post editorial

যে লড়াই জিততেই হবে

সম্পাদকীয় বিভাগ

আভাস রায় চৌধুরি 
৪ মে সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফল প্রকাশের সময় দিল্লিতে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "ভারতের রাজনীতিতে আজ আরও একটি পরিবর্তন হয়েছে। আজ দেশে একটিও রাজ্য নেই, যেখানে কমিউনিস্ট পার্টির সরকার আছে। একটাও নেই।...এটা শুধু একটা ক্ষমতার বদল নয়, ভাবনার বদল। এটা দেখায় বিকশিত হতে থাকা ভারত কোন দিশায় আগে চলতে চায়।" এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিপুল গরিষ্ঠতায় জয়ী হয়েছে। কেরালায় পরপর দু’বার সরকার চালিয়ে উন্নয়নে সারা দেশে অনন্য নজির সৃষ্টি করেও বামপন্থীদের পরাজয় ঘটেছে। বিপজ্জনক কিন্তু শক্তিশালী বিদ্বেষ-বিভাজনের সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশে আসামে সরকারে বিজেপি’র প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।  দক্ষিণপন্থী রাজনীতির এই পরিবেশে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য আসলে আরএসএস/বিজেপি’র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রত্যাশার প্রতিফলন। ত্রিপুরায় বামপন্থীদের পরাস্ত করে প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী একই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। 
বিধানসভা নির্বাচনের তিন মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। স্বচ্ছ ভোটার তালিকা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নে কোনও বাধা বা বিতর্ক থাকা উচিত নয়। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ২৭ লক্ষ বৈধ ভোটারের ভোটদানের অধিকারের বাইরে রেখেই পশ্চিমবঙ্গের অষ্টাদশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। রাজ্যের গণতন্ত্রের জন্য তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্বাচক মণ্ডলীর ভাবনায় ক্রিয়াশীল বহুমাত্রিক ভয়ের অন্যতম উপাদান ছিল এসআইআর।
তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যকলাপের ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সামাজিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে রাজনৈতিক ও ভাবনার জগতে শক্তিশালী হয়েছে আরএসএস/বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি’র দ্বন্দ্ব গড়ে তুলেছে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন। সময় যত এগিয়েছে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বাইনারি তত তীব্র ও শক্তিশালী হয়েছে। উভয়েই বিভাজন থেকে পুষ্টি লাভ করেছে। উভয়েই এসআইআর প্রক্রিয়াকেও বিভাজন রাজনীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। এই পরিবেশেই এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার সঙ্গে তীব্র রাজ্য সরকার বিরোধী মানসিকতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পরিবর্তন অথবা প্রত্যাবর্তনের নতুন এক বাইনারি সৃষ্টি হয়। বাম বিকল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হলেও সরকার পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে বাইনারি রাজনীতিই নির্ণায়ক হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনকে দলদাসে পরিণত করে সর্বব্যাপী দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের উপর চরম আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল তৃণমূল। রাজ্যের মানুষ তার থেকে মুক্তি চেয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল অংশের মানুষের কাছে মূল বিষয় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস বর্জন। প্রবল সরকার বিরোধী মানসিকতা থেকে রাজ্যের সাধারণ মানুষ বিজেপি-কে বেছে নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম সরাসরি আরএসএস/বিজেপি’র সরকার গঠিত হয়েছে। এটি রাজ্যের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতিতে গুণগতভাবে সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবর্তন। 
প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস আরএসএস/বিজেপি ঘনিষ্ঠ। আরএসএস/বিজেপি’র বিভিন্ন শীর্ষ নেতৃত্ব কিংবা সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন সময়ের মন্তব্যে তা পরিষ্কার। চলতি তিন দশকের ভারতীয় রাজনীতিতে নজর দিলে দেখা যায় বিজেপি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলির অস্তিত্ব সময়ের ব্যবধানে বিজেপি’র দ্বারাই বিপন্ন হয়েছে। বিজেপি’র স্বপ্ন কংগ্রেস মুক্ত ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসকে গিলে নেওয়ার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচেষ্টার মধ্যে প্রকাশ্য অথবা অপ্রকাশ্য বন্ধন সৃষ্টি করেছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি গত পনেরো বছর ধরে দ্বিমাত্রিক পদ্ধতিতে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিন্দুত্বকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। আজ সেই রাজনৈতিক হিন্দুত্বই তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাস্ত করল এবং ক্ষুধার্ত অজগরের মতো গিলে ফেলতে চেষ্টা করবে।
আসলে রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থা ও কর্পোরেট হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য মতাদর্শগত এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে হয়। নচেৎ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অনিবার্য। প্রকৃত বামপন্থী এবং কমিউনিস্টরাই এই দ্বিমাত্রিক সংগ্রাম চালাতে পারে। তাই তো বামপন্থীদের নির্বাচনী পরাজয়ে রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থীরা উৎসাহিত। ওই সন্ধ্যায় দিল্লিতে আরএসএস প্রচারক স্পষ্টভাবেই নিজস্ব মতাদর্শের জয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী মতাদর্শের পরাজয়ের প্রতি দিক নির্দেশ করেছেন। আবার এই মন্তব্যেই প্রতিদ্বন্দ্বী মতবাদের প্রাসঙ্গিকতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে।
ফলাফল ঘোষণার দিন থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা জনরোষের সামনে পড়ছেন। ২০১১ সালে সরকার বদলের দিন থেকেই বামপন্থীরা আক্রান্ত, রক্তাক্ত ও শহীদ হয়েছে। আবার এবারেও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থী কর্মী ও অফিসগুলিও আক্রান্ত হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের কায়দায় বামপন্থী কর্মীদের মিথ্যা মামলায় জড়ানোর একটি-দুটি ঘটনাও ঘটছে। ফল ঘোষণার দিন যাদবপুরে এবং পরদিন মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে বিজেপি বাহিনী লেনিন মূর্তির অবমাননা করেছে এবং ভেঙেছে। কলকাতা সহ রাজ্যের বেশ কয়েকটি জায়গায় খেটেখাওয়া মানুষের পেশা ও সম্পত্তির উপর হামলা হয়েছে। বামপন্থীরা ও প্রতিবাদী মানুষ পথে নেমেছেন। অবিলম্বে এগুলি বন্ধ হওয়া দরকার। লেনিন মূর্তি ভাঙা কিংবা অবমাননা হলো প্রতীকী আস্ফালন। আসল লক্ষ্য বামপন্থা এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শ ও রাজনীতির প্রতি আক্রমণের নিশানা স্থির করা।
মানুষের জীবন-জীবিকার মৌলিক প্রসঙ্গ ঘিরে বামপন্থী এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির চলন। অর্থাৎ এই সংগ্রাম শ্রেণি কেন্দ্রিক। দলীয় গঠনতন্ত্রে যে কথাই উল্লেখ করুক না কেন, আরএসএস মতাদর্শে পরিচালিত বিজেপি রাজনৈতিক হিন্দুত্বের রাজনীতিকেই বহন করে চলেছে। দেশ ও বিভিন্ন রাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার দাবি পূরণে ব্যর্থতা সত্ত্বেও প্রধানত হিন্দুত্ব রাজনীতির অনুশীলন করেই এই মুহূর্তে বিজেপি সমগ্র দেশে প্রভূত নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছে। তাই রাজনৈতিক হিন্দুত্বের অনুশীলন থেকে সরে আসার কোনও সম্ভাবনা পশ্চিমবঙ্গেও সম্ভবত নেই। 
রাজনৈতিক হিন্দুত্ব ধারণার সঙ্গে হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস কিংবা হিন্দু ধর্ম পালনের কোনও সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি রাজনৈতিক মতবাদ যা ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের আবেগকে স্পর্শ করতে চায় এবং তাদের রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে চায়। ১০৩ বছর আগে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের নির্মাতা সাভারকার নিজেই তা স্পষ্ট করেছিলেন। বলা বাহুল্য এই রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন সন্ধানী শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণি রাজনীতির স্পষ্ট বিরোধী। শ্রেণি অবস্থান ও মতাদর্শের দিক থেকে বামপন্থা ও কমিউনিস্ট মতাদর্শ ভারতের রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থীদের প্রধান প্রতিপক্ষ। 
১৯৪৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আরএসএস’র দ্বিতীয় প্রধান গোলওয়ালকর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেলকে লিখিত চিঠিতে ক্রমবর্ধমান সাম্যবাদী ধারণার বিরুদ্ধে যৌথ সংগ্রামের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। (১৯৬৮: জাস্টিস ইন ট্রয়াল: এ কালেকশন অব দ্য হিস্টরিক লেটার্স বিটুইন শ্রী গুরুজী অ্যান্ড দ্য গভর্নমেন্ট, একটি আরএসএস প্রকাশনা ,ব্যাঙ্গালোর; উপাধ্যায়, প্রকাশ চন্দ্র: ১৯৯২)। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত বানচ্ অব থটস-এ গোলওয়ালকর মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষদের সঙ্গে অন্যতম শত্রু হিসাবে কমিউনিস্টদের চিহ্নিত করেন। ২০১৪ সালে বিশ্ব হিন্দু কংগ্রেসে উপস্থাপিত চিন্তন পেপারে হিন্দু সমাজের অন্যতম প্রধান শত্রু হিসাবে মার্কসবাদকে চিহ্নিত করা হয়। প্রায় সকল আরএসএস প্রধানই বিভিন্ন সময় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে কমিউনিস্ট মতাদর্শকে চিহ্নিত করেছেন। এই ধারা আজও অব্যাহত। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এই মনোভাবই প্রকাশিত হয়েছে।
আরএসএস প্রতিষ্ঠার প্রায় ছয় দশক আগে উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের আঁতুড়ঘর ছিল এই বাংলা। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ তিনটি দশকে ভারতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা শক্তিশালী হয়েছিল। ভারত সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ও প্রসারিত হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, বহুত্ববাদী 'ভারত ভাবনা'ই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান মতবাদ হিসাবে সামনে আসে। ফলে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ দুর্বল হয়। কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। সংগঠিত রাজনৈতিক হিন্দুত্বের একশ বছরের জার্নির পর তা এখন ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের সমাজ রাজনীতিতে অন্যতম নির্ণায়ক অবস্থায় পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠা লগ্নের শ্রেণি অবস্থানের পরিবর্তন করে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আরএসএস এখন দেশে-বিদেশি কর্পোরেট সংলগ্ন হয়েছে। তাই হিন্দুত্ব-কর্পোরেট শব্দবন্ধ এখন ভারতের সমাজ অর্থনীতি রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত। শ্রেণি স্বার্থ ও মতাদর্শের অবস্থান থেকেই আজ আরএসএস/বিজেপি বামপন্থীদের নির্বাচনী পরাজয়ে উৎসাহিত হয়েছে।
রাজ্য সরকারে বিজেপি থাকার পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে অচিরেই আরএসএস নিজস্ব ঢঙে ক্ষমতাকে ব্যবহার এবং আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে। আক্রমণের মাধ্যমে বিদ্বেষ-বিভাজনকেই দৃঢ় করতে চাইবে। এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আন্তরিক চেষ্টা চালাতে হবে, যাতে পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক মোড় না নিতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলার সমাজ রাজনীতিতে বামপন্থীদের রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থার মোকাবিলা করতে হবে। তবে বামপন্থী পরিসরের বৃদ্ধি আটকাতে অত্যন্ত তৎপর হবে রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থা। এমন কি বিজেপি বিরোধী পরিসরে তৃণমূল কংগ্রেসকে জিইয়ে রেখে বামপন্থীদের মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিসরকে যথাসম্ভব সীমাবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা হবেই। সব থেকে বড় বিপজ্জনক বিষয় হলো খেটেখাওয়া মানুষের উল্লেখযোগ্য অংশের চেতনার স্তরে এখন গৈরিকীকরণ বাসা বেঁধেছে। এই সুযোগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থীরা মতাদর্শ ও রাজনৈতিকভাবে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের আক্রমণ অব্যাহত রাখবে। ফলে শ্রেণি চেতনা ও পরিচয়ে ফেরাতে খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষের কাছেই যেতে হবে, বেঁধে বেঁধে থাকতে হবে।
প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, আশা ও আশঙ্কার দ্বন্দ্বের মধ্যেই বাংলার রাজনীতি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের মাথায় এসে হাজির হয়েছে। এতদিন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সুযোগকে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিন্দুত্ব এবং বিজেপি প্রসারিত হয়েছে, শক্তি সঞ্চয় করেছে। এখন পশ্চিমবঙ্গেও রাজনৈতিক হিন্দুত্ব সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কার্যত বাধাহীনভাবে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাবে। পনেরো বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতিতে  লুম্পেন্সি এবং বিদ্বেষ-বিভাজনের পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে। তা কি আগামী দিনেও ভিন্নমাত্রায় অব্যাহত থাকবে, নাকি বাংলার জনগণ প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী পরিবেশকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারবে ? রাজ্য সরকারে এসে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বিজেপি পালন করবে, নাকি গোটা দেশের মতই পশ্চিমবঙ্গও হিন্দুত্ব কর্পোরেটের অক্ষে যুক্ত হয়ে পড়বে ?
বামপন্থীরা বিধানসভা নির্বাচনে খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ইস্যুগুলিকে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছে। বাম বিকল্প ইশ্‌তেহার এবং প্রচার জনমানসে নজর কেড়েছে। সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তা আরএসএস/বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের বাইনারি অতিক্রম করতে পারেনি। নির্বাচনের প্রাক্কালেই আমাদের উপলব্ধি ছিল রাজ্যে এই লড়াই দীর্ঘস্থায়ী। রাজনৈতিক ও মতাদর্শগতভাবে সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে। এই লক্ষ্যেই বামপন্থীরা বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য এবং শ্রেণি ঐক্য গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছে। নির্বাচন পরবর্তীতে গুণগতভাবে অধিকতর নেতিবাচক পরিস্থিতিতে এই যথাসম্ভব সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক ও শ্রেণি ঐক্যকে আরও প্রসারিত ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
২৫ বৈশাখ রাজ্যে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। পনের বছর পর রাজ্য রাজনীতির এই পালাবদল কি নতুন সকাল, নাকি আরও গভীর রাত্রি ? ভবিষ্যৎ এ প্রশ্নের উত্তর দেবে। ১৯৪১, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব মানবতা মরণপণ সংগ্রামে রত। জীবন সায়াহ্নে রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করলেন, "...কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।"(সভ্যতার সংকট) ইতিহাসবোধ, মতাদর্শগত দৃঢ়তা এবং খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় রাজনৈতিক সামাজিক সম্পর্ক অটুট থাকলে সম্ভাব্য ঘন অন্ধকারেও আমরা সবাই রবীন্দ্রনাথের বলা এ কথাগুলো উপলব্ধি করতে পারবো, ঋজুভাবে উচ্চারণ করতে পারবো।

Comments :0

Login to leave a comment