CPI-M Polit Bureau

পাঁচ রাজ্যের ফল বিশ্লেষণ পলিট ব্যুরো, শ্রম কোড বিরোধী লড়াইকে সমর্থন

জাতীয়

পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফলের বিশদ পর্যালোচনা করেছে সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো। তিনদিন বৈঠকের পর সোমবার বিবৃতিতে পলিট ব্যুরো দাবি জানিয়েছে দিল্লি সংলগ্ন এলাকায় বিক্ষোভ দেখানোয় জেলেবন্দি শতাধিক শ্রমিকের ওপর নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
জনগণের উদ্দেশ্যে খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পলিট ব্যুরো বলেছে, সতর্ক থাকতে হবে। এসন কথার আড়ালে জনতার ওপর নতুন বোঝা চাপানো হতে পারে। সেই প্রয়াসকে রুকে দেওয়ার জন্য তৈরি থাকতে হবে। এদিনও পলিট ব্যুরোর বিবৃতিতে শ্রম কোড চালু করার বিজ্ঞপ্তির বিরোধিতা করা হয়েছে। রাজ্যগুলিকে সংশোধনী পাশ করে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার দাবি জানানো হয়েছে। 
ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাস, এসআইআর, দিল্লি সংগ্ন অঞ্চলে প্রবল শ্রমিক অসন্তোষ প্রসঙ্গেও মত জানিয়েছে পলিট ব্যুরো। কিউবায় আমেরিকা শাসন বদলানোর হুমকি দিচ্ছে। কিউবার জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়েছে পলিট ব্যুরো। পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদী সরকারের মার্কিন অনুগামী বিদেশনীতির সমালোচনা করা হয়েছে। পলিট ব্যুরো বলেছে, ইরানে আমেরিকার আগ্রাসনের নিন্দা করেনি মোদী সরকার। কিউবার ওপর হুমকির বেলাতেও চুপ। 
পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, একটানা দশ বছর সরকার পরিচালনার পর কেরালায় বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) একটি গুরুতর ধাক্কা খেয়েছে। কেরালায় প্রথমবার বিজেপি তিনটি আসন জিততে সক্ষম হয়েছে, যা একটি গুরুতর বিপদের সৃষ্টি করেছে। সিপিআই(এম)-এর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও অপপ্রচার চালানো পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি কংগ্রেসের নরম মনোভাবের ফলে কেরালায় বিজেপির উত্থান হয়েছে।
উল্লেখ্য, যে তিনটি আসনে বিজেপি জয়ী হয়েছে তার প্রতিটিতে এলডিএফ দ্বিতীয় স্থানে ছিল। কংগ্রেস জোট রাজ্যে জয়ী হলেও এই আসনগুলিতে দুই নম্বরেও ছিল না।
পলিট ব্যুরো বলেছে, পরাজয় সত্ত্বেও এলডিএফ ৩৭.৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। তা জনগণের বিপুল অংশের সমর্থনকে প্রমাণ করে। সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো নির্বাচনের সময় কঠোর পরিশ্রম করা সমস্ত কর্মী ও সমর্থকদের এবং কেরালার জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। 
পলিট ব্যুরো বলেছে, কেরালায় সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বাম গণতান্ত্রিক শক্তি। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক কাঠামোকে রক্ষা করবে।  জনগণের সমস্যা তুলে ধরবে এবং তাদের জীবিকা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর যে কোনও আক্রমণ প্রতিহত করবে।
পলিট ব্যুরো বলেছে, কেরালায় এই ফলাফলের একটি প্রাথমিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে আগামী দিনগুলিতে একটি গভীর পর্যালোচনা করা হবে।  পার্টি সদস্যদের পাসাপাশি সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া হবে। দলকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সংশোধনও করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে এরাজ্যে বিজেপি জয়ী হয়েছে। একটি সাম্প্রদায়িক, বিভাজনমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ ঘৃণার প্রচার, বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) সহ কেন্দ্রীয় এজেন্সির অপব্যবহার এবং এসআইআর’র ভূমিকা তার পিছনে রয়েছে। বলা হয়েছে, দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সরকার-বিরোধী মনোভাব থেকেও বিজেপি লাভবান হয়েছে। 
বলা হয়েছে, পাশাপাশি আসামে আরও বেশি আসন নিয়ে বিজেপি’র ফের জয় হয়েছে। সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থান স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুদুচেরিতেও বিজেপি-এনআর কংগ্রেস জোট জয়ী হয়েছে। 
বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে বিজেপি ও তার মিত্ররা রাজ্যপালের কার্যালয় ব্যবহার করে তামিলনাড়ুর নির্বাচনী রায়কে বানচাল করার চেষ্টা করেছিল। তারা টিভিকে-র নেতা শ্রী সি. জোসেফ বিজয়ের নেতৃত্বে সরকার গঠন ঠেকানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। সিপিআই(এম), সিপিআই, ভিসিকে-কে নিয়ে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে রাজ্যপালের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। রাজ্যপাল বিজয়কে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের অনুমতি দিতে বাধ্য হন। 
সিপিআই(এম), সিপিআই এবং ভিসিকে-র সঙ্গে একযোগে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক নীতি রক্ষার জন্য টিভিকে-নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে। নবনির্বাচিত সরকারকে অভিনন্দন। আশা করা হচ্ছে যে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে ও সমস্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে।
ডিলিমিটেশন প্রসঙ্গে পলিট ব্যুরো বলেছে যে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রক্রিয়ার নামে দেশের নির্বাচনী মানচিত্র পরিবর্তনের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে । তারা মহিলাদের আসন সংরক্ষণ বিলকে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে বিজেপির এই পরিকল্পনাকে আটকে দেয়। কারণ এই সাংবিধানিক সংশোধনীর জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন ছিল। বিজেপি সমগ্র বিরোধী দলকে নারী-বিরোধী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। বিরোধী দলগুলো বিজেপির এই প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার বিপদ এখনও রয়ে গেছে। বিজেপি যাতে নির্বাচনে লাভবান হয় এই পুরো প্রক্রিয়াটি সেই ভাবেই প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর আরেকটি উদ্দেশ্য হলো সংসদে দক্ষিণের রাজ্যগুলি প্রতিনিধিত্ব কমানো, যেখানে বিজেপির উপস্থিতি দুর্বল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বিজেপি তার এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করছে।
পলিট ব্যুরো বলেছে, সিপিআই(এম) আগামী নির্বাচন থেকেই মহিলাদের আসন সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নের দাবি করছে। এর সঙ্গে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়াকে যুক্ত করার কোনও কারণই নেই।
এসআইআর প্রসঙ্গে পলিট ব্যুরো বলেছে, বিহার বিধানসভা নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়া শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এসআইআর। পশ্চিমবঙ্গে ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’ নামে একটি নতুন মাপকাঠি চালু করে কমিশন। যা ব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ২৭ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়। এমনকি এই ভোটাররা সব নথি দিয়ে আপিল করার পরও বাদ পড়েন। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কখনও কোনও  নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য ভোটার তালিকায় এমন কারচুপি করা হয়নি। এই পুরো প্রক্রিয়াটি নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রায় সমস্ত স্তরে নিজেদের ক্যাডারদের ব্যবহার করে আরএসএস-বিজেপি উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করছে। বাংলার নবনির্বাচিত বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করা আধিকারিককে নিয়োগ এরই প্রমাণ। পলিট ব্যুরো বলেছে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান অত্যন্ত চিন্তাজনক।
শ্রম আইন প্রসঙ্গে বলেছে, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকেই শ্রম আইন কার্যকর করতে চেয়েছিল, কিন্তু চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল। ফলাফল ঘোষণার মাত্র চার দিনের মধ্যেই তারা শ্রম আইন কার্যকর করেছে। রাজ্যগুলিতে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারগুলি শ্রম আইন বাস্তবায়নে আগ্রহী এবং রাজ্যের খসড়া নিয়ম প্রস্তুত করেছে। ন্যূনতম মজুরি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং কাজের সময় বাড়ানোর বিরুদ্ধে শ্রমিকদের গণবিক্ষোভকে উপেক্ষা করে অগ্রসর হওয়াটা বিজেপির শ্রমিক-বিরোধী চরিত্রকে উন্মোচিত করে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিপিআই(এম) রাজ্য সরকারগুলিকে ভারতের সংবিধানে দেওয়া ক্ষমতা অনুযায়ী সংশোধনী পাশ করুক। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। 
দিল্লি এবং সংলগ্ন এলাকায় চরম সরকারি নিপীড়নের শিকার শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে পলিট ব্যুরো। বলেছে যে শ্রম আইন সংক্রান্ত বিধিগুলির বাস্তবায়ন রোখার লড়াইয়ে পাশে থাকবে পার্টি।

Comments :0

Login to leave a comment