কুৎসিততম দুর্নীতি
সমুদ্রের মতো বিস্তৃত দুর্নীতি। প্রাথমিক থেকে উচ্চ প্রাথমিক, এসএসসি— শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে এখনও পর্যন্ত দুই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। সিংহভাগই শাসক দলের নেতা,মন্ত্রী, বিধায়ক, তৃণমূলী এজেন্ট। যদিও গত চার বছরে এর সিংহভাগ জামিনও পেয়ে গেছেন। প্রাক্তন শিক্ষা মন্ত্রীর বান্ধবীর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছিল ৪৯ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। টেলিভিশনের পর্দায় ড্রয়িং রুম, বেডরুম থেকে কোটি কোটি নগদ টাকা উদ্ধারের এই দৃশ্য দেখেছে রাজ্যবাসী। সরকারি চাকরি বেচার টাকার বৈভবের এক কুৎসিত দৃশ্য এর আগে দেখেনি রাজ্যবাসী। নিয়োগ দুর্নীতিতে ধৃতের তালিকায় প্রাক্তন মন্ত্রী থেকে তিন তৃণমূল বিধায়ক, যুব তৃণমূলের নেতা থেকে জেলার তৃণমূল নেতাও রয়েছে। এমনকি গ্রেপ্তারির তালিকায় রয়েছে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ এক প্রোমোটার— যার বাড়ি থেকে শুধু ২০১২’র টেটের নথি, অ্যাডমিট কার্ডই নয়, মিলেছে রাজ্যের প্রায় ৬০টি পৌরসভায় বেআইনিভাবে টাকার বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার তালিকা, ওএমআর শিট, টাকার রেটের তালিকাও। পার্থ চ্যাটার্জি থেকে কুন্তল ঘোষ, মানিক ভট্টাচার্য থেকে তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা, শান্তনু ব্যানার্জি থেকে তাপস মণ্ডল, কালীঘাটের কাকু— গোটা বাংলা জুড়ে যেন শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছে একটি সংগঠিত, নিয়ন্ত্রিত দুর্নীতির কুৎসিততম চেহারা। গোটা দেশ দেখছে স্বাধীনতার পরে এই বাংলার বুকে সর্ববৃহৎ নিয়োগ দুর্নীতিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তালিকা জমা দিয়ে স্বীকার করতে হলো সরকারি মদতে, শাসক দলের কাঁচা টাকার নেশায় এসএসসি-তে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বেলাগাম দুর্নীতি হয়েছিল। হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর জীবন, স্বপ্নকে খুন করেছে একটা সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি— বলছে সুপ্রিম কোর্টই। সাধারণভাবে যোগ্য, উত্তীর্ণদের তালিকা বের হয় অবশিষ্ট দেশে। এই ভূখণ্ডে যদিও আলাদা-অযোগ্যদের তালিকা দিতে হয় এখন এই বাংলায়। এসএসসি এবং রাজ্য সরকারের এই দুর্নীতির দায় মাথায় নিতে হচ্ছে যোগ্য শিক্ষকদের।
হেলিকপ্টারের উন্নয়ন
‘আমাদের দল গরিব, বাকিদের মতো এত টাকা পয়সা নেই’ বারেবারে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলাও করে সংবাদমাধ্যমেও তা প্রচার হয়। তবে সেই ‘গরিবের দলের’ অডিট রিপোর্টের তথ্য বলছে অন্য কথা। আকাশে ওড়ার খরচও কোটি কোটি টাকা! এই নির্বাচনেও হেলিকপ্টারেই প্রচার চালাবেন মমতা-অভিষেক নেতারা। নির্বাচন কমিশনের কাছে দাখিল করা তৃণমূলের অডিট রিপোর্ট বলছে, ২০২২-২৩ আর্থিক বর্ষে শুধুমাত্র বিমান, হেলিকপ্টারে খরচ হয়েছে ৩৫ কোটি ৫৯ লক্ষ ৭৪ হাজার ২৭১ টাকা। তার আগের বছর (২০২১) আবার বিধানসভা ভোট ছিল। তখনও হেলিকপ্টারে করে মমতা ব্যানার্জি, অভিষেক ব্যানার্জিরা রাজ্য ঘুরেছিলেন। ২০২০-২১’ আর্থিক বছরের অডিট রিপোর্ট বলছে হেলিকপ্টারের পিছনে তৃণমূল খরচ করেছে ১৮ কোটি ৯৬ লক্ষ ৫৬ হাজার ৯৭৫ টাকা। প্রায় ১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে শাসক তৃণমূল কেবলমাত্র আকাশে উড়তেই ৫৪ কোটি টাকার বেশি খরচ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে হেলিকপ্টারে করে কলকাতা থেকে চন্দননগরে বা কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি প্রাইভেটে জেটে করে যাওয়ার নজির ছিল না।
মমতার দুর্নীতির অক্সিজেন
এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি থেকে প্রাইমারি টেট, কয়লা পাচার থেকে গোরু পাচার— কার্যত যেন একই মালায় গাঁথা। মানি রুটের গন্তব্য একই। ‘বেনিফিশিয়ারি’ও একই ঠিকানায়। এসএসসি দুর্নীতিতে যে একাধিক শিখণ্ডী সংস্থার মাধ্যমে টাকা পাচার হয়েছে সেই কোম্পানিগুলিতেই আবার ঢুকেছিল গোরু পাচারের টাকা। সেই কোম্পানির সঙ্গে যোগ মিলেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির স্নেহের ‘বীর’ অনুব্রত মণ্ডলের। গোরু পাচার কাণ্ডে মানি লন্ডারিংয়ের তদন্তে মুখ্যমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ এই তৃণমূল নেতা ও তাঁর পরিবারের সম্পত্তির পরিমাণ দেখে চোখ কপালে উঠবে আপনারও। অনুব্রত মণ্ডল ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের ১১ কোটি টাকার সম্পত্তি অ্যাটাচ করা হয়ছে। একই সঙ্গে ইডি ২৫টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও ফ্রিজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অনুব্রত মণ্ডলের কন্যা ধৃত সুকন্যা মণ্ডল ও প্রয়াত স্ত্রী ছবি মণ্ডলেরও সম্পত্তি। আরেক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই ১৭ কোটি টাকা ফ্রিজ করেছিলেন। যদিও ২০১৪ থেকে ১৯’ পর্যন্ত ছয় বছরে গোরু পাচারের বিপুল টাকার কারবারের একেবারে ক্ষুদ্রতম অংশ এই ২৮ কোটি টাকা। গোরু পাচারকারীদের জন্য ব্যাকডেটেড জাল রসিদ তৈরি করা থেকে শুরু করে ইলামবাজার থেকে মুর্শিদাবাদের ৮টি থানা এলাকা হয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে গোরু পাচারের রাস্তা মসৃণ করা শুধু নয় পাচারের কোটি কোটি টাকা বাড়ির কাজের লোকেদের অ্যাকাউন্ট খুলিয়েও সাদা করা হতো।
তৃণমূলের ডিয়ার লটারি
আড়ালে আবডালে তৃণমূলের লোকজনও যা ‘ভাইপো লটারি’ বলেই সম্বোধন করে। নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে সব থেকে বেশি টাকা রাজনৈতিক দলগুলিকে ঘুষ হিসাবে দেওয়া প্রথম ১০টি সংস্থার কাছ থেকে বিজেপি’র ঘরে ঢোকে ২১২৩ কোটি টাকা। তারপরেই তৃণমূল। নির্বাচনী বন্ডের সব থেকে বড় দশটি ক্রেতার কাছ মমতা ব্যানার্জির দলের তহবিলে ঢোকে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা! এ রাজ্যের ডিয়ার লটারির সব থেকে বড় পৃষ্ঠপোষক শাসক তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গ সহ তিন রাজ্যে রমরমা কারবার চালানো ডিয়ার লটারির ‘সোল ডিস্ট্রিবিউটার’ লটারির ‘কিংপিন’ হিসাবে পরিচিত স্যান্টিয়াগো মার্টিনের ‘ফিউচার গেমিং অ্যান্ড হোটেল সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক এই সংস্থার সব থেকে বেশি টাকা ঢুকেছে শাসক তৃণমূলের তহবিলে। আধিকারিকরা তদন্তে নেমে দেখেন শুধুমাত্র অনুব্রত মণ্ডল ডিয়ার লটারিতে ১ কোটি টাকা একবার জিতেছিলেন তা নয় তার আগেও মোট তিনবার তাঁর ও মেয়ে লটারিতে বাম্পার পুরস্কার জিতেছিলেন! শুধু অনুব্রত মণ্ডলের পরিবারে ২ কোটি ১১ লক্ষ টাকা বেমালুম ঢুকে গিয়েছিল! লটারি কেলেঙ্কারি আসলে এই কুৎসিত অর্থনীতির চেহারা। প্রকৃত বিজেতার কাছ থেকে নগদ টাকা দিয়ে বাম্পার লটারির টিকিট কিনে নেওয়া হয়। নগদ টাকা দিয়ে ঐ টিকিট কিনে লটারি সংস্থার কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে টাকা পেয়ে যান। ওদিকে কালো নগদ টাকা ততক্ষণে সাদা হয়ে গেছে বিজেতার কাছ থেকে টিকিট কিনে নেওয়ার পরে। আবার লটারি সংস্থায় নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে তহবিল ভরায় শাসকের।
রেশন দুর্নীতি
নয়ের দশকের শেষের দিকে গোটা দেশ তোলপাড় করে দেওয়া বিহারে পশু খাদ্য কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ছিল দীপেশ চন্দক, হীতেশন চন্দক। তাদেরই সংস্থা অঙ্কিত ইন্ডিয়া লিমিটেড। পশু খাদ্য কেলেঙ্কারির চার্জশিটেও ছিল এই সংস্থার নাম। মমতা ব্যানার্জির দল সরকারের আসার পরেই পশু খাদ্য কেলেঙ্কারিতে যুক্ত কালো তালিকাভুক্ত সেই সংস্থার চালকলই খাদ্য দপ্তরের তালিকাভুক্ত হয়! গত প্রায় এক দশক ধরে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ লোনা মাটির ভূখণ্ডে রেশন দুর্নীতির চক্র চলেছিল পশু খাদ্য কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত এই সংস্থার হাত ধরে। দীপেশ চন্দক, হীতেশ চন্দকদের হয়ে সেই কারবার নিয়ন্ত্রণ করতো জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক-বাকিবুর রহমান- শেখ শাহজাহানের বাহিনী। প্রশাসনের গোচরেই ভুয়ো কৃষকের তালিকা তৈরি করা হতো, আদৌ তাঁরা সহায়ক মূল্যে ধান বিক্রি করেননি অথচ কৃষি সমবায় সমিতির তালিকায় তাঁদের নামে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। রেশন কাণ্ডে ধৃত মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ঘনিষ্ঠ দালাল চক্রের মাধ্যেই গত এক দশক ধরে চলছে এই কারবার। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক খাদ্যমন্ত্রী থাকাকালীন খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরে শুধু নিয়মিত আনাগোনাই নয় রীতিমত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন বাকিবুর রহমানরা। রেশন দুর্নীতিতে শুধু মানি লন্ডারিংয়ের পরিমাণই ১০ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। গণবণ্টন ব্যবস্থায় এত বড় দুর্নীতি শুধু এ রাজ্য নয় গোটা দেশে নজিরবিহীন। তার মধ্যে দশ বছর ধরে খাদ্য দপ্তরে মন্ত্রী থাকা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ভাগের অংশ হাজার কোটি যা ইতিমধ্যে বিদেশি মুদ্রায় পরিবর্তন করে পাচার করা হয়েছে একাধিক ফরেক্স সংস্থার মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি বনগাঁর ধৃত তৃণমূল নেতা একাধিক এফএফএমসি কোম্পানি নামে বেনামে খুলেছিল গত কয়েকবছরে। তার মাধ্যমেই রেশন দুর্নীতি এই বিপুল পরিমাণ টাকা হাওলার মাধ্যমে ভিনদেশে পাচার হয়েছে
কয়লায় মাস পিছু ৩০ কোটি
এরাজ্যে কয়লা পাচার তদন্তে এখনও পর্যন্ত ৩২২ কোটি ৭১ লক্ষ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে এনফোর্সমেন্ট ইডি। এরাজ্যে পুলিশ প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের যৌথ আঁতাতে চলেছে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ কয়লা পাচারের চক্র। কয়লা পাচারের কিংপিন— অনুপ মাঝি ওরফে লালা। শুধুমাত্র লালার প্রায় হাজারের মতো ভুয়ো, শিখণ্ডী সংস্থা রয়েছে। রয়েছে হাওয়ালা কারবারের মাধ্যমে টাকা পাচারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। কলকাতা শহরের একাধিক ঠিকানায় রয়েছে তার সিংহভাগ সংস্থা। কোটি কোটি কালো টাকা ঘুরপথে এই ভুয়ো সংস্থার অ্যাকাউন্ট হয়ে অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে। পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল, রানিগঞ্জ, জামুরিয়ার বিস্তীর্ণ কোলিয়ারি সাম্রাজ্যে একচ্ছত্র দাপট ছিল কয়লা মাফিয়া অনুপ মাঝি ওরফে লালার। পুরুলিয়া, আসানসোল ও ঝাড়খণ্ডে লালার একাধিক অফিস ও ঠিকানায় ইতিমধ্যে দফায় দফায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। লালার অফিস থেকে মেলা নথি ও তার হিসাবরক্ষক নীরজ সিংহের বাড়ি থেকে পাওয়া ল্যাপটপে মিলেছে একাধিক নাম। সেই সূত্রে নাম আসে মলয় ঘটকেরও। যদিও আজ পর্যন্ত তাঁকে জেরা করা হয়নি। দুর্গাপুর থেকে আসানসোলের মাঝে হাইওয়ের ধারে একটি বেসরকারি হোটেল। সেখানেই বেশকিছুদিন আগে পর্যন্ত রীতিমত পুলিশি পাহারায় আসতো গাড়ির কনভয়। সেই গাড়িতেই তুলে দেওয়া হতো নগদ টাকা ভর্তি ব্যাগ। ফের সেই রাতেই পুলিশি পাহারায় ঐ গাড়ি ফেরত আসতো দক্ষিণ কলকাতায়, নির্দিষ্ট ঠিকানায়। শুধু রানিগঞ্জ, আসানসোল ও লাগোয়া বাঁকুড়ার অবৈধ খাদান থেকেই সেই নগদের পরিমাণ ২৭ থেকে ৩০ কোটি, প্রতি মাসে।
বিনয় মিশ্রকে চেনে কেবল ভাইপো!
কয়লা পাচার কাণ্ডে তদন্তকারী সংস্থার হাতে এসেছে চাঞ্চল্যকর নথি, তথ্য। জানা গেছে দক্ষিণ কলকাতার এক চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কয়লা কাণ্ডে ফেরার বিনয় মিশ্র এবং অভিষেক ব্যানার্জির সঙ্গে ২০১৭ থেকে ২০২০’র মধ্যে প্রায় দশ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। সেই বিদেশ ভ্রমণের খরচ জুগিয়েছেন কয়লা কাণ্ডে পলাতক ঐ বিনয় মিশ্রই। দুর্নীতির প্রসঙ্গে বিস্তর বাণী দিলেও অভিষেক ব্যানার্জি আজও এটুকু জানাতে পারেননি যে তিনি বিনয় মিশ্রকে চেনেন কী না? অভিষেক ব্যানার্জির হাত ধরেই যেমন নিয়োগ কাণ্ডে ধৃত কুন্তল ঘোষ, শান্তনু ব্যানার্জির মতো যুব তৃণমূল নেতাদের উত্থান তেমনি বিনয় মিশ্রেরও রাজনৈতিক উত্থান তাঁরই মদতে। ২০২০ সালে সেপ্টেম্বর মাসে ফেরার হয় এই বিনয় মিশ্র। সিবিআই, ভারত সরকারের চোখে ধুলো দিয়েই দেশ থাকায় পালায় বিনয় মিশ্র। প্রশান্ত মহাসাগরীয় একটি দ্বীপ রাষ্ট্র ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব নিয়ে ফেলেছেন এই কয়লা পাচার চক্রের অন্যতম পান্ডা, যুব তৃণমূলের নেতা বিনয় মিশ্র। গোরু ও কয়লা পাচারকাণ্ডে অভিযুক্ত এই ব্যক্তি ২০২০-তে ফেরার হওয়ার আগে পর্যন্ত কলকাতা পুলিশের নিরাপত্তা পর্যন্ত পেতেন। কোভিডের বছরে ২০২১’র মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ১০৯দিনে কয়লা পাচারের লালার ১৬৮কোটি টাকা দফায় দফায় পাচার হয়। অর্থাৎ প্রায় দৈনিক ১ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা!বিনয় মিশ্রের তত্ত্বাবধানেই এক প্রভাবশালীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়র বিদেশের অ্যাকাউন্টে টাকা পাচার হয়েছে, দাবি তদন্তকারী সংস্থার।
ছবি’র দুর্নীতি
এখন আর ছবি আঁকেন না মমতা ব্যানার্জি। কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর আঁকা সিংহভাগ ছবির ক্রেতা চিট ফান্ড ও শিখণ্ডী সংস্থা। সেই মমতা ব্যানার্জির আঁকা ছবি চিট ফান্ড তদন্তের ভরকেন্দ্রে ছিল একসময়। এখন যদিও সেই তদন্ত বাকি সব তদন্তের মতই বোঝাপড়ার খেলায় শীতঘুমে চলে গেছে। সারদা চিট ফান্ড সংস্থার কর্তা ১ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন! তাঁর আঁকা ছবিই বিক্রি করে তৃণমূলের তহবিলে ২০১২ ও ১৩ সালে ঢুকেছিল ৬ কোটি ৪৬ লক্ষের মতো! আরেক বড় চিট ফান্ড সংস্থা রোজভ্যালির কর্ণধার গৌতম কুণ্ডুও সাংবাদিকদের কাছেরই দাবি করেছিলেন, তিনিও বিপুল পরিমাণ টাকায় মুখ্যমন্ত্রীর আঁকা ছবি কিনেছিলেন। পার্থ চ্যাটার্জি থেকে ডেরেক ওব্রায়েন-মমতা ব্যানার্জি ছবি কাণ্ডে জেরার মুখে পড়েছিলেন। তাঁর ছবি কিনেছেন এমন একাধিক উদ্যোগপতি, প্রযোজকদের কাছ থেকে সেই ছবি বাজেয়াপ্তও করেছে সিবিআই। তৃণমূলের তরফে ২০১১-১২ সালের আয় ব্যয়ের হিসাবে দেখানো হয়েছিল ছবি বিক্রি করে তারা আয় করেছে ৩ কোটি ৯৩ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা। ২০১২-১৩ সালে আয় করেছে ২ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা। এই দুটি বছরই সর্বাধিক টাকায় মুখ্যমন্ত্রীর ছবি বিক্রি হয়েছিল। আয়করে দেওয়া তৃণমূলের হিসাব, সিবিআই’র কাছে দেওয়ার তৃণমূলের চার বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব বলছে, ২০১২ ও ১৩ সালে ছবি বিক্রি থেকে তৃণমূলের আয় হয়েছে ৬ কোটি ৪৬ লক্ষের মতো। আর এখানেই গোল বেঁধেছে। আয়কর দপ্তর ও ইডি’র দাবি, যা নথি মিলেছে তাতে দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের দেওয়া হিসাবের থেকে বেশি পরিমাণ টাকায় ভুয়ো সংস্থাগুলি ছবি কিনেছে।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে দেশ জুড়ে এনআরসি, এনপিআর বিরোধী প্রবল বিক্ষোভ, প্রতিবাদের সময়তেই মমতা ব্যানার্জির ছবি কাণ্ডের তদন্তে যুক্ত তদন্তকারী আধিকারিককে বদলি করা হয় সিবিআই’র তরফে এবং তা ঘটে কলকাতায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজভবনে মুখ্যমন্ত্রীর একান্ত বৈঠকের ৪৮ ঘণ্টা বাদে! নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী দেশজোড়া বিক্ষোভের মাঝে সিবিআই’র রদবদলের হাওয়ায় শীতঘুমে চলে যায় মমতা ব্যানার্জির ছবি কেলেঙ্কারির তদন্ত।
Comments :0