West Bengal Election Habra

তৃণমূলের দুর্নীতি, বিজেপি’র বিভাজনের জবাব দিতে প্রস্তুত হাবড়ার মানুষ

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

হাবড়া স্টেশনে প্রচারে বাম প্রার্থী ঋজিনন্দন বিশ্বাস।

সুস্মিত দাস: হাবড়া
২০২১ সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত জ্যোতিপ্রিয় ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তাঁকে খাদ্য দপ্তর থেকে সরিয়ে বনমন্ত্রী করেছিলেন। রেশন দুর্নীতি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল ইডি। প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে ইডি বলেছিল জ্যোতিপ্রিয় রেশন দুর্নীতির ‘রিং মাস্টার’। এর পরপরই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তৃণমুল নেতা আনিসুর রহমান, শঙ্কর আঢ্যরা। ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর টানা জিজ্ঞাসাবাদের পর বাড়ি থেকেই জ্যোতিপ্রিয়কে গ্রেপ্তার করেছিল ইডি। পৌর নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত করার সময়ই ধরা পড়েছিল রেশন দুর্নীতি। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার তৃণমূল কংগ্রেসের দাপুটে নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। যিনি উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হাবড়া বিধান সভা কেন্দ্র থেকে ২০১১ সাল থেকে ২০২১ টানা তিনবার জয় লাভ করেন। তারও আগে ২০০১ সালে গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তিনি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের পর ২০০৬ সালেও তিনি গাইঘাটার বিধায়ক নির্বাচিত হন। এবারেও তিনি হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমুল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালে। সারা রাজ্যে আলোড়ন ফেলে দেওয়া হত্যাকান্ড। শিক্ষক বরুন বিশ্বাসের হত্যাকান্ডে নাম জড়ায় প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রীর। উত্তর ২৪ পরগণা জেলার সুটিয়ায় ২০০০ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে একের পর এক দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় প্রতিবাদী মঞ্চ গড়়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন বরুণ বিশ্বাস ও তাঁর মতো আরও বহু প্রতিবাদী মানুষ। আন্দোলনের চাপে ধরাও পড়ে বেশ কয়েকজন কুখ্যাত দুষ্কৃতী। তাদের কয়েকজনের সাজাও হয়। দলবদ্ধ ধর্ষণের আরও কিছু মামলা তখনও চলছিল। যার মূল সাক্ষী ছিলেন কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের (মেন) বাংলার শিক্ষক বরুণ। এলাকায় প্রতিবাদী মুখ হিসাবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল ঘরে ঘরে। পর উপকারি, মিষ্টভাষী যুবকটিকে ভালবাসতেন অসংখ্য মানুষ। ২০১২ সালের ৫ জুলাই এই বরুণকেই গোবরডাঙা স্টেশনের বাইরে গুলি করে মারে কিছু দুষ্কৃতীরা। তাঁর খুনের পরে এককাট্টা হন এলাকার অসংখ্যা মানুষ। বরুণের খুনিদের শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয় গোটা রাজ্য। সিবিআই তদন্তের দাবি থাকলেও সিআইডি তদন্তভার গ্রহণ করে। তারা জানায়, দমদম সেন্ট্রাল জেলে বসে বরুণকে খুনের ছক কষেছিল সুশান্ত চৌধুরী। এই ব্যক্তি আবার সুটিয়া দলবেঁধে ধর্ষণ-কাণ্ডের অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত আসামি। সুশান্ত পরে আলিপুর জেলে মারা যান। এই মামলায় পরে নিজে যুক্ত হন বরুণের দিদি প্রমীলা রায় বিশ্বাস। তিনি হাইকোর্টে অভিযোগ করেন তাঁর ভাই বরুণ বিশ্বাসের খুনে অন্যতম চক্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। ২০০০ সালে গাইঘাটা সহ গোটা বনগাঁ মহকুমা জুড়ো ভয়াবহ বন্যার পর, এলাকায় নদী সংস্কারের জন্য আন্দোলন করেন বরুণ এবং তাঁর বন্ধুরা। স্থানীয় সূত্রে দাবি, পরবর্তীতে এর জন্য প্রায় ৩৪ কোটি টাকার অনুমোদন আসে। সেই টাকার বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিলো তৎকালীন গাইঘাটার বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বিরুদ্ধে। যা নিয়েও সরব হয়েছিলেন বরুণ বিশ্বাস। এসবের জেরেই তাঁকে খুন হতে হয়েছিল বলে অভিযোগ। এই সেই জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, যিনি প্রকাশ্যে বিরোধীদের বিষাক্ত সাপ দেখলেই যেমন পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় তেমনই পিটিয়ে মেরে ফেলার ফরমান জারি করেছিলেন। সিপিআই(এম) কর্মীর পাশে বসে চা না খাওয়া বা সিপিআই(এম) কর্মীর বাড়িতে মেয়ের বিয়ে না দেওয়ার নিদান দিয়েছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের রেশন দুর্নীতির মামলার তদন্ত করছে ইডি। এই দুর্নীতির সূত্রপাত ২০১১ সালে - পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক দলের আড়ালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। কোভিড পরবর্তী সময়ে তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যা মানুষের চোখে দিনের আলোর মতো পরিস্কার হয়ে যায়। ২০২১ সালে ভারত বাংলাদেশের ঘোঁজাডাঙা সীমান্তে ১৭৫ টি রেশনের চাল বোঝাই লরি আটক হয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে। তদন্তে নামে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তারা জানতে পারে এই চাল এসেছে বনগাঁর কালুপুরে অবস্থিত রাধা গোবিন্দ রাইস মিল থেকে। সেখানে হানা দিয়ে ইডি প্রথম গ্রেপ্তার করে ওই মিলের মালিক কালু সাহা কে। তাকে জেরা করে নাম পায় আরও অনেক রাঘববোয়ালদের। পরবর্তীতে তদন্তে গতি পায় দেগঙ্গার তৃণমুল নেতা বাকিবুর রহমানের গ্রেপ্তারীতে। নাম উঠে আসে প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী তৎকালীন বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের। প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্তে উঠে আসে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে এবং আত্মীয় স্বজনের নামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির হদিস, যার উৎস তিনি বা তারা দেখাতে পারেন নি। যে সম্পত্তির বাজার মূল্য ১৫০ কোটি টাকারও বেশী। বাকিবুরের গ্রেপ্তারীর মাস সাতেক পর ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর তৃণমূল নেতা তথা তৎকালীন বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কে গ্রেপ্তার করে ইডি। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, রাজ্যে রেশন বিতরণে ব্যাপক দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন জ্যোতিপ্রিয়, যাঁকে দলের ভিতরে ও বাইরে অনেকেই “বালু” নামে চেনেন। দীর্ঘ জেরা ও প্রমাণ সংগ্রহের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। রেশন দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বাকিবুর ও জ্যোতিপ্রিয়'র সূত্র ধরেই ২০২৪ সালের আগস্টের গোড়ার দিকে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক চালকলে হানা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তালিকায় ছিল দেগঙ্গায় আলিফের বাড়ি এবং চালকল। তার পর তাঁর ভাই আনিসুর রহমান এবং আলিফকে সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দিতে বলা হয়েছিল। প্রায় ন’ঘণ্টা জেরার পর গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁদের। তদন্তকারীরা আরও দাবি করেছিলেন, রেশন দুর্নীতি মামলার অন্যতম অভিযুক্ত বাকিবুরের সঙ্গেও আর্থিক লেনদেন ছিল আনিসুর এবং আলিফের। প্রসঙ্গত সেই আনিসুর রহমান এবারে বিধানসভা নির্বাচনে দেগঙ্গা কেন্দ্রে তৃণমুল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রায় ১৪ মাস তদন্তের পর, ২০২৫ সালের জানুয়ারী মাসে আদালতের নির্দেশে তিনি জামিন পান প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী। জামিনে মুক্তি পাওয়ার মাত্র সপ্তাহখানেক পর একই মামলায় অভিযুক্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ আনিসুর রহমানও জামিনে ছাড়া পান। সেই জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কে এবার‌ও তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী করতে সম্ভবত বাধ্য হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর সাহস হয়নি দশ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিতে অভিযুক্ত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কে নির্বাচনে দাঁড়ানোর টিকিট না দেবার। কারণ জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বিরুদ্ধে যত টাকা দুর্নীতির অভিযোগ -সেই অনুযায়ী পঁচাত্তর শতাংশ তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গেছে। আর তা না পৌঁছালে মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের সাধ্য ছিল না এই দুর্নীতির চক্র চালানোর। সম্ভবতঃ জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের কাছে হয়তো এমন কোনো তথ্য আছে যার কারণে রেশন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত জেলখাটা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কে নির্বাচনে দাঁড়ানোর টিকিট দিতে বাধ্য হয়েছে তৃণমূল নেত্রী। 
তৃণমূল কংগ্রেসের জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, যাঁকে একসময় উত্তর ২৪ পরগনায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে গণ্য করা হতো, তিনি দাবি করেন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কারণে তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল। 
বুধবার সিপিআই(এম) প্রার্থী প্রচার সারেন হাবড়া স্টেশন এবং হাবড়া স্টেশন সংলগ্ন বাজারে। প্রচারে তিনি সমর্থন পেয়েছেন মানুষের। হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রের বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিআই(এম) ঋজিনন্দন বিশ্বাসকে মানুষ বলেছেন তৃণমূলের দুর্নীতি এবং বিজেপির বিভাজনের জবাব এবার তাঁরা  ইভিএম—এই দেবেন। 

Comments :0

Login to leave a comment