Raninagar

পাঁচটি ‘ম’-এর বিরুদ্ধে জয় ধরে রাখার লড়াই

রাজ্য বাংলা বাঁচানোর ভোট

রানিনগরের পেঁচাপাড়ায় প্রচারে বামফ্রন্টের সিপিআই(এম) প্রার্থী জামাল হোসেন। ছবি: শ্যামল মজুমদার।

চন্দন দাস: রানিনগর
 

ওডিশা আর কেরালার তফাৎ আছে ভূগোলে। তফাৎ আছে মজুরিতে। রানিনগর বিলক্ষণ জানে। বাকি ফারাক ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের এই এলাকা চিনেছে অপমানে। সফিকুলের অভিজ্ঞতা জোতকানাই, তুলসিপুর ছাড়িয়ে রানিনগরে নির্বাচনের অন্যতম বিষয়।
কীভাবে? পেঁচাপাড়ায় ভর দুপুরে আজিজুল মণ্ডলের বাড়িতে সোহেল রাণা সেখের সঙ্গে আলাপ। যুবক, টানটান চেহারা। নানা কথায় এসে পড়ল ‘সফিকুল ইসলাম।’ সোহেলের সঙ্গে ঘিরে থাকা আরও জনা দশেক যুবকও সফিকুলকে নিয়ে বলতে শুরু করলেন। সফিকুল ওডিশার গঞ্জাম জেলায় ব্যবসা করেন। মোটরবাইকের পিছনে বাসনপত্র বেঁধে গ্রামে, শহরে ঘুরে বেরান সফিকুল। গতবছর গঞ্জামের বহরমপুরে সফিকুলকে ধরে মারধর করে একদল যুবক। ‘বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশি’ সন্দেহে ব্যাপক হামলা চালানো হয় সফিকুলের উপর। তাঁর আধার কার্ড দেখেও বিশ্বাস করেনি গঞ্জামের সেই উঠতি হিন্দুত্ববাদীরা। আহত সফিকুল বাড়ি ফিরে আসেন। কিছুদিন বাড়ি থেকে আবার ফিরে যান গঞ্জামে। 
সোহেল বললেন, ‘‘কী করবে বলুন? এখানে ব্যবসার বাজার নেই। কাজ নেই। ভয় আছে মার খাওয়ার। তবু ফিরেছে। ও তো একা নয়। সেই সময় রানিনগরের প্রায় ৪০ জন ফিরে এসেছিল আক্রান্ত হয়ে। ওই রাজ্যে বিজেপি’র সরকার। আমাদের নিরাপত্তা নেই। আমাদের গ্রামে প্রধান তৃণমূলের। সেও কিছু করেনি। কোটি কোটি টাকার মালিক বিধায়ক তৃণমূলের। তিনিও সাহায্য করেননি। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও কিছু করেননি। কিন্তু এই রানিনগরেরই অনেক ছেলে কেরালায় আছে। সেখানে কোনও সমস্যা নেই। কেউ কিছু বলে না। মজুরিও বেশি। বিজেপি’র সরকার আর বামেদের সরকারের তফাৎ বোঝানোর জন্য আর কিছু বলার দরকার হয়?’’ আজিজুল মণ্ডল বললেন, ‘‘অথচ দেখুন মমতা ব্যানার্জি বিজেপি’কে আক্রমণ করছেন। বলছেন ‘বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি’? বিজেপি’কে বলছেন তো? নিজে কী করেছেন? বিজেপি মেরেছে। উনি বাঁচাতে আসেননি। কাজের ব্যবস্থা করেননি। খালি ভাষণ দিয়েছেন।’’
রানিনগরে হাজারও পরিযায়ী শ্রমিক। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের বসবাস রানিনগরের গ্রামগুলিতে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, বাবা-মাকে রেখে। সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকের নাম বাদ গিয়েছে এসআইআর-এ। সিপিআই(এম) প্রার্থী জামাল হোসেন বললেন, ‘‘এসআইআর-এ যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে তাঁরা আতঙ্কিত। যাঁদের নাম আছে, এবার তাঁরা সবাই ভোট দিতে চাইছেন। সবার আশঙ্কা, যদি ভোট না দিলে নাম কাটা যায়। তবে নাম বাদ যাওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ভূমিকাও আছে। তাঁদের কর্মী, অফিসাররা ঠিক মতো কাজ করেননি। এ’ শুধু আমাদের কথা নয়, মানুষের অভিযোগ।’’
আর কী? জিৎপুরের রবিউল মণ্ডলের অভিজ্ঞতা ভয়ানক। বললেন, ‘‘পাট বিক্রি করেছি ৮হাজার টাকা কুইন্টালে। সেই পাট ব্যবসায়ীরা আমাদের থেকে কিনে ১৭-১৮ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। দেখছি, কিন্তু কিছু করার নেই। আমার ফসল কেনায় সরকারের কোনও ভূমিকা নেই। ওদের টাকা নিয়ে চাষ করে ওদের দামে ফসল বিক্রি করতে হয়।’’ এই শোষণ শুধু পাটে আটকে নেই। গম, ধান—এক যন্ত্রণা। রানিনগরের কৃষক কুইন্টাল পিছু ২০০০ টাকার আশপাশে ধান বিক্রি করেছেন। দেদার লোকসান। আর ‘কৃষক দরদি’ সরকার দেখতে পায়নি! জামাল হোসেন শেখপাড়ার গ্রামবাসীদের বললেন বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ইশ্‌তেহারের কথা— তাঁরা সরকার গড়লে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দেড় গুণ দামে ফসল কেনা হবে কৃষকদের থেকে।
এই সবের মাঝে একজনের কথা বলে রাখা জরুরি। তিনি মাসুয়ারা খাতুন। ২০২১-এ তিনি রানিনগরে বিজেপি’র প্রার্থী ছিলেন। এবার বিজেপি প্রার্থী করেছে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ রাণাপ্রতাপ সিংহ রায়কে। মাসুয়ারা কী করছেন? তাঁর কথায়, ‘‘এবার দল আমাকে টিকিট দেয়নি। আমি নির্দল প্রার্থী হয়েছি। আমার লড়াই সবার বিরুদ্ধে।’’ সবার মানে? বিজেপি’র বিরুদ্ধেও? মাসুয়ারা একটু থমকে বললেন, ‘‘তা কেন? আমি বিজেপি’র বিরুদ্ধে কখনও নই। আসলে মহামেডান প্রধান এলাকায় হিন্দু প্রার্থী দেওয়ার কোনও মানে নেই।’’ 
আসলে মানে আছে। গত নির্বাচনগুলিতে তৃণমূল কিংবা বিজেপি’কে ভোট দেওয়া যে মানুষ এবার কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ, যাঁদের ভোটে গত লোকসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম) এগিয়ে যাওয়ার রসদ পেয়েছিল। সেই তাঁদের ভোট সিপিআই(এম)-এ যাওয়া আটকানোর ন্যূনতম চেষ্টারও কসুর করছে না বিজেপি। মাসুয়ারা খাতুনের নির্দল প্রার্থী হওয়ার পিছনে কারণ এটিই।
মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে রানিনগর বিধানসভা। গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে রাজ্যের একমাত্র বিধানসভা ক্ষেত্র রানিনগর, যেখানে সিপিআই(এম) বেশি ভোট পেয়েছিল বিরোধীদের থেকে। 
রানিনগরের জমি ‘উদ্ধারে’ তাই তৃণমূল মরিয়া। কিন্তু বাস্তবে মুর্শিদাবাদ সহ রানিনগরে জমির হাল যে খারাপ হয়েছে তা জানিয়েছেন আবদুল সৌমিক হোসেন। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে এখানে জিতেছিলেন তৃণমূলের তিনি। এবারও সৌমিকই প্রার্থী। তিনি জানিয়েছেন, ২০২১-এর মতোই এবারও তাঁর একটিই অকৃষি জমি আছে। সেটি গোরাবাজার মৌজায়। ২০২১-এর মতোই সেটির দাম পাঁচ বছর পরেও থেমে আছে ঠিক ৪৮,৪৭,২৭২ টাকায়। 
রানিনগরের বিধায়কের তিনটি ফ্ল্যাট কলকাতায়। ৬ একরের বেশি কৃষি জমির মালিক ব্যবসায়ী সৌমিক হোসেনকে ফের জয়ী করতে দেদার টাকা ওড়াচ্ছে তৃণমূল রানিনগরে। সেই সূত্রেই জামাল হোসেনের কথায়, ‘‘লোকসভা নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনেও আমার পাঁচটা ম-এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। মোদী, মমতা, মানি, মাসল আর মিডিয়া।’’

Comments :0

Login to leave a comment