। বিকৃত করা হয় ইতিহাসের।
সোমবার এ সংক্রান্ত প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী ভুল মানতে চাননি। বরং বলেছেন, ‘বেশ করেছি। নাম নিশান রাখব না। আর যে ক’টা আছে, সব তুলব। নেতাজীর নামে হবে, প্যাটেলের নামে হবে, বিবেকানন্দের নামে হবে।‘
মুখ্যমন্ত্রী রবিবারই পোস্টে লেখেন, "এটি শুধুমাত্র নাম পরিবর্তন না ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা প্রাণকেন্দ্রে এমন এক ব্যক্তির নাম বহন করা হয়েছে যার ভূমিকা বিভাজন ও রক্তক্ষয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত।"
সিপিআই(এম) বলেছে, ‘এটি কেবল তথ্যগত ভুল নয়; এটি ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, এই অসত্য প্রচারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রী।‘
যার নামে আদতে ছিল রাস্তার নাম তিনি কে? স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন ১৯৩০ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত।
কলকাতা মিউনিসিপাল গেজেট অনুযায়ী ১৯৩২-৩৩ সাল নাগাদ রাস্তাটির নাম রাখা হয় সোহরাওয়ার্দি অ্যাভেনিউ।
একই কথা জানাচ্ছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশিস কুমার দাস। তিনি বলেছেন, ‘‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি এবং স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দি দু’জন আলাদা। হোসেন সোহরাওয়ার্দির কাকা ছিলেন স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দি। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক হানাহানির সঙ্গে স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দির কোনও যোগাযোগ নেই। স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ঘটনা ক্রমে তারপরেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি।’’
সরকারি ক্ষমতায় থাকলে, রাজ্যে বা কেন্দ্রে, জায়গা বা রাস্তার নাম বদল বিজেপি’র নিয়মমাফিক কার্যক্রম। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে,
ইসলাম ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের নামে যে রাস্তার নাম বা রেল স্টেশন নাম রয়েছে তা একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। গোটা দেশজুড়ে তার নমুনা বহু রয়েছে। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রচার করে হিন্দুরাষ্ট্রের পক্ষে জনমত সংগঠিত করাই তার লক্ষ্য।
Comments :0