Choice of food

‍নিরামিষ চাপানোর ছক

সম্পাদকীয় বিভাগ

ক্ষমতায় এসেছে এখনও দু’মাসও কাটেনি। এর মধ্যেই রাজ্যবাসীকে নিরামিষ খাদ্যে অভ্যস্ত করে তুলতে সুকৌশলে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে রাজ্যের আরএসএস-বিজেপি সরকার। প্রাথমিকভাবে স্কুল পড়ুয়া ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের উত্তর ভারত তথা গোবলয়ের খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ছোটবেলাতেই যদি তারা নিরামিষে অভ্যস্ত হয় তাহলে বড় হলেও সেই অভ্যাস থেকে যাবে। তার প্রভাব পড়বে আরও বৃহত্তর জনসমষ্টিতে। এমন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের মিড ডে মিলে ডিম ছাঁটাই করে বিকল্প হিসাবে সোয়াবিন বা রাজমা খাওয়া‍‌নোর ব্যবস্থা হচ্ছে। এরজন্য আপাতত কলকাতার স্কুলগুলিতে মিড ডে মিলের খাবার বণ্টনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে হিন্দু ধর্মীয় সংস্থা ইস্কনকে। অর্থাৎ ছাত্র-ছাত্রীদের নিরামিষ খাইয়েও সরকার থামছে না একই সঙ্গে হিন্দু ধর্মীয় সংস্থাকে যুক্ত করছে সরকারি ও সরকার পোষিত বিদ্যালয়গুলিকে। ইস্কন কোনও ক্যাটারিং সংস্থা হিসাবে এই দায়িত্ব পাচ্ছে না। এরা খাবার তৈরি ও পরিবেশন করবে তাদের নির্ধারিত ধর্মীয় আচার ও রীতি মেনে। প্রকারান্তরে হিন্দুদের ধর্মীয় রীতি ও আচার চাপিয়ে দেওয়া হবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর। তাতে অসন্তোষ বা বিতর্ক হলে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধিত হবে। অর্থাৎ মিড ডে মিল থেকে আমিষ খাদ্য ডিম বর্জন করে এবং ইস্কনের মাধ্যমে নিরামিষ খাদ্য বণ্টনের আয়োজন করে মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী সরকার এক ঢিলে দুই পাখি মারার ব্যবস্থা করেছে।
পর্দার সামনে মিড ডে মিলের কর্মীদের মজুরি যৎসামান্য বাড়িয়ে তাদের খুশি করার চেষ্টা হলেও পর্দার আড়ালে মিড ডে মিলের কর্মীদের কাজটাই লোপাট করার দীর্ঘমেয়াদি ছক কষে ফেলা হয়েছে। গোটা রাজ্যে যখন ইস্কনের মাধ্যমে খাদ্য বণ্টন হবে তখন স্কুলে স্কুলে আর খাবার রান্না হবে না। ইস্কনের বিভিন্ন কেন্দ্রে সেটা রান্না করে সরবরাহ হবে। ফলে মিড ডে মিলের কাজে আর স্থানীয়দের কাজ জুটবে না। ইস্কন তার জন্য তাদের প্রথা ও নিয়ম মেনে রান্নার ও সরবরাহের কর্মী নিয়োগ করবে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ভিন্ন ধর্মের কারও কাজ জুটবে না। তেমনি সেই সব লোকদেরই কাজ জুটবে যারা ধর্মীয় রীতি ও আচার কঠোরভাবে মেনে চলবে। অর্থাৎ ধর্মান্ধতার কোপে আমজনতার কাজ পাবার সুযোগ বরবাদ হয়ে যাবে।
ইস্কন কোনও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, ধর্মীয় সেবামূলক সংস্থা। ভক্তদের তারা অর্থের বিনিময়ে ভোগ বিতরণ করে। সেই ভোগই শেষ পর্যন্ত মিড ডে মিল রূপে স্কুলে স্কুলে পৌঁছাবে। বাণিজ্যিক সংস্থা না হবার কারণে ইস্কনের মুনাফা কামানোর প্রশ্ন নেই। তাই বরাদ্দ অর্থে অনেক ভালো ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া সম্ভব। বরাদ্দ যখন বেড়েছে তখন অনায়াসে পনির, দই, মিষ্টিও প্রত্যাশা করা যেতে পারে। এটা শুধু খাবার দেওয়া নয়, শিশুদের সেবা করা। সেবার ক্ষেত্রে লাভ-লোকসানের হিসাব চলে না। ভোগের নামে সস্তার খাবার গ্রহণযোগ্য নয়।
মন্ত্রী দীপক বর্মণ অবশ্য নিরামিষ খাবারে কোনও সমস্যা দেখছেন না। তাঁর যুক্তি বিশ্বে অনেক যখন নিরামিষ খায় তখন বাংলার মানুষের নিরামিষ খেতে অসুবিধা কোথায়। অন্ধ হিন্দুত্ববাদীদের যুক্তি এমনই হয়। বিশ্বের সিংহভাগ মানুষের মতো বাংলার মানুষও আমিষ খায়। তাহলে নিরামিষ ভোজীদের আমিষ খেতে সমস্যা কোথায়। বোঝাই যাচ্ছে সরকার সচেতন পরিকল্পনা করে বিদ্যালয়ে সংস্থার প্রভাব বাড়াতে চাইছে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের নিরামিষ খাদ্যে অভ্যস্ত করতে চাইছে। বাংলার গোবলীয়করণের লক্ষ্যে এটা প্রাথমিক পদক্ষেপ।

Comments :0

Login to leave a comment