কেউ বন্দে মাতরম না গাইলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে না। মঙ্গলবার এ কথা বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এই সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির সময়ে ‘বিজো ইমানুয়েল’ রায়ের গুরুত্বের উপর জোর দেয়। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন যে, জাতীয় অনুভূতি বা আকাঙ্ক্ষার সাথে জড়িত প্রশ্নগুলির ফয়সালা করা এই আদালতের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র এটা ঠিক করতে পারে যে জাতীয় গান কোনটি হবে এবং তার কতগুলি অন্তরা গাওয়া উচিত, তবে অন্তরাত্মা বা ধর্মীয় অধিকারের ভিত্তিতে যে ব্যক্তি জাতীয় গান গাইবেন না, তাকে কোনও অপরাধমূলক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে না। এই নিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র সরকারের কাছে জবাব চেয়েছে। তবে কেন্দ্রকে কোনও আনুষ্ঠানিক নোটিস দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট।
কর্ণাটকী সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের আইনকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি বলেন, জাতীয় গানের ওপর শাস্তিমূলক বিধান প্রয়োগ করার পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরম’-এর সমস্ত ছটি অন্তরা গাওয়ার নির্দেশ বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অন্তরাত্মার স্বাধীনতা, সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলিকে সামনে নিয়ে আসে। পিটিশনে বিশেষভাবে সেই শর্তটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ ছটি অন্তরাই সরকারি সংস্করণ হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং যেখানে ‘বন্দে মাতরম’ ও জাতীয় সঙ্গীত—দুটিই গাওয়া বা বাজানো হবে, সেখানে জাতীয় সঙ্গীতের আগে জাতীয় গান গাইতে বা বাজাতে হবে।
টি এম কৃষ্ণর পিটিশনে সুপ্রিম কোর্টে মহম্মদ সঈদ নূরী বনাম ভারত সরকার মামলারও উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৬ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জানুয়ারি ২০২৬-এর নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে নূরীর দায়ের করা একটি পিটিশনে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করেছিল, কারণ সেই সময়ে ‘বন্দে মাতরম’ না গাওয়ার জন্য কোনও শাস্তিমূলক বিধান ছিল না। কৃষ্ণর পিটিশনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে, কারণ এখন সংশ্লিষ্ট ধারায় অপরাধমূলক শাস্তির সংস্থান যুক্ত করা হয়েছে। তাই পূর্ববর্তী পিটিশনের সময়কার আইনি পরিস্থিতি এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জের মধ্যে একটি বড় তফাত রয়েছে।
উল্লেখ্য, জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিল, ২০২৬ এর আওতায় ‘বন্দে মাতরম’-কে আইনি সুরক্ষা দেয়। সেটি রাজ্যসভায় পাস হয় ২৯ জুলাই এবং লোকসভায় পাশ হয় ৩০ জুলাই। এতে ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’-র সমান আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-এর অবমাননা বা গানে বাধা সৃষ্টি করা ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হবে। যার জন্য সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয়ই হতে পারে।
মঙ্গলবার শুনানির সময়ে সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ করে বিজো ইমানুয়েল বনাম কেরালা সরকারের মামলার রায়ের উপরে গুরুত্ব দেয়। ১৯৮৬ সালের এই মামলায় বলা হয়, তিন ছাত্র ধার্মিক কারণে ‘বন্দে মাতরম’ গায়নি কিন্তু এরজন্য তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্তা নেওয়া যায় না। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, শুধুমাত্র জাতীয় গান না গাওয়ার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
এদিন শুনানির সময়ে টি এম কৃষ্ণর হয়ে বরিষ্ঠ আইনজীবী এস মুরলীধর সওয়াল করেন। তিনি বলেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর শেষ চারটি স্তবকে হিন্দু দেবদেবীর বন্দনা রয়েছে। তাই সম্পূর্ণ গানটি বাধ্যতামূলক করা হলে তা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পরিপন্থী হবে। এই সময় কেন্দ্রের আইনজীবী সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, আইন প্রণয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ সাংবিধানিক পদ্ধতি মেনে হয়, কোনও নকশালের চিন্তাভাবনা বা দাবি মেনে নয়। সলিসিটর জেনারেলের এই শব্দ প্রয়োগে তীব্র ক্ষোভ ও আপত্তি জানিয়ে মন্তব্যটি প্রত্যাহারের দাবি জানান মুরলীধর। তিনি বলেন, স্বাধীনভাবে চিন্তা করা মানেই ‘নকশাল’ হওয়া নয়। তুষার মেহতা নিজের মন্তব্য প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন। দীর্ঘক্ষণ এই নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাক্বিতণ্ডা চলে। বেঞ্চ পরে জানায়, দুই জনের এই নিয়ে মন্তব্যগুলি নথিভুক্ত হবে না।
উল্লেখ্য, বিজেপি সরকার বন্দে মাতরমকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্ররোচনা তৈরি করতেই বেশি ব্যস্ত। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ যোগের থেকেও এই বিষয়ে এগিয়ে থাকতে চাইছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঠিক এক মাস আগে ২২ আগস্ট তিনি ভবানীপুরে এক অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে থাকতে হলে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে হবে। এরপরে তিনি ৩ সেপ্টেম্বর গোলপার্কে বিদ্যা ভারতীর অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বন্দে মাতরম’ না গাইলে স্কুল-মাদ্রাসায় সরকারি সাহায্য দেওয়া নেওয়া দুটোই বন্ধ হবে। এরপর তিনি বলেন, ‘বন্দে মাতরম’ গানের সময় অনেকেই উঠে দাঁড়াচ্ছেন কিন্তু ঠোঁট নাড়ছেন না। শুধু দাঁড়ালেই হবে না। ঠোঁটটাও নাড়াতে হবে। একটু সময় লাগবে। সেটাও করব আমরা। অর্থাৎ স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করে হলেও গাওয়ানো হবে বন্দে মাতরম। একইভাবে উত্তর প্রদেশের বিধানসভায় দাঁড়িয়ে আদিত্যনাথ বলেছিলেন, বন্দে মাতরমের বিরোধিতা করলে কান ধরে বের করে দেওয়া উচিত। তার আগে তিনিও স্কুল-মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলকভাবে বন্দে মাতরম গাইতে হবে বলে নিদান দিয়েছিলেন।
Vande Mataram Supreme Court
‘বন্দে মাতরম’ না গাওয়া শাস্তিমূলক অপরাধ হতে পারে না: সুপ্রিম কোর্ট
×
Comments :0