Assembly Election 2026: Binpur

বিনপুর: জঙ্গলমহলে কাজ ফেরাতে ফের লাল ঝান্ডাকে চাইছেন রিনা-সোমারা

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

সোমবার বিনপুর বিধানসভার সিপিআই(এম) প্রার্থী রবীন্দ্রনাথ সর্দার প্রচারে গিয়ে কথা বলছে শিলদা রাজার বাগান কলোনোর মানুষজনের সঙ্গে।

মধুসূদন চ্যাটার্জি: ঝাড়গ্রাম

‘‘লাল পার্টি ভোটে জিতলে আমাদের ছেলেগুলো ঘরে ফিরে আসবে, বুড়ো বাবা, মা, বউ, ছেলেপুলেগুলোর মুখে হাসি ফুটবে, এখানে কাজ মিলবে।’’
কথাটা বলেই কাপড়ের আচল দিয়ে মুখ মুছলেন মাঝ বয়সি রিনা সিং। আর বললেন, ‘‘লালঝান্ডা যখন ছিল তখন কাজ পাওয়াটাও স্বাভাবিক ছিল। সেটা আবার আমরা ফিরিয়ে আনব’’।  
তাঁর সারা শরীর থেকে টপ টপ করে ঘামের জল পড়ছে। কেবল রিনা সিং নন, সোমা দাস, বৈজন্তী দুলে, শিবানী শবর সহ শিলদা রাজার বাঁধ এলাকার একাধিক গৃহবধূর শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। 
মাথার উপর মাঝ এপ্রিলের কড়া রোদ। বেলা ১২টা পেরিয়ে গেছে। তখনও পর্যন্ত এই রাজার বাঁধ কলোনির কারও বাড়িতেই রান্না চাপেনি। কারন সোমবার সকালেই ঝাড়গ্রাম জেলার বিনপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বামফ্রন্টের সিপিআই(এম) প্রার্থী রবীন্দ্রনাথ সর্দার এখানে প্রচারে এসেছেন। 
রবীন্দ্রনাথ সর্দারকে বিনপুর বিধানসভা এলাকার সব গ্রামের মানুষই চেনেন। তিনি সিপিআই(এম)’র বেলপাহাড়ি এরিয়া কমিটির সম্পাদকও। পেশায় তিনি খেতমজুর। পরিবারের সামান্য কিছু জমি আছে, তাতে কয়েকমাসের ভাতও জোগাড় হয় না। তাই খেতমজুরি ও গরু চরিয়েই তাঁর সংসার চলে। ২০০৩-২০১০, এই সময়কালে তৃণমূল-বিজেপি-ঝাড়খন্ডের জোট এবং মাওবাদী ঘাতকবাহিনী এই জঙ্গলমহল এলাকায় এনে যেভাবে রক্তের স্রোত বইয়ে দিয়েছিল, সেই নৃশংসতার সব চেয়ে বড় শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত মেদিনীপুরের এই ঝাড়গ্রাম জেলা। এখানে ৩৭৯ জন গরিব মানুষকে খুন করা হয়। এঁরা সবাই লালঝান্ডা ধরেই মানুষের জন্য কাজ করে যেতেন। 
‘‘এই বিনপুর বিধানসভা এলাকাতেই ৬০ জন মানুষ মাওবাদীদের হাতে খুন হন’’, বলছেন সিপিআই(এম) শিলদা এরিয়া কমিটির সম্পাদক অধীর পাল। তিনি জানান, এর পরেও একজনও লালঝান্ডা ছাড়েননি। শহীদ পরিবারের মানুষগুলোও আজ লালঝান্ডার কর্মসূচিতে থাকেন। এখনও মানুষের ভরসা আছে লালঝান্ডার উপর। 
এদিন রাজার বাঁধ গিয়েও সেটা দেখা গেল। এই কলোনিতে ৩২টি পরিবার থাকেন। তাঁদের একটা বড় অংশ মাহালী, শবর, সর্দার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। এখানকার বাসিন্দা নাড়ু মাহালি জানান, বামফ্রন্ট সরকারের সময়ই এই জায়গায় আমাদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। না হলে আমরাও বনে জঙ্গলে থাকতাম। তিনি জানান, আদিবাসী হয়েও আজও পর্যন্ত আমরা অরণ্যের পাট্টা পেলাম না। বর্তমান পঞ্চায়েত আমাদের পাত্তাই দেয় না। আমরা জানি, বামফ্রন্ট সরকারে এলে আমাদের দাবি পূরণ হবে। 
এদিন এই কলোনিতে ঢোকার পরই একে একে ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে এলেন। শিবানী শবর, বৈজন্তী দুলেরা জানান, ১০০ দিনের কাজের দাবিতে শিলদা পঞ্চায়েত, বিনপুর-২ পঞ্চায়েত সমিতিতে আমরা ডেপুটেশন দিয়েছি। রবীন্দ্রনাথ সর্দারই তো আমাদের সঙ্গে দিনের পর দিন মিটিং করেছেন। মিছিল করে আমাদের নিয়ে গেছেন। তাছাড়া তিনি নিজেও তো খেতমজুর। তাই খেতমজুরের যন্ত্রণাটা উনি বোঝেন অনেকের চেয়ে বেশি। 
এবার বিনপুর কেন্দ্রে যিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছেন সেই বীরবাহা হাঁসদা ঝাড়গ্রাম থেকে গতবার জিতে রাজ্যের বন দপ্তরে মন্ত্রী হয়েছেন। ঝাড়গ্রাম জেলার বনজঙ্গল কি বেড়েছে? ঝাড়গ্রাম, ভুলাবেদা, মালাবতী জঙ্গল তৃণমূলের আশ্রিত লোকজন কেটে সাফ করে দিয়েছে। হাতির হামলায় পাঁচ বছরে প্রায় ৩২ জন মারা গেছেন। বনরক্ষা কমিটি নেই। স্থানীয়েরা জানালেন যে তিনি দু’টি পেট্রোল পাম্প করেছেন মাগুড়া ও চিলাকগড়ে। শোনা যাচ্ছে গোপীবল্লভপুরেও নাকি একটি করছেন। 
বিনপুরের মানুষজনের বক্তব্য, বীরবাহা হাঁসদার বিরুদ্ধে দুর্নীতির এতটাই অভিযোগ যে ঝাড়গ্রাম থেকে সরিয়ে তাঁকে বিনপুরে প্রার্থী করতে হয়েছে তৃণমূলকে। বিনপুরের মানুষ বললেন, আমরা এরকম স্ট্যাম্প মারা দুর্নীতিবাজকে কেন ভোট দেব? আর বিজেপি প্রার্থী যিনি হয়েছেন, সেই প্রণত টুডু এলাকার মানুষই নন। কয়েকদিন আগে মাত্র এখানে বিজেপি’র অফিস খোলা হয়েছে। আমরা আর ঠকতে রাজি নই। 
ভুলাবেদা গ্রাম পঞ্চায়েতের গিদিঘাট গ্রামের বাসিন্দা, একসময় মাওবাদীদের হিটলিস্টে থাকা রবীন্দ্রনাথ সর্দার সকাল থেকেই বেলপাহাড়ি ( বিনপুর ২) ও জামবনী ব্লকের ২০টি অঞ্চলেই ঘুরছেন। 
সিপিআই(এম) কর্মী শান্তনু মজুমদার, নন্দদুলাল মজুমদার, প্রভাস দেশোয়ালিরা জানান যে শিলদার মানুষ এখনও ভুলতে পারেন না ২০১০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির কথা। সেদিন এই শিলদার ইএফআর কাম্পে মাওবাদী বাহিনী ঢুকে ২৪ জন জওয়ানকে খুন করেছিল। সেই খুনের দলে যারা ছিল, তাদের পুর্নবাসন দিল সরকার। কোন শাস্তি হলো না। এদের একজন এখন বিনপুর পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ হয়েছে তৃণমূলের টিকিটে জিতে। 
একদিক কাজ, শিক্ষা, জঙ্গলমহল এলাকায় গাছ বাঁচানো, স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিষেবা পাওয়া নিয়ে লড়াই। অন্যদিকে কোন উন্নয়নের কথা না বলে বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে দেওয়া মানুষগুলোই আজ ঘাসফুল, পদ্মফুলের ঝান্ডা নিয়ে ‘খেলা হবে‘ শ্লোগান তুলে প্রচার করছে। 
এবার সত্যিই খেলতে চায় জঙ্গলমহল ঝাড়গ্রামের বিনপুর।  
 

Comments :0

Login to leave a comment