কিবু ভিকুনা
গ্রুপ পর্ব শেষ। রবিবার থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে নকআউট। গ্রুপ পর্যায়ে এখনও অবধি ৭২ ম্যাচ হয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসের মতো দলগুলি রাউন্ড অফ থার্টি টু-তে পৌঁছেছে। আফ্রিকার মহাদেশের সাতটি দল নকআউটে হেভিওয়েট প্রতিপক্ষদের টক্কর দেবে। তেমনই এশিয়া মহাদেশ থেকে রয়েছে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া।
লেখার শুরুর আগে প্রথমেই যেটা বলতে চাই, জাপানের খেলার ধরন ও কোচের রণকৌশল আমায় ভীষণ মুগ্ধ করেছে। গ্রুপ পর্বে একটা ম্যাচ জিতলেও, জাপানের খেলায় রয়েছে আধুনিকতা। বাকি দলগুলির তুলনায় অনেক অ্যাডভান্স ফুটবল খেলছে এশিয়ার জায়ান্ট কিলার দলটি। পজেশনাল ফুটবলের চেয়ে অনেক বেশি রিলেশনাল ফুটবল খেলছে তারা। দুই উইং-কে দারুণভাবে ব্যবহার করছে। বিপক্ষের ডিফেন্সিভ থার্ডে লোক বাড়িয়ে আক্রমণ শানাচ্ছে। আক্রমণ থেকে রক্ষণ, আবার রক্ষণ থেকে আক্রমণের যে ট্রানজিশন সেটাও খুব বিচক্ষণভাবে সামলাছে। সব মিলিয়ে তারা অত্যন্ত পরিপূর্ণ একটি দল। এই বিশ্বকাপের অন্যতম ডার্ক হর্স হিসেবে আমি জাপানকেই দেখছি। নকআউটে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলবে, অঘটন ঘটাতেই পারে জাপান।
শুধু পজেশনাল ফুটবল, বল দখলের ফুটবল বা ট্রানজিশন ফুটবল নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি দল কতটা পরিপূর্ণ। অর্থাৎ আক্রমণ কতটা ভালো করছে, রক্ষণ কতটা সংগঠিত, আর বল হারানোর পর কিংবা বল দখলে নেওয়ার পর কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে ট্রানজিশন করতে পারছে। সেদিক থেকে দেখলে আর্জেন্টিনা অনেক অ্যাডভান্স। তারা খুব কম গোলের সুযোগ প্রতিপক্ষকে দেয় এবং আক্রমণেও কার্যকর। সেটা পরিসংখ্যানেই বোঝা যাচ্ছে। গ্রুপ পর্বে আটটা গোল করেছে, গোল হজম করেছে মাত্র একটা। বিশেষ করে শেষ তৃতীয়াংশে তাদের গতির পরিবর্তন প্রতিপক্ষকে বিপাকে ফেলে দিচ্ছে।
স্পেনও দুর্দান্ত। সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথমার্ধে তারা পজেশনাল আক্রমণে অসাধারণ ফুটবল খেলেছে। একই সঙ্গে রক্ষণে ভারসাম্য বজায় রেখেছে এবং প্রতিপক্ষকে কার্যত কোনও সুযোগই দেয়নি। প্রথম ২৩ মিনিটে তিন গোলই তার প্রমাণ। বর্তমান সময়ে অনেক দলই বল হারানোর পর প্রথম পাঁচ-ছয় সেকেন্ডে অসাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখায়। সেদিক থেকে দেখলে নেদারল্যান্ডস, জাপান, স্পেন, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স এবং রবার্তো মার্টিনেজের পর্তুগাল ভীষণ উন্নতি করেছে।
আসল লড়াই শুরু হবে নকআউট পর্ব থেকে। গ্রুপ পর্বে ফেভারিট দলগুলোর অনেক ভালো পারফরম্যান্স দেখেছি। আর্জেন্টিনা, স্পেন, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস— সবাই নিজেদের শক্তির পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু নকআউট পর্বেই সেরা ম্যাচগুলো হবে। তবে গ্রুপ পর্বে কোন দল সবচেয়ে ভালো খেলেছে? সেটা বলা খুবই কঠিন। আমার কাছে এখনও ফেভারিট দলগুলিই ফেভারিট। বিশেষ করে ফ্রান্স, যেখানে কিলিয়ান এমবাপে আছেন। আর এই মুহূর্তে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আমি বায়ার্ন মিউনিখের উইঙ্গার মাইকেল ওলিসেকেও দেখছি।
নকআউট পর্বে প্রতিটি ছোট বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক ম্যাচই একটি মাত্র মুহূর্ত বা একটি ভুলের কারণে নির্ধারিত হবে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। যেমন ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে প্যারাগুয়ের অস্কার কার্দোসো পেনাল্টি মিস করেছিলেন, যা ইকার কাসিয়াস রক্ষা করেছিলেন। সেই একটি মুহূর্তই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
ব্রাজিল এখনও আমার কাছে প্রতিযোগিতার সেরা পাঁচ-ছয় দলের একটি। অন্যদিকে গ্যারেথ সাউথগেটের ইংল্যান্ডের তুলনায় টমাস টুচেলের ইংল্যান্ডকে অনেক বেশি পরিণত মনে হচ্ছে। হ্যারি কেন নিচে নেমে এলে গর্ডন কিংবা অন্য মিডফিল্ডাররা তার জায়গা পূরণ করছে। ফলে ইংল্যান্ডের খেলায় অনেক বাড়তি গতি এসেছে। আমার মতে, আগের বড় টুর্নামেন্টগুলির তুলনায় এই ইংল্যান্ড অনেক ভালো দল। ছাব্বিশের বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচেই লড়াই হচ্ছে। যেমন, ঘানার বিরুদ্ধে জমাট রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে কেনরা। গর্ডন, মাদুয়েকে, বেলিংহ্যাম, ডেকলান রাইস এবং আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের নিয়ে তাদের আক্রমণভাগ যথেষ্ট শক্তিশালী। বেঞ্চেও রয়েছে রাশফোর্ড, সাকা সহ একাধিক ফুটবলার।
স্পেনের বল দখলের ফুটবল তখনই কার্যকর হয় যখন শেষ তৃতীয়াংশে তারা দ্রুত, ধারালো এবং কার্যকর থাকে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে সেটা দেখা যায়নি, কিন্তু সৌদি আরবের বিপক্ষে তারা ঠিক সেটাই করেছে। ইউরো জয়ের সময়ও স্পেনের এই বৈশিষ্ট্যই ছিল তাদের বড় শক্তি।
জার্মানি কৌশলগতভাবে খুবই পরিপূর্ণ একটি দল। আক্রমণ ও রক্ষণ— দুই ক্ষেত্রেই তারা শক্তিশালী। দলের প্রত্যেক ফুটবলার প্রেসিং করছে। বল হারানোর পর সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিং বা গেগেনপ্রেসিং এখনও আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা কৌশল। জুলিয়ান নাগেলসমানের সবচেয়ে বড় গুণ হল, তিনি এক ম্যাচ থেকে আরেক ম্যাচে, এমনকি একই ম্যাচের মধ্যেও দলের কাঠামো বদলে দিতে পারেন। এই রণকৌশল সবসময় কার্যকর হবে, সেটা নয়। ইতিমধ্যেই প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, গ্রুপ পর্বের শেষ দু’টি ম্যাচে।
পর্তুগাল সম্পর্কে বলতে গেলে, রবার্তো মার্টিনেজ এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছেন যেখানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো নিজের সেরাটা দিতে পারছেন। যদিও রোনাল্ডোকে উজবেকিস্তান ম্যাচ ছাড়া সেরা ফর্মে পাওয়া যায়নি। ভিটিনিয়া, জোয়াও নেভেস এবং ব্রুনো ফার্নান্দেসকে নিয়ে তাদের মিডফিল্ড সম্ভবত স্পেনের মিডফিল্ডের পাশাপাশি বিশ্বকাপের সেরা। গ্রুপ পর্বে জ্বলে উঠতে না পারলে নকআউটে আশা করছি, ব্রুনোরা সেরা ফুটবল খেলবে। পর্তুগাল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত পরিপূর্ণ একটি দল। শক্তিশালী সেন্টার-ব্যাক, আক্রমণাত্মক ফুল-ব্যাক, অসাধারণ মিডফিল্ড এবং সামনে সিআরসেভেন, জোয়াও ফেলিক্স, বার্নার্দো সিলভা, রাফায়েল লিয়াও, পেদ্রো নেতো—সব মিলিয়ে তারা ভীষণ শক্তিশালী। যদি আমাকে ফাইনালের একটি দল বেছে নিতে বলা হয়, আমি পর্তুগালের নামই বলব।
আমার মতে এই বিশ্বকাপের প্রধান ফেভারিট হলো পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ড। জার্মানির বর্তমান দল আগের যুগের মতো প্রতিভায় সমৃদ্ধ নয়, তবে তাদের এখনও মানসম্পন্ন ফুটবলার রয়েছে। মুসিয়ালা, ভির্ৎজের মতো খেলোয়াড় আছে। সানে এখনও নিজের সামর্থ্যের পুরোটা দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে উনডাভ শেষ ম্যাচে বদলি নেমে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তাই জার্মানি ফেভারিট হলেও তাদের শীর্ষ চার-পাঁচ দলের মধ্যে রাখছি না।
নেদারল্যান্ডস এখন চার ডিফেন্ডার নিয়ে খেলছে। ডানদিকে ডামফ্রিস, বাঁদিকে ডি পেন, মাঝখানে ভ্যান ডাইক ও আকে। মাঝমাঠে ডি ইয়ং, আর সামনে আক্রমণে গাকপো সহ একাধিক ফুটবলার রয়েছে। তারা এই প্রতিযোগিতার অন্যতম ডার্ক হর্স। সুইডেনের বিপক্ষে তাদের ফুটবল ছিল অসাধারণ। ভ্যান ডাইক, ডি ইয়ং, গাকপো— এদের মতো ফুটবলাররা ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোতে খেলেন। কোচ রোনাল্ড কোমান একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী দল গড়ে তুলেছেন। তবে নেদারল্যান্ডসের একটি দুর্বলতা রয়েছে। সুইডেনের বিপক্ষে ৫-১ ব্যবধানে জিতলেও প্রতিপক্ষকে মাঝমাঠ থেকে একাধিক শট নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। প্রতিযোগিতায় অনেক দূর যেতে হলে এই দিকটি তাদের অবশ্যই ঠিক করতে হবে।
আর বেলজিয়ামের সেরা সময় ছিল ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের সময়। সোনালি প্রজন্মকে কাজে লাগাতে পারেনি। এখন তাদের দলে অভিজ্ঞ কিন্তু বয়স্ক খেলোয়াড় যেমন আছেন, তেমনি তরুণরাও আছে। তবে আগের মতো শক্তিশালী ও ধারাবাহিক বেলজিয়ামকে এবার দেখা যাচ্ছে না।
Comments :0