মধুসূদন চ্যাটার্জি
"এই লালঝান্ডা আমাদের টাকা পয়সা, সম্পত্তি কিছুই দেয়নি। আমরা জানি এইভাবেই লালঝান্ডা চলে। কিন্তু যেটা দিয়েছে সেটা কম কিসের? এই ঝান্ডা আমাদের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে শিখিয়েছে। দেখিয়েছে কি করে শিরদাঁড়া সোজা করে চলতে হয়, সেভাবেই আমরা চলছি, মৃত্যুর পর শরীরে যেন লাল ঝান্ডাটাই থাকে, এর চেয়ে আর বড় পাওনা কি?’’ সত্তরোর্ধ সুরেন সর্দার একহাতে লালঝান্ডা অন্য হাতে শালপাতায় মোড়া দোক্তার কড়া চুটির ধোঁয়া মুখ থেকে বের করে সিপিআই(এম) প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রমের প্রচারের মিছিল থেকে এই কথাগুলো বললেন।
মাথার উপর ঝলসানো রোদ। মার্চের শেষ সপ্তাহে রোদের তীব্রতা বাড়ছে। আরও বাড়বে। প্রচারে আসা মানুষগুলো দর দর করে ঘামছেন। তাতে কি হল? কাঁধে তো গামছা আছে। সেই গামছায় মুখ মুছে রাস্তায় দাঁড়ানো, বাড়ির ওঠানে থাকা, পথ চলতি সমস্ত মানুষের সামনে গিয়ে হাত জোড় করে কোথাও হাত ধরে বলছেন, ‘‘ আমাদের রানিবাঁধের প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রম এসেছেন, এনাকে তো আপনারা চেনেন, জানেন, আবার তিনি এসেছেন আপনাদের কাছে’’ মানুষজনও সাইকেল থামিয়ে, দাঁড়িয়ে গিয়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রমের সঙ্গে কথা বলছেন। জানাচ্ছেন কেমন আছেন তাঁরা। সোমবার সকাল ৯টা থেকে শেষ বিকাল পর্যন্ত এইভাবেই প্রচার চলল বাংলার জঙ্গলমহল রানিবাঁধ বিধানসভা এলাকার হিড়বাঁধ ব্লকের মশিয়াড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের একাধিক গ্রামে। এদিন সকালে সীতারামপুর গ্রাম থেকে এই প্রচার শুরু হয়। একে একে মশিয়াড়া, ভেদুয়া, আসাডাঙ্গা, পাইঅড়া, বিগতোড়ম ধানকিডিহি, পোয়াবাঁধ, বামনি, তিলাকানালী, আমঝুড়ি সহ একাধিক গ্রামে রানিবাঁধ বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রম মানুষজনের কাছে পৌঁছালেন।
দেবলীনা হেমব্রম খালি রানিবাঁধের পরিচিত মুখ নন, সারা রাজ্যের খেটে খাওয়া গরীব মানুষের লড়াই আন্দোলনে থাকা লালঝান্ডার প্রথম সারির একজন নেতা তিনি। জঙ্গলমহল এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি সহ সমস্ত বামবিরোধী শক্তি ২০০১ সাল থেকে মাওবাদী খাতক বাহিনীকে মদত দিয়ে যেভাবে প্রতিদিন জঙ্গলমহল রানীবাঁধ, সারেঙ্গায় এলাকায় গরীব আদিবাসী, অআদিবাসী মানুষের রক্ত ঝরিয়ে গেছে। সেই তাজা রক্তের স্রোতের মাঝেও দাঁড়িয়ে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন অকুতোভয়ে। তাঁর প্রতি বিশ্বাস ভরসা আজকের নয়, প্রতিকুল অবস্থাতেই মানুষ দেবলীনা হেমব্রমের সাহস দেখেছেন। দেখেছেন বিধানসভার ভেতরে চিটফান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তৃণমূলবাহিনীর হামলায় আক্রান্ত হতে। একটা দিনের জন্য এসব নিয়ে তিনি ভাবেননি। এগিয়ে গেছেন। প্রতিটি দিনই তিনি মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাই রানীবাঁধ বিধানসভা এলাকায় তিনি মানুষের কাছে একান্ত আপনজন।
রানিবাঁধ, খাতড়া ও হিড়বাঁধ এই তিনটি ব্লক নিয়েই রানিবাঁধ বিধানসভা। এখানে রয়েছে গভীর জঙ্গল, ছোট, বড় মাঝারি পাহাড় ঘেরা গ্রাম। আদিবাসী জনগোষ্টীর সমস্ত সম্প্রদায় সাঁওতাল, মুন্ডা, শবর, কোড়া, ভূমিজ, মাহালী সমস্ত অংশের মানুষজনই আছেন। আছেন একটা বড় অংশ মাহাতো জনগোষ্টীও। লালঝান্ডা এই জঙ্গলমহলে কেন্দুপাতার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, তাঁদের কাজের নিশ্চয়তা থেকে শুরু করে জঙ্গলকে নিয়ে তাঁদের জীবিকার গ্যারিন্টির দাবীতে ৬০এর দশক থেকেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে হয়েছে কংসাবতী আন্দোলন, ছ্যাদাপাথর উলফার্ম খনি শ্রমিক আন্দোলন। লালঝান্ডার ডাকেই আদিবাসী অআদিবাসী সমস্ত মানুষই এক হয়ে লড়াই করেছেন। দিল্লীতে কৃষক আন্দোলনের সময় সারা দেশের মধ্যে প্রথম এই রানিবাঁধ বিধানসভা এলাকাতেই কৃষকদের নিয়ে দিল্লীর আন্দোলনের সমর্থনে ট্রাক্টর মিছিল হয়। কোভিডের সময় অসময়ের স্কুল হয় এই রানিবাঁধেই। পরে শবর জনগোষ্টীর বাড়িগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগের দাবীতে রানীবাঁধে একের পর এক বিক্ষোভ, মিছিল, ডেপুটেশন হয় এই এক দশক ধরে। আন্দোলনের মধ্যেই রানিবাঁধ আছে। আর সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে বরাবর থেকেছেন রানিবাঁধ বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রম।
সোমবার হিড়বাঁধের মশিয়াড়াতে তিনি জানান, জঙ্গলমহলের মানুষের রোজগারের বড় উৎস ছিল ল্যামপস। সেই ল্যামপস আজ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন তো কেন্দুপাতা সংগ্রহের সময়, ল্যামপসগুলোতে তালা ঝুলছে। বন্ধ বাবুই ঘাসের চাষ। এই হিড়বাঁধে তসর চাষ হত। সেটাও বন্ধ। গরীব মানুষের রোজগারের জায়গাগুলো কেন বন্ধ করে দেওয়া হল? তৃণমূল কে তো এর জবাব দিতে হবে। আর বিধানসভায় বিরোধী শক্তি হিসাবে একটা দিনের জন্যও কি বিজেপি জঙ্গলমহলের মানুষের দুর্দশার কথা বলেছে? না। এখানকার ছাত্রাবাসগুলি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কেন নিরব, বিজেপি, তৃণমূল? লালঝান্ডাই বারে বারে ব্লক, জেলাস্তরে ডেপুটেশন দিয়ে এগুলি খোলার দাবী জানিয়ে আসছে।
এদিন প্রচারের সময় বামনি গ্রামের ফকির বাউরি, তিলাকানালী গ্রামের খেতমজুর অশোক সর্দাররা জানান, রেগার কাজ নিয়ে কেন ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে ? এই হিড়বাঁধ ব্লক থেকেই ২০ হাজারের উপর যুবক আজ পরিযায়ি শ্রমিক হিসাবে বাইরে চলে গেছেন। ‘‘তাঁদের পরিবারের বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তানরা কি ভয়ানক মানসিক যন্ত্রনা নিয়ে দিন কাটান তা জানেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি তো বলছেন জঙ্গলমহল হাসছে। কোথায় হাসি দেখতে পাচ্ছেন তিনি’’ জানতে চায় দিকতোড় গ্রামের খেতমজুর রাজু বাউরিরা। এদিন বাম প্রার্থীকে এমন অনেকেই তাদের দুর্দশার কথা জানালেন। অধিকারের লড়াই শুরু করেছে লালঝান্ডাই, এই লড়াই জিততেই হবে। এটাই বাংলার জঙ্গলমহল রানীবাঁধ বিধানসভার প্রচারের নির্যাস।
Comments :0