Dhupguri Farmer Suicide

ভোটের মুখে কৃষকের হাহাকার, ঋণের দায়ে ধূপগুড়িতে ফের আত্মঘাতী আলু চাষি

জেলা

বিধানসভা নির্বাচনের ঢাকঢোল আর শাসকদলের চটকদারি প্রচারের আড়ালে ফের প্রকট হলো রাজ্যের কৃষি সংকটের বীভৎস রূপ। একদিকে আকাশছোঁয়া উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে ফসলের ন্যায্য দাম না মেলা—এই সাঁড়াশী চাপে পিষ্ট হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন ধূপগুড়ির এক প্রগতিশীল কৃষক। মৃত কৃষকের নাম সুষেন দাস (৫৪)। মমান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে ধূপগুড়ি ব্লকের গাদং-১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের কথাপাড়া এলাকায়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কথাপাড়ার বাসিন্দা সুষেন দাস এ বছর প্রায় ২০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। লাভের আশায় বিভিন্ন জায়গা থেকে চড়া সুদে কয়েক লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রকৃতির মার আর সরকারি নীতির ব্যর্থতায় তাঁর সব স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যায়। বিঘার পর বিঘা জমির আলু পচে নষ্ট হয়েছে। ভিন রাজ্যে আলু পাঠানো নিয়ে রাজ্য সরকারের খামখেয়ালি কড়াকড়িতে বাজারে আলুর ন্যায্য দাম মেলেনি। পাইকার না মেলায় হিমঘরে আলু মজুত করা বা খোলা বাজারে বিক্রি করা—দুই পথই কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবারের দাবি, চাষে প্রায় ৬ থেকে ৭ লক্ষ টাকার লোকসান এবং ঋণের কিস্তি মেটানোর চাপে গত কয়েকদিন ধরেই গভীর মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন সুষেনবাবু। মঙ্গলবার বাড়ির লোকের নজর এড়িয়ে গোয়াল ঘরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মঘাতী হন তিনি। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে। সরকারি কৃষি নীতির ব্যর্থতা এবং কৃষি বিপণনে শাসকদলের ‘সিন্ডিকেট’ ও স্বজনপোষণের দিকেই আঙুল তুলছেন নিহতের আত্মীয় ও স্থানীয় কৃষকরা।
স্বয়ং গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান নিরুপমা রায় স্বীকার করেছেন যে, ২৫০ জন কৃষকের তালিকা পাঠানো হলেও মাত্র ৯৪ জনের থেকে সরকারিভাবে আলু কেনা হয়েছে। বাকি ১৫৬ জন কৃষক কেন বঞ্চিত হলেন, তার সদুত্তর মেলেনি। মৃতের ভাগ্নে সঞ্জয় দাসের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর, ‘‘সরকারিভাবে আলু কেনা হলেও তা কেবল শাসকদলের ঘনিষ্ঠ নেতা-নেত্রীদের ঘর থেকেই কেনা হচ্ছে। আমরা সাধারণ কৃষকরা ব্রাত্য। সময়মতো সরকারি সাহায্য বা ন্যায্য দাম পেলে আজ মামাকে মরতে হতো না।’’
এই মর্মান্তিক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সারা ভারত কৃষক সভা। সংগঠনের জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক প্রাণ গোপাল ভাওয়াল বলেন, ‘‘রাজ্য সরকারের ভ্রান্ত কৃষি নীতির কারণে আজ উত্তরবঙ্গের কৃষক দিশেহারা। সার ও বীজের কালোবাজারি রুখতে সরকার ব্যর্থ, আবার ফসল উঠলে ন্যায্য দাম দিতেও তাদের অনীহা। মৃত কৃষকের পরিবারকে অবিলম্বে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তাঁর সমস্ত কৃষিঋণ মকুব করতে হবে। ভোটের প্রচারে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, অথচ কৃষকের ফসলে ভরতুকি দেওয়ার টাকা নেই। এটি কেবল আত্মহত্যা নয়, এটি ‘রাষ্ট্রীয় হত্যা’। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে দলের ক্যাডারদের থেকে আলু কেনার ফলেই আজ এই পরিস্থিতি।’’
ধূপগুড়ি থানার পুলিশ মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে এবং একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে উত্তরবঙ্গে আলু চাষিদের এই ধারাবাহিক লোকসান এবং আত্মহত্যার ঘটনা ফের প্রমাণ করল যে, তৃণমূল জমানায় কৃষকরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভোটের মুখে সুষেন রায়ের এই মৃত্যু গ্রামীণ অর্থনীতির বেহাল দশা এবং কৃষি বিপণন ব্যবস্থার চূড়ান্ত দেউলিয়াপনাকেই নগ্ন করে দিল।

Comments :0

Login to leave a comment