গত বছর ১৫ আগস্ট লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন দেশে জনসংখ্যার চরিত্র বা জনবিন্যাসের অস্বাভাবিক পরিবর্তন কেন হচ্ছে তা খুঁজে বার করার জন্য ডেমোগ্রাফিক মিশন শুরু হবে। অর্থাৎ এরজন্য সরকার উচ্চ ক্ষমতার কমিটি তৈরি হবে। সেই ঘোষণার ৯ মাস পর তেমন একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন। ইরানে যুদ্ধের ফলে পশ্চিম এশিয়ায় যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তার পরিণতিতে ভারত ভয়াবহ জ্বালানি সঙ্কটে নিমজ্জিত। প্রধানমন্ত্রী নিজেই একে করোনাকালের সঙ্গে তুলনা করে মানুষকে সংযমী হবার ও কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ দিয়েছেন। তেলের ব্যবহার কমাতে, বিদেশ সফর বন্ধ করতে, সোনা কিনতে, বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য না কিনতে বলেছেন। জ্বালানির মূল্য দেড়গুণ বেড়ে যাওয়ায় এবং দেশের বিদেশি মুদ্রার মজুত দ্রুত কমতে থাকায় ঘোর বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দু’দিন পর পর তেলের দাম বাড়তে থাকায় বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রতিটি জিনিসের দাম বাডতে শুরু করেছে। এই দুঃসময়ে জনসংখ্যার বিন্যাস নিয়ে কমিটি গড়তে সরকার হঠাৎ কেন ব্যস্ত হয়ে পড়ল বোঝা দুষ্কর। হতে পারে দেশের অর্থনীতির এবং মানুষের রুজি-রোজগারে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ অপেক্ষা কোথাও মুসলিম জনসংখ্যা বেড়ে গেছে কিনা সেটা খুঁজে দেখা অনেক বেশি জরুরি মনে হয়েছে মোদী-শাহদের কাছে।
দেশে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে এটা আর এস এস’র নতুন কোনও অ্যাজেন্ডা নয়। পাঁচ দশক ধরেই আরএসএস নেতারা বলে আসছে মুসলিমরা একাধিক বিয়ে করে এবং বহু সন্তানের জন্ম দেয়। তাই নাকি হু হু করে বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা। তাদের মুখে এমন আশঙ্কার কথা হামেশাই শোনা যায় যে এইভাবে চলতে থাকলে অচিরেই ভারতে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। এমন ভাষ্যকে সামনে রেখে মুসলিম বিরোধী জিগির তোলা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি অন্যতম অ্যাজেন্ডা। কোনও নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য সরকারি তথ্য পরিসংখ্যান নেই। কেবলমাত্র আরএসএস’র মনগড়া ভাষ্যকেই আশ্রয় করে অন্ধ বিশ্বাসী ভক্তরা মুসলিমবিরোধী রাজনীতির পালে হাওয়া তুলে যায় নিরন্তর। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে।
আরএসএস’এর এই অন্যতম অ্যাজেন্ডায় অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গটি তীব্র হয়েছে প্রধানত আসাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র প্রভাব বৃদ্ধির রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু অনুপ্রবেশ। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি’র প্রচারে সর্বাধিক মাত্রায় ছিল এটাই। তারা বোঝাতে চাইছে এরাজ্যে তীব্র গতিতে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে। তার মূলে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ। অথচ আজ পর্যন্ত কোনও তথ্য বিজেপি হাজির করতে পারেনি। চিলে কান নিয়ে গেছে বলে মানুষকে চিলের পেছনে দৌড় করাতে চাইছে। কিন্তু কানটা যথাস্থানে আছে কিনা দেখতে বলছে না। জনসংখ্যার বাড়া কমা বা বিন্যাস পরিবর্তন বোঝার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস জনগণনার রিপোর্ট। ২০১১ সালের পর দেশে জনগণনা হয়নি। ২০২১ সালে করোনার দোহাই দিয়ে জনগণনা বন্ধ রাখে মোদী সরকার। জনগণনা হলে পরিষ্কার হয়ে যেত বিজেপি’র মনগড়া ধারনায় কতটা দুধ আর কতটা জল।
ইতিমধ্যে সমস্ত সরকারি তথ্য বলছে দেশে হিন্দুদের থেকে মুসলিমদের জন্মহার দ্রুত কমছে। তাছাড়া প্রতি মুসলিম পুরুষকে চারটি বিয়ে করতে হলে মুসলিম জনসংখ্যায় প্রতি পাঁচজনে চারজন মহিলা হতে হবে। বাস্তবে মহিলার সংখ্যা পুরুষ থেকে কম। তাই প্রচারে অনুপ্রবেশ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বলা হচ্ছে দলে দলে বাংলাদেশ থেকে মানুষ এসে ভরে যাচ্ছে। বর্তমানে ভারতের মুসলিম জনসংখ্যা ও বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা মোটামুটি সমান। বাংলাদেশের সব মানুষ ভারতে চলে এলেও তা ৪০ কোটির বেশি হবে না। এতদসত্ত্বেও হিন্দু সংখ্যালঘু হয়ে যাবার আজগুবি গল্প অনর্গল শোনানো হচ্ছে। জনগণনার কাজ এবছর শুরু হয়েছে। ফল মিলবে আগামী বছর। তখনই পুরো ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তার আগে ঘটা করে কমিটি গড়ার কি কারণ থাকতে পারে স্পষ্ট নয়। তবে হিন্দুত্ববাদীদের অ্যাজেন্ডাকে জাগিয়ে রাখা একটা কারণ। তাছাড়া আসল সঙ্কট থেকে নজর ঘোরানোও একটা কারণ।
editorial
জনবিন্যাসের ভূত
×
Comments :0