editorial

কে ভারতের নাগরিক?

সম্পাদকীয় বিভাগ

বর্তমানে ভারতের আনুমানিক জনসংখ্যা ১৪২ কোটি। আগামী বছর স্থগিত থাকা জনগণনার কাজ শেষ হলে জনসংখ্যা হয়তো ১৪৫ কোটিতে গিয়ে ঠেকবে। কিন্তু ১৪৫ কোটি ভারতীয়র মধ্যে একজনও হলফ করে বলতে পারবেন না যে তিনি ভারতের নাগরিক। কারণ যে কোনও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি বহনকারী কোনও কার্ড বা প্রমাণপত্র কোনও ভারতবাসীর কাছে নেই। সম্প্রতি বিদেশ দপ্তরের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। অর্থাৎ পাসপোর্ট থাকলেই কেউ নিজেকে ভারতের নাগরিক বলে দাবি করতে পারবেন না। পাসপোর্ট আছে এমন যে কোনও ভারতীয়কে যে কোনও সময় ভারতের নাগরিক নন বা বিদেশি বলে সন্দেহ করার সুযোগ থাকছে। সরকার বা শাসক চাইলেই যে কোনও সময় যে কোনও পাসপোর্টধারীর নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ করতে পারে বা প্রশ্ন তুলতে পারে।
ভারতে বসবাসকারী প্রায় সকল মানুষেরই আধার কার্ড আছে। আধার ছাড়া কোনও মানুষের পক্ষে একদিনও কাটানো কার্যত অসম্ভব। সরকারি-বেসরকারি যে কোনও পরিষেবা সুযোগ-সুবিধা পেতে, ভ্রমণ, হোটেল বুকিং ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে আধার অপরিহার্য। আধার পেতে বহু কাগজ ও নথিপত্র দেখাতে হয়। এই আধারও কিন্তু নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। অর্থাৎ আধার  আছে বলে নিজেকে ভারতের নাগরিক বলে দাবি করার অধিকার নেই।
নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের সময় অজস্র নথি প্রমাণ জমা দিয়ে তালিকায় নাম তোলা সম্ভব হলেও সেই সুবাদে ভারতের নাগরিক হিসাবে দাবি করার অধিকার জন্মাবে না। এছাড়া প্যান কার্ড, ব্যাঙ্কের পাশ বই, পোস্ট অফিসের পাশ বই, সরকারি-আধা সরকারি-অধিগৃহীত সংস্থার চাকরিজীবীদের পরিচয়পত্রও কোনোভাবে নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।
সবদিক যাচাই করে এখন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেতে পারে যে ১৪৫ কোটি ভারতীয়র মধ্যে একজনেরও হাতে এমন কোনও প্রমাণপত্র নেই যেটা দেখিয়ে তিনি দাবি করতে পারেন তিনি ভারতের নাগরিক। কে ভারতের নাগরিক আর কে নাগরিক নয় তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকার ও শাসক দলের মরজির উপর। যে কোনও ব্যক্তিকে তারা যে কোনও সময় নাগরিক বলে গণ্য করতে পারেন আবার নাও করতে পারেন। আজ যাকে নাগরিক বলছে কাল তার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন।
ফ্যাসিস্ত মানসিকতার আধিপত্যবাদী শাসকরা এমনই হয়ে থাকে। স্বৈরাচারী প্রবণতার এটা একটা অংশ। মানুষকে প্রতি মুহূর্তে ভয়ের মধ্যে অনিশ্চয়তার মধ্যে, দুশ্চিন্তার মধ্যে রেখে তাদের সরকারের প্রতি অনুগত করে রাখার এটা একটা কৌশল। গণতন্ত্রের কুৎসিত রূপ এটা। কোনও মানুষ বেনাগরিক হতে পারে না। কোনও না কোনও দেশের নাগরিক বিশ্বের সব মানুষ। সে যে দেশেরই নাগরিক হোন না কেন নাগরিকত্বের প্রমাণ তার হাতে থাকা উচিত। সেটা না দেওয়া আসলে তার নাগরিক অধিকারই কেড়ে নেওয়া। ভারতের নাগরিকদের স্বাধীনভাবে যে কোনও ধর্মাচরণ, যে কোনও ভাষায় কথা বলা, যে কোনও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহন করার পূর্ণ অধিকার আছে। তেমনি আছে বাক্‌ স্বাধীনতা, সমালোচনা, বিরোধিতা, নিজের মত ও বিশ্বাস প্রকাশ করার অধিকার। এখন মানুষকে যদি তার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দিহান বা প্রশ্নের মুখে রেখে দেওয়া হয় তাহলে সংবিধান প্রদত্ত সার্বভৌম নাগরিক অধিকার তিনি ভোগ করবেন কি করে?
ভারত রাষ্ট্রের সর্বাত্মক আধিপত্যকামী আরএসএস-বিজেপি চাইছে দেশের সকল মানুষকে তাদের অনুগত প্রজায় পরিণত করতে। কোনও রকম বিরোধিতা, প্রতিবাদের সুযোগ তারা দিতে চান না। তাই নাগরিকত্বকে খুড়োর কলে ঝুলিয়ে রেখে জনগণকে সরকার ও শাসক দলের পেছনে দাড় করিয়ে রেখেছে। একটু বেচাল হলেই নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে। নাগরিকত্ব নিয়ে অস্বচ্ছতা সরকারের একটা কৌশল যাকে শাসক দল রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে।

Comments :0

Login to leave a comment