চৈত্র-বৈশাখী চড়া রোদে যখন মাঠ ফেটে চৌচির হওয়ার কথা, তখন অকাল বর্ষণে কার্যত বিপর্যস্ত জলপাইগুড়ি জেলার তিস্তা পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো চাষ। গত কয়েকদিনের লাগাতার বৃষ্টিতে ময়নাগুড়ি ও ক্রান্তি ব্লকের কৃষকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। সেচের জলের বদলে আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে বিঘার পর বিঘা জমির ধান এখন জলের তলায়। চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার অন্নদাতা এখন সরকারি সাহায্যের আশায় দিন গুনছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বোরো চাষের সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি হলো পর্যাপ্ত রোদ এবং নিয়ন্ত্রিত সেচ। মাটি সামান্য শুষ্ক থাকলে ধানের শাঁস পুষ্ট হয়। কিন্তু চলতি মরসুমে আবহাওয়া সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটেছে। সেচের প্রয়োজন তো মেটেইনি, উল্টে অতিবৃষ্টিতে ধান গাছগুলো দীর্ঘক্ষণ জলে ডুবে থাকায় সেগুলির স্বাভাবিক পুষ্টি ও শক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মাঠে গিয়ে দেখা গেল, অনেক জায়গায় ধান গাছ দাঁড়িয়ে থাকলেও ধানের দানা ঠিকমতো পুষ্ট হয়নি। অধিকাংশ দানা ‘চিটে’ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মাঠে দাঁড়িয়ে নিজের ধান জমি দেখিয়ে ক্রান্তির ক্ষতিগ্রস্ত চাষি উত্তম মন্ডল আক্ষেপের সুরে বললেন, "বোরো ধানের জন্য যে চড়া রোদের দরকার ছিল, এবার তার দেখাই মেলেনি। উল্টে অতিরিক্ত বৃষ্টির জল জমে চাষের দফারফা হয়ে গেছে। ধান একদমই ভালো হয়নি। এবার বিঘা প্রতি কতটা ফলন মিলবে, তা নিয়ে আমরা ঘোর দুশ্চিন্তায় আছি।"
একই সুর ময়নাগুড়ির ধর্মপুর এলাকার আর এক প্রান্তিক কৃষক বিমল বর্মনের গলায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি জানালেন, "হাড়ভাঙা খাটুনি আর ধারদেনা করে জমিতে বোরো লাগিয়েছিলাম। আশা ছিল বৈশাখের রোদে ধান গোলায় তুলব। কিন্তু এখন মাঠের যে অবস্থা, তাতে উৎপাদন খরচ উঠবে কি না সন্দেহ। ধান আধাপাকা হয়ে আছে, কিন্তু জল না শুকোলে কাটব কী করে? আকাশের যা মুখভার, তাতে ধান পচে যাওয়ার ভয় পাচ্ছি।"
বর্তমানে বহু জমিতে ধান আধাপাকা অবস্থায় রয়েছে। এই সময়ে আকাশ পরিষ্কার না হলে এবং রোদ না উঠলে ধান কাটা বা শুকনোর কোনো উপায় থাকবে না। কৃষকদের আশঙ্কা, প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা বজায় থাকলে উৎপাদন খরচ তো উঠবেই না, বরং ঋণের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। এখনও অনেক জায়গায় জল জমে থাকায় ধান পচে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। আবহাওয়া দ্রুত না বদলালে তিস্তা পাড়ের এই কৃষকদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
Boro Cultivation
অকাল বর্ষণে বিপর্যস্ত বোরো চাষ, দুশ্চিন্তায় ময়নাগুড়ি-ক্রান্তির কৃষকরা
×
Comments :0