নিলয়কুমার সাহা
নানা ভাষা নানা মত ... এই বহুমাত্রিকতাকে রাষ্ট্র আজ একমুখী অর্থাৎ এক ভাষা এক জাতি, ও এক দেশে– হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্থান— রূপান্তরিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির নীল নকশা অনুসারে স্বাধীন ভারতে ১৯৫৬ সালে গঠিত ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (UGC), ১৯৮৭ সালে গঠিত অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন (AICTE) এবং ১৯৯৫ সালে গঠিত ন্যাশনল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন (NCTA)নামক দেশের তিনটি পৃথক স্বশাসিত শিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থার একই সাথে অবলুপ্তি ঘটতে চলেছে। এই তিনটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার শূন্যস্থান পূরণে কেন্দ্রের শিক্ষা মন্ত্রক সম্প্রতি বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল ২০২৫ সংসদে উপস্থান করেছে। প্রস্তাবিত এই খসড়া বিল সংসদে গৃহীত হয়ে আইনে পরিণত হলে বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান নামক একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান একধারে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন,মানোন্নয়নের পাশাপাশি দেশের কারিগরি এবং ব্যবস্থাপনা শিক্ষাক্রমের সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সমন্বিত বিকাশ এবং মানোন্নয়নের কাজ সম্পন্ন করবে। দেশের শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার নিয়ম এবং মান নির্ধারণের দায়িত্বও পালন করবে প্রস্তাবিত স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দেশের আইন এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে এই বিলের আওতাভুক্ত করা হয়নি এবং আর্থিক অনুদানের বিষয়টি কেন্দ্রের অর্থ মন্ত্রকের তলিকাভুক্ত করা হয়েছ। কেন্দ্রীয় সরকারের এই একমুখী নীতি দেশের সাধারণ উচ্চশিক্ষা, কারিগরি এবং ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ সহ বৃহত্তর শিক্ষার্থী সমাজকে কোন অভিমুখে চালিত করবে সে বিষয়ে আলোকপাত অত্যন্ত জরুরি।
স্বাধীন ভারতে ১৯৪৮ সালে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের সভাপতিত্বে গঠিত হয়েছিল দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন– ইউনিভার্সিটি এডুকেশন কমিশন। যেটি পরিবর্তী সময়ে রাধাকৃষ্ণান কমিশন নামে অধিক পরিচিত লাভ করে। এই কমিশনের সুপারিশ অনুসারে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সংযোগ স্থাপন, সমন্বয় সাধন,সমতা বিধান, মানোন্নয়নের পাশাপাশি আর্থিক অনুদান প্রদানের উদ্দেশ্যে ১৯৫৬ সালে সংসদে দ্য ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ডস কমিশন অ্যাক্ট প্রণয়নের মধ্য দিয়ে ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনে ১৯৫৬ সালে ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ডস কমিশন অথবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগ নামক একটি স্বশাসিত সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশে ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ডস কমিশন অনুমোদিত চার ধরনের— কেন্দ্রীয়, রাজ্য, বিবেচিত এবং বেসরকারি— বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৩৩৮টি। স্বশাসিত এই সংস্থাটি দীর্ঘ সাত দশক দেশের অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিশ্ববিদ্যালয় অধিনস্ত কলেজগুলির পরিকাঠামোগত মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের গবেষেণা প্রকল্প পরিচালনা, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তুরে নতুন পাঠক্রম প্রবর্তন, দুর্গম, সংখ্যলঘু, তফসিলি জাতি অথবা তফসিলি উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ প্রকল্পে আর্থিক অনুদান সরবরাহের মধ্য দিয়ে সারা দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার, সমতাবিধান এবং মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলেছ। ১৯৮৭ সালে সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ভারতে কারিগরি বিদ্যা এবং ব্যবস্থাপনা শিক্ষা ব্যবস্থার সঠিক পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনে গঠিত হয় একটি স্বশাসিত সংস্থা অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন। এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে দশটি বোর্ড অব স্টাডিজ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত কারিগরি এবং ব্যবস্থাপনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রমের পরিকল্পনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং মানোন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে চলেছে। ১৯৯৩ সালে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় মানদণ্ড তৈরির উদ্দেশ্যে সংসদে ন্যশনাল কাউন্সিল ফর টিচার্স এডুকেশন অ্যাক্ট ১৯৯৩ শীর্ষক আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার্স এডুকেশন বা জাতীয় শিক্ষক শিক্ষা পরিষদ। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের অধীন স্বশাসিত এই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষক শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, বিকাশ এবং সমন্বিত উন্নয়নের বিষয়ে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারকে সহায়তার পাশাপাশি সারা দেশের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের নীতি প্রণয়ন ও পাঠক্রম রচনা এবং সেই সম্পর্কিত বিভিন্ন নিয়মকানুন প্রস্তুত করে চলেছে।
২০১৬ সালে দেশবাসী যেমন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র খসড়া প্রতিবেদন প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তেমনি হায়ার এডুকেশন কমিশন অব ইন্ডিয়া২০১৮ (HECI) শীর্ষক একটি খসড়া বিলও ২০১৮ সালে একবার আলকপ্রাপ্ত হয়েছিল। কোভিড অতিমারীর আবহে কেন্দ্রীয় সরকার বেনজিরভাবে কার্যকর করেছে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০। এই শিক্ষানীতির সার্বিক প্রয়োগের পরিসর রচনায় কেন্দ্রীয় সরকার পুনরায় সংসদে উত্থাপন করেছে বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল ২০২৫। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে সংসদে বিরোধী পক্ষের যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য উপস্থাপনার কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের সেবার প্রয়াস ব্যর্থ হলেও, এবার কেন্দ্রীয় সরকার সুপরিকল্পতিভাবে ইউজিসি, এআইসিটিই এবং এনসিটিএ— এই তিনটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে গঠন করতে চলেছে সম্পূর্ণ শাসক নিয়ন্ত্রিত এই সংস্থা। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন এবং মানোন্নয়নের জন্য প্রস্তাবিত এই স্বশাসিত সংস্থার অধীনে তিনটি পৃথক পর্ষদ— বিকশিত ভারত শিক্ষা বিনয়মানপর্ষদ, বিকশিত ভারত শিক্ষা গুণভট্ট পর্ষদ এবং বিকশিত ভারত শিক্ষা মাণকপর্ষদ– গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই খসড়া বিলের ছত্রে ছত্রে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক চক্রবূহে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নিক্ষেপ করে সরকার পোষিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দ্বার পাকাপাকিভাবে অবরুদ্ধ করে শিক্ষার বেসরকারিকরণের বিজয়রথের পথ উন্মুক্ত করা। সভাপতি সহ বারোজন সদস্য সংবলিত বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান কমিশনের পাশাপাশি সর্বাধিক চোদ্দজন সদস্য বিশিষ্ট তিনটি পৃথক পর্ষদ গঠনের যে নির্দেশিকা এই খসড়া প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়েছে, সেই নির্দেশিকায় নামমাত্র শিক্ষক প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের লাগামহীন নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় উপকরণ। কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশক্রমে মাননীয় রাষ্ট্রপতি একজন বিশিষ্ঠ এবং খ্যাতনামা ব্যক্তিকে মূল কমিশনের সভাপতি পদে নিয়োগ করবেন। বারোজন সদস্যের প্রস্তাবিত এই কমিশনে অধ্যাপক পদমর্যাদার মাত্র দু’জন বিশিষ্ঠ শিক্ষাবিদের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। বাকি তিনটি পর্ষদের সভাপতি নির্বাচনের জন্য এই খসড়া বিলে সার্চ কাম সিলেকশন কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তিন সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির দু’জন সদস্য মনোনীত করবে কেন্দ্রীয় সরকার এবং তৃতীয় ব্যক্তি হবেন কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের সচিব। তিন সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী মাননীয় রাষ্ট্রপতি তিনটি প্রস্তাবিত পর্ষদের সভাপতিদের নিয়োগ করবেন। প্রস্তাবিত খসড়ায় সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ঠ এবং খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে দশ বছর অথবা দশ বছরের বেশি সময় কর্মরত অধ্যাপকদেরকেও উল্লিখিত তিনটি পর্ষদের সভাপতি পদে নিয়োগের কথা ঘোষিত হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালে গঠিত ইউজিসি আইনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের আধিকারিক ব্যতীত কোনও ব্যক্তিকে কমিশনের সভাপতি হিসাবে বেছে নিতে হবে। কমিশনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবেন দু’জন সচিব। কমপক্ষে চারজন কর্মরত অধ্যাপক হবেন এই কমিশনের সদস্য এবং কমপক্ষে অর্ধেক এমন ব্যক্তি সদস্য হিসাবে এই কমিশনে অন্তর্ভুক্ত হবেন যাঁরা কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের আধিকারিক নন। অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে গঠিত কমিশন এবং ২০২৫ সালে প্রস্তাবিত কমিশনের গঠনতন্ত্রেই প্রতিভাত হয় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েমের অভিমুখ। সম্প্রতি বিলটি লোকসভায় উপস্থাপিত হয় এবং সাংসদের আপত্তিতে আপতত সেটি যৌথ সংসদীয় কমিটির বিবেচনাধীন। আমাদের আশঙ্কা কেন্দ্রীয় সরকার যথা সময়ে বিলটি লোকসভায় উত্থাপন করে অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ করবে। এমতাবস্থায়, কেবলমাত্র দেশের সকল শুভবুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রতিবাদই কেন্দ্রীয় সরকারের এই অশুভ প্রয়াস প্রতিহত করতে পারে।
স্বাধীন ভারতে শিক্ষাখাতে ব্যয় বরাদ্দ কখনই প্রস্তাবিত লক্ষ্যে না পৌঁছালেও, দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা কখনই শাসকের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত না হলেও, শিক্ষা বিষয়ক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মত বিনিময়ের পরিসর অতীতে কখনই আজকের চেহারা নেয়নি। নানান আলোচনা, সমালোচনা, সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মানেরইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স, একাধিক আইআইটি, আইআইএম, এইমস, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিক্যাল ইনস্টিটিউট সহ অসংখ্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা উত্তর ভারতে কি কেন্দ্রে, কি রাজ্যে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি শিক্ষাক্ষেত্রে দলীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইলেও তা আজকের মতো রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বদ্ধভূমিতে পরিণত হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার, গণতান্ত্রিক পরিসর, বিদ্যাচর্চার উন্মুক্ত পরিমণ্ডল আজ সারা দেশে এক গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত। সরকারি আর্থিক আনুকূল্যে একটু একটু করে গড়ে ওঠা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শিক্ষাক্ষেত্র ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ রাষ্ট্রের পৃষ্টপোষকতায় বেসরকারিকরণের অন্ধ গলিতে দিশাহারা। উন্মুক্ত এই বাজার দখলে নেমে পড়েছেন দেশ বিদেশের পুঁজিপতির দল আর রাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় দুর্বার গতিতে তাঁরা এগিয়ে চলেছেন অভীষ্ট লক্ষ্যে। মাত্র দেড় দশক আগে যে দেশে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা আর্থ-সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সকল শিশুর জন্য বিনামুল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষাক্রম নিশ্চিত করতে সংসদে ২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন স্বীকৃত হয়েছিল, সেই দেশেই আজ শিক্ষা পণ্যে পরিণত হয়েছে। মেধার বিকল্প অর্থই হয়ে উঠেছে বিদ্যার্জনের সোপান। কোভিড অতিমারীর আবহে মুক্ত আলোচনা, যথার্থ পরিকল্পনা এবং উপযুক্ত পরিকাঠামো ছাড়া সারা দেশে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ নির্দেশিত একই সাথে তিন এবং চার বছরের স্নাতক পাঠক্রম প্রবর্তন সহ বিবিধ পশ্চিমী ব্যবস্থার অনুকরণ এবং ভারতীয় জ্ঞান ভাণ্ডারের নামে পরীক্ষিত বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠক্রমের পরিবর্তে পশ্চাৎপদতা সাধারণ পড়ুয়া সহ অভিভাবক সমাজকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করেছে। কোভিড-উত্তর পরিস্থিতিতে সারা দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমাগতবৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই তীব্র সঙ্কটে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বহু শিক্ষার্থী বাধ্য হয়েছে চিরকালের জন্য শিক্ষাঙ্গন ছেড়ে যেতে। জাতীয় শিক্ষানীতি এবং কোভিড এই দ্বিবিধ আক্রমণের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগে নজিরবিহীন দুর্নীতি, রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজ্যের সাংবিধানিক এবং প্রশাসনিক প্রধানের অকল্পনীয় রাজনৈতিক দ্বৈরথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পরিচালনায় শাসক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণহীন দৌরাত্ম্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা রাজ্যের সরকার পোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে বর্তমানে কার্যত এনরোলমেন্ট সেন্টারে পরিণত হয়েছে। এই আবহে আর্থিকভাবে সম্পন্ন অভিভাবকেরা তাঁদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সরকার পোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে নির্দ্বিধায় কর্পোরেট কালচারে জারিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে বেছে নিচ্ছেন আর আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের সদস্যদের একমাত্র গন্তব্য হয়ে উঠেছে সরকার পোষিত শিক্ষাঙ্গন। রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দপ্তর পরিচালিত স্নাতকস্তরে বিলম্বিত কেন্দ্রীয় ভর্তি প্রক্রিয়ার কল্যাণে রাজ্যের মোট আসনের অর্ধেকেরও বেশি আসন শূন্য পড়ে আছে। এমতাবস্থায়,কেন্দ্রীয় সরকার দীর্ঘ সময় পরিচালিত বর্তমান ব্যবস্থার চিহ্নিত সমস্যা দূর না করে, বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল ২০২৫-কে আইনে পরিণত করে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একশো শতাংশ নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে একটু একটু করে সুপরিকল্পিতভাবে সরকার পোষিত শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্জলি যাত্রা সম্পন্ন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
Comments :0