Assembly 2026 Daspur

নীতি বদলানোর লড়াইয়ে ভরসা লাল ঝাণ্ডাই

জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

নির্বাচনী প্রচারে সিপিআই(এম) প্রার্থী রণজিৎ পাল।

অরিজিৎ মণ্ডল: দাসপুর

‘‘নির্বাচনে টাকার রাজনীতি দাসপুরের রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করে দিচ্ছে। আমি সাতষট্টি সাল থেকে এই এলাকায় রাজনীতি করি। ছাত্র যুব সংগঠন করে মূল স্রোতের পার্টি সংগঠনে যুক্ত হয়েছি। বহু নির্বাচন করেছি একাধিকবার। প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টও হয়েছি। কিন্তু কোনোদিন টাকার খেলা হয়নি।’’ 
খানিক আক্ষেপের সুরেই একথা বলছিলেন দাশপুরের প্রাক্তন বিধায়ক সুনীল অধিকারী। দাসপুরের বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী রণজিৎ পালের প্রচার চলছিল দাসপুর দু'নম্বর ব্লকের কামালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে। প্রচার শেষে সিপিআই(এম)’র স্থানীয় এক কর্মীর বাড়ির দাওয়ায় চাটাই পেতে বিশ্রাম করেছিলেন তিনি। 
দাসপুর বিধানসভায় বড় সংখ্যায় রয়েছে স্বর্ণকার পরিবারের বসবাস। এই স্বর্ণকাররা প্রত্যেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন। এই রীতি চলে আসছে গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরেই। 
স্থানীয়েরা বলছেন, এই এলাকার অর্থনীতির অনেকটাই নির্ভর করে এই স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের ওপর। বাইরের রাজ্যে আয় থেকে স্বর্ণকাররা অনেকেই এলাকায় নতুন জমি কিনে বাড়ি করেছেন। 
এছাড়াও রয়েছে জরি শিল্পী, নির্মাণ শ্রমিক ও ফুল শিল্পীরা। এই অংশের ভোট টানতে উঠে পড়ে লেগেছে বিজেপি। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির মন্ত্রী এমনকি মুখ্যমন্ত্রীদেরও সেই কাজে ব্যবহার করছে বিজেপি। 
এই পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ বাস, ট্রেনের বন্দোবস্ত করেছে বিজেপি। জানা গিয়েছে, তাঁদের দেওয়া হচ্ছে টাকাও। 
কিন্তু প্রার্থী রণজিৎ পাল জানালেন যে পরিযায়ী শ্রমিকরা এই কৌশলে প্রভাবিত হচ্ছেন না। তিনি বলছেন, ‘‘বহু জায়গার পরিযায়ী শ্রমিকরা, যাঁরা এই এলাকার, যোগাযোগ করেছেন। তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন দল বেঁধে তাঁরা এসে সিপিআই(এম)-কেই ভোট দেবেন।
ঘটনা হলো, সারা বছর এই পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে সারা রাজ্যে আন্দোলন করেছে বামপন্থীরাই। তাঁরা বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়িয়েছে সিআইটিইউ। 
এই এলাকার সিপিআই(এম) নেতৃত্ব জানাচ্ছেন, উদারনীতির পর্বে তৈরি হয়েছে নব্য ধনী একটি অংশ। বিভিন্ন ভাবে তাঁদের হাতে আসছে ভলো অঙ্কের অর্থ। এই অংশটি তৃণমূল এবং বিজেপি’র শ্রেণিভিত্তিও তৈরি করছে গ্রাম বাংলায়।  
আবার দাসপুর বিধানসভা এলাকায় অনেক কৃষক খেতমজুরদের বসবাস। তাঁরা মূলত ধান চাষ করেন। এই কৃষকদেরও রয়েছে সংকট। একদিকে যেমন ধানের সঠিক দাম পান না তেমনি ধান কাটার লোক পাওয়ার সমস্যাও রয়েছে। সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থা ঘিরে ক্ষোভ সারা রাজ্যের মতো রয়েছে এখানেও। 
একশো দিনের কাজ নেই। তৃণমূল এই আইনি প্রকল্প ঘিরে বেলাগাম দুর্নীতি করেছে। আর বিজেপি সরকার দুর্নীতিগ্রস্তদের ধরার বদলে আইনই তুলে দিয়েছে। এই নিয়ে গোটা রাজ্যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল বামপন্থীরা। কৃষক খেতমজুর সংগঠনের ডাকে একাধিকবার বিডিও অফিস ঘেরাও হয়েছে। লাগাতার চলেছে আন্দোলন। 
সিপিআই(এম) প্রার্থী জানাচ্ছেন, ‘‘একশো দিনের কাজে ‘চারের ক‘ ফর্ম ফিলাপের সময় আমরা দেখেছি আমাদের জমায়েতে প্রায় অর্ধেকই মহিলারা এসেছেন। খেতমজুর সংগঠন সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে সেই লড়াই লড়ছে। আদালতের নির্দেশের পরও কাজ চালু করেনি। এই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা ইশ্‌তেহার তৈরি করেছি। আমরা বিকল্পটা বলছি মানুষের কাছে।’’  
এখানে বামপন্থীরা প্রচারে আনছেন, ১০০ দিনের কাজের কথা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির কথা। সেকথা বামপন্থীরাই বলছেন। 
রণজিৎ পাল বললেন, ‘‘রাজনীতির আসল হচ্ছে নীতি। নীতির জন্যই গরিব মানুষের পঞ্চায়েত, নীতির জন্যই ভূমি সংস্কার, নীতির জন্যই বারো ক্লাস পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, নীতির জন্যই গ্রামীণ হাসপাতালে পরিকাঠামো গড়ে তোলা, এই নীতির জন্যই বামফ্রন্ট সরকার কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল শ্রমিকের সঙ্গে থেকেছিল, শিক্ষার বিকাশ ঘটিয়েছিল। আর আজ সেই রাজনীতির নীতিকে তৃণমূলের দুর্নীতি ধ্বংস করেছে। এই রাজনীতির কথাই আমাদের বলছি।" 
প্রার্থী আরও বললেন,"মানুষ তার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝছেন এই নীতি বদলের কাজ বামপন্থীরাই পারবে।  সব পরিবারে একজনের স্থায়ী কাজ, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৭০০ টাকা, মহিলাদের সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষকের ফসলের রাজ্য দাম, রাস্তাঘাট, চাহিদা অনুযায়ী আবাস যোজনা, বার্ধক্য ভাতা বিধবা ভাতা সহ সমস্ত ভাতা চালু করার কাজ আমরা বলেছি।" 
শেষ দশ বছরে এই দাসপুর এলাকাতে আরএসএস তার প্রভাব বিস্তার করেছে। নামে বেনামে অনেক আরএসএস পরিচালিত স্কুল চলে। প্রাথমিকভাবে বাড়ির মহিলাদের টার্গেট করে তাদের মধ্যে বিদ্বেষের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে আরএসএস। তৃণমূলের একটা অংশ তাতে মদত দিচ্ছে। 
সিপিআই(এম)’র স্থানীয়এক নেতা জানাচ্ছেন, তৃণমূলের অনেক নেতা আরএসএস-এর প্রতি দুর্বল। ঘাটাল দাসপুর এলাকাতে কখনও রামনবমীর জন্য আলাদা কমিটির ব্যানার দেখা যায়নি। এছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে আরএসএস-এর প্রচার রয়েছে।
সিপিআই(এম)-কে বিকল্পের প্রচার চালাতে হচ্ছে বিদ্বেষের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েই।

Comments :0

Login to leave a comment