অনীশ দত্ত
২০ জুন, ১৯৪৭ থেকে ২০ জুন, ২০২৬।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকেই বাংলার রূপকার বলে ‘পূজিত’ করা এক বড় বদল রাজ্যের রাজনীতিতে, কিন্তু তা আকস্মিক নয়।
উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ
ইতিহাসে শেখানো হয় যে কোনো ঘটনার সূত্র জানতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে জানা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আবার ইতিহাসের বিকৃতি করার কাজ অনেক সময়েই কোনও ব্যক্তির বর্ণনায় বিকৃতি করেই শুরু হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগের পর্বে পরিচিত ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র হিসেবে। স্যার আশুতোষের অঙ্কের শিরোপা থেকে আইনি কাঠামোর মধ্যে কাজ করা এবং শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ তম উপাচার্য হওয়ার পথ সম্পর্কে মোটামুটি সবাই অবগত। পুত্র শ্যামাপ্রসাদ ১৯২৪ সালে কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী থেকে ১৯৩৪ সালে সুহরাওয়ার্দির পর ৪ বছরের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হন। সে সময়ে, ছাত্রদের সামরিক ট্রেনিংয়ের জন্য ১৯৩৫ সালে তৈরি হয়েছিল ‘ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং কর্পস’ এবং ইতিহাসে আছে, এই ট্রেনিং কর্পসের অধীনে থাকা ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবসে একটি প্যারেডও করতে বলা হয়। সেই অনুষ্ঠানে ব্রিটিশরা ‘ইউনিয়ন জ্যাক’-কে অভিবাদন জানাতে বলে। বিদ্যাসাগর কলেজের এক ছাত্র যখন সেলাম করতে অস্বীকার করে, তখন তাঁর ওপর নেমে আসে আক্রমণ। তার প্রতিবাদে বিদ্যাসাগর কলেজের সব ছাত্র যখন ধর্মঘটের ঘোষণা করে, তখন ধরিত্রী গঙ্গোপাধ্যায় ও উমাপদ মজুমদার নামে কলেজের দুই পাঠরত পড়ুয়াকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ধর্মঘটে যোগ দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও ব্রিটিশরাজের প্রতি আনুগত্য না থাকাকেই শাস্তির কারণ দেখানো হয়।
‘ভারত ছাড়ো’-র পর্বেও ব্রিটিশ আনুগত্য
উগ্র হিন্দুত্ববাদের অন্যতম উদ্গাতা বিনায়ক দামোদর সাভারকারের প্রতি বিশেষ ভাবে আকর্ষিত হওয়া থেকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতি আনুগত্যের কারণে শ্যামাপ্রসাদ কংগ্রেসের সদস্যপদ ছেড়ে হিন্দু মহাসভায় ১৯৩৯ সালে যোগদান করেন। এক বছর পরেই বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তার আগে, ১৯৩৬ সালে একটি সমাবেশে মহম্মদ আলি জিন্নাহকে ‘আদর্শ ভারতীয়’ বলেছিলেন শ্যামাপ্রসাদই। আবার তিনিই ১৯৪০-এ ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লিগের সঙ্গে জোটে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকারের অর্থমন্ত্রী রূপে শপথও নিয়েছিলেন। সাভারকার তখন ‘কৌশলগত রাজনৈতিক বোঝাপড়া’ নীতি নিয়ে চলছিলেন।
আবার বিয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়েও ব্রিটিশের পক্ষে আনুগত্য দেখিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। বাংলার তৎকালীন গর্ভনর জন হারবার্টকে লেখা চিঠিতে সুপরিকল্পিত ভাবে ‘বাংলায় বিয়াল্লিশের আন্দোলনকে কী করে ভঙ্গুর করতে হবে’, সেই পরামর্শও দিয়েছেন। উল্লেখিত চিঠিতে এটিও বলা হয় যে তৎকালীন সিন্ধু প্রদেশের সরকারের মতো বাংলার হিন্দু মহাসভা-মুসলিম লিগ জোট সরকার যাতে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরুদ্ধে সব রকমের আইনি, প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হয়।
অর্থাৎ, আজকে বিজেপি’র যেভাবে ‘বাংলার জনক’ বলে শ্যামাপ্রসাদকে পেশ করছে তা আসল ইতিহাসকে অস্বীকার করছে। বরং, মিথ্যার আস্তরণে পেশ করা হচ্ছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েই।
মন্বন্তর এবং শ্যামাপ্রসাদ
আসা যাক ১৯৪৩-এর মন্বন্তরে। আশা করি পাঠকদের মনে থাকবে উইনস্টন চার্চিলের সেই ঐতিহাসিক উক্তি, যেটা তিনি ব্রিটেনের আইনসভা তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন খাদ্য সংকটের বিষয় বলেছিলেন, “খাদ্য সামরিক বাহিনীর জন্য মজুত করা দরকার। ভারতের মানুষ, তথা বাংলার মানুষের থেকে বেশি, সেনাবাহিনীর জন্য খাদ্য দরকার। এমনকি সেই সেনা তে আরোও বেশি লোক দরকার।...এমনিও ভারতীয়রা ইদুরের মতো পিল পিল করে জন্মায় আর পালে পালে মরে।“ *এই উক্তির বিরুদ্ধে সেরকম কোনো কাগজের অস্তিত্ব তো পাওয়া যায়নি, তবে হরিদাস পালের “চিত্তপ্রসাদের চোখে তেতাল্লিশের মন্বন্তরে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা” বইয়ে এমন অনেক তথ্য পাওয়া গেছে যেটা প্রমাণ করে যে বর্তমান বিজেপির মানুষের খাদ্য সংকট নিয়ে বিন্দুমাত্র গুরুত্বের চোখে না দেখে বিজ্ঞাপনী প্রচারের অঙ্গ রূপে দেখা আসলে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির কর্মকাণ্ড থেকে গৃহীত। চিত্তপ্রসাদ ১৯৪৪ এ অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা “পিপলস্ ওয়ার” এ, এক প্রতিবেদনে লিখছেন যে, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জেলা অর্থাৎ হুগলির বলাগড় অঞ্চলের ৬-৭ টি গ্রাম অতিক্রম করে যখন তিনি জিরাটে উপস্থিত হন, তখন সেই দুর্দশার চিহ্ন ও সমাজের সবচেয়ে বড় সামাজিক তফাৎ লক্ষ্য করা গেছে – একদিকে দুর্দশা, খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ মানুষ কে শুধু আম আর তার আটি খেয়ে বাঁচতে বাধ্য করে, ঠিক উল্টদিকেই দাঁড়িয়ে ছিল শ্যামাপ্রসাদের নয়া নির্মিত, বিলাসবহুল, প্রাসাদ প্রতিম বাড়ি। চিত্তপ্রসাদের কথায়, “এই বাড়ি আসলে সেই প্রত্যেক গরিবদের গালে সজোড়ে চপেটাঘাত ছিল। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “যে শ্যামাপ্রসাদ বেঙ্গল রিলিফ কমিটির নামে লাখ টাকা চাঁদা তুলেছিল বাংলাকে ‘দুর্ভিক্ষ’ থেকে বাঁচাতে, সে কি আদৌ নিজের গ্রামে একটা উনুন জ্বালানোর জন্য কোনো প্রকার চেস্টা করেছিল? উত্তর হবে -না! ..গ্রামবাসীদের জিজ্ঞেস করতে তাঁরা বলে যে ছাত্র ফেডারেশনের(এআইএসএফ) ছাত্ররা এসে প্রত্যেক পরিবার পিছু অনেক সব্জি, ৫ টাকা চাঁদা, ১২ মণ চাল আর পোশাক দিয়েছিল। মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ ও ইংরেজ প্রশাসন কিছু সাহায্য করেছিল। ইউনিয়ন বোর্ড প্রত্যেক পুরুষকে ১৪ আনা আর প্রত্যেক মহিলা ও শিশুদের মাথা পিছু ১০-১০ আনা দিয়েছিল। মূল কথা, সবাই যতটা পেরেছে, সাহায্য করেছে। কিন্তু গ্রামবাসীদের শ্যামাপ্রসাদ ও তাঁর রিলিফ কমিটির নাম করতে ওরা বলে যে তাঁরা এই নাম প্রথম শুনছে ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে এই গ্রামের জন্যে কিছু করেনি। এমনকি বলাগড়ে বন্যার সময় আশুতোষের পুত্ররা তাঁদের পুরোনো ভিটে বাড়ি কে ছেড়ে সেই নতুন প্রাসাদে আসে কারণ সেই পুরোনো বাসভবন আর বাসযোগ্য হয়ে উঠছিল না। আশুতোষের স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর পুরোনো বাড়িতে, তাঁদের সন্তানদের দ্বারা একটা অস্থায়ী ডাক্তারখানা তৈরি হয়েছিলো এবং প্রতি দিন ৩০-৪০ জন রুগীর চিকিৎসা হতো, এমনটাই নাকি দাবী করেছিলেন সেখানকার ডাক্তার। কিন্তু ১-২ দিন ধরে দেখা যায় যে শুধু ১০-১২ টা রুগী চিকিৎসা করাতে আসতো, অন্যদিকে শয়ে শয়ে মানুষ ম্যালেরিয়া তে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হতো।”
Comments :0